ঢাকা , মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লাল ভবনের ১৫৩ বছরের ইতিহাস!

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২২-০৯-২০২৬ ০৩:০২:০৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২২-০৯-২০২৬ ০৩:০২:০৪ অপরাহ্ন
লাল ভবনের ১৫৩ বছরের ইতিহাস! ফাইল ছবি
লালরঙা ভবন, সবুজে ঘেরা পরিপাটি ক্যাম্পাস আর দীর্ঘ ইতিহাস—রাজশাহী কলেজ যেন একই সঙ্গে অতীত ও বর্তমানের এক অনন্য মেলবন্ধন। শুধু পাঠদান নয়, ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতিও ধারণ করে আছে উপমহাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

নানা চড়াই-উতরাই ও সময়ের স্রোত পেরিয়ে ১৮৭৩ সালের ১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী কলেজ এখন ১৫৩ বছরের পথে। ৩৫ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির ঝুলিতে অপ্রাপ্তির তুলনায় প্রাপ্তিই বেশি। শিক্ষা, সংস্কৃতি, আন্দোলন-সংগ্রাম ও জাতীয় জীবনে অবদানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে রাজশাহী কলেজ।

পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত কলেজটি ঢাকা ও চট্টগ্রাম কলেজের পর বাংলাদেশের তৃতীয় প্রাচীনতম কলেজ। মাত্র পাঁচজন হিন্দু ও একজন মুসলিম ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি সময়ের পরিক্রমায় পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠে। বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত উত্তরবঙ্গের এই শিক্ষাঙ্গন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিংয়েও টানা পাঁচবার সেরা কলেজের স্বীকৃতি পেয়েছে।

প্রাচীন বাউলিয়া ইংলিশ স্কুল ও রাজশাহী জেলা স্কুলের হাত ধরেই রাজশাহী কলেজের পথচলা শুরু। ১৮৭২ সালে দুবলহাটির রাজা হরনাথ রায় চৌধুরীর দানকৃত সম্পত্তি এবং দীঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায়ের দেওয়া ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কলেজের ভবন নির্মাণ করা হয়।

১৮৭৩ সালের ১ এপ্রিল রাজশাহী জেলা স্কুলে এফএ (ফার্স্ট আর্টস) শ্রেণি চালুর মাধ্যমে কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। ১৮৭৭ সালের অক্টোবরে স্নাতক কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি পায় এটি। ১৮৭৮ সালে প্রথম গ্রেডের মর্যাদা পাওয়ার পাশাপাশি ছাত্রসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০০-তে। সে সময়ই এর নামকরণ হয় রাজশাহী কলেজ। একই বছরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তির পর উত্তরবঙ্গের প্রথম কলেজ হিসেবে এখানে বিএ কোর্স চালু হয়।

১৮৮১ সালে স্নাতকোত্তর এবং ১৮৮৩ সালে বিএল কোর্স চালু হয়। ১৮৮৪ সালে নির্মাণ করা হয় কলেজের প্রথম ভবন, যা বর্তমানে প্রশাসনিক ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯০২ সালে পুঠিয়ায় রানি হেমন্তকুমারী তাঁর নামে একটি হোস্টেল এবং কলেজের অধীনে মহারাণী হেমন্তকুমারী সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯০৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টার্স ও বিএল কোর্সের অধিভুক্তি বাতিল করে। এরপর প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় রাজশাহী কলেজ। আইকম, বিকম (পাস) ও বিকম (সম্মান) কোর্স চালু হয় যথাক্রমে ১৯৫২, ১৯৫৪ ও ১৯৬১ সালে।

বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজটিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। চালু রয়েছে উচ্চমাধ্যমিক পাঠক্রমও। তবে শিক্ষার্থী নথিভুক্তি বন্ধ থাকায় ১৯৯৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত উচ্চমাধ্যমিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

রাজশাহী কলেজের অন্যতম বড় আকর্ষণ এর ঐতিহাসিক স্থাপত্য। চীনা কারিগর ও মিস্ত্রিদের হস্তশিল্পের সমন্বয়ে ব্রিটিশশৈলীতে কাঠের সানশেড দিয়ে নির্মিত প্রশাসনিক ভবনটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। হাজী মুহাম্মদ মহসীন ভবন, ফুলার ভবন ও প্রশাসনিক ভবনের মতো লালরঙা স্থাপনাগুলো আজও প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন হয়ে আছে।

ভবনগুলোর স্থাপত্যশৈলী বর্তমান প্রজন্মকে সেই আমলের রাজকীয় নির্মাণরীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। ফলে রাজশাহী কলেজের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে এর লালরঙা ভবনগুলো। পথচারীরাও নীরবে থমকে তাকান এসব স্থাপনার দিকে।

রাজশাহী কলেজ মানেই যেন লাল ভবন আর সবুজ প্রকৃতিতে ঘেরা একটি সুন্দর ও পরিপাটি ক্যাম্পাস। পড়ালেখার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা, সাহিত্যচর্চা, আড্ডা, গল্প কিংবা গান—সবকিছুই চলে সমান তালে। শুধু জ্ঞানার্জন নয়, ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা এরশাদবিরোধী আন্দোলন—বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই কলেজের নাম।

রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. ইব্রাহিম আলী বলেন, “আমি রাজশাহী কলেজ থেকে পড়াশোনা করেছি। যার ফলে আমার এটি একটা অসাধারণ অনুভূতি আছে।”

তিনি বলেন, “১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী কলেজ ইতোমধ্যে ১৫০ বছর অতিক্রম করেছে। এই ১৫০ বছর অতিক্রমের আয়োজনটি বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী এবং রাজশাহী শহরবাসীর জন্য গর্ব ও ভালো লাগার বিষয়। যারা রাজশাহী কলেজকে ধারণ করেন, লালন করেন এবং কলেজকে নিয়ে অহংকার করেন, নিঃসন্দেহে তাদের কাছেও এই আয়োজন ভালো লাগবে।”

অধ্যক্ষ আরও বলেন, “রাজশাহী কলেজের এই বৃহৎ আয়োজনে বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডার স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবেন বলে আমরা আশা করছি। একই সঙ্গে সবার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ