দামে খুশি কৃষক
সাতক্ষীরায় পাটের বাম্পার ফলন
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১৯-০৯-২০২৬ ০১:২৯:২০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৯-০৯-২০২৬ ০১:২৯:২০ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলায় এবার পাটের ফলন সন্তোষজনক। দামও ভালো পাওয়ায় কৃষকরা খুশি। জেলার উপজেলাগুলোর গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে এখন ছড়িয়ে পড়ছে সোনালি রঙ। কোথাও পানিতে জাগ দেওয়া পাট থেকে আঁশ ছাড়াচ্ছেন কৃষক, কোথাও সড়কের ওপর মেলে দেওয়া হয়েছে সদ্য ধোয়া পাট। পাশেই বড় বড় আঁটি করে রাখা হয়েছে পাটকাঠি। কেউ রোদে শুকানোর জন্য আঁশ উল্টে দিচ্ছেন, কেউ শুকনো পাটের আঁটি বাঁধছেন।
সাতক্ষীরা সদর, তালা, কলারোয়া ও আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, কৃষক পরিবারের সদস্যরা পাট কাটার পর আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা।
এবার চলতি মৌসুমে রোগবালাইয়ের প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে সন্তোষজনক দাম পাওয়ায় কৃষকের মুখেও ফুটেছে স্বস্তির হাসি।
এখন জেলার বিভিন্ন এলাকায় চলছে পাট জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ। কোথাও কোমরসমান পানিতে নেমে কৃষকরা পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছেন, আবার কোথাও ভ্যানগাড়িতে পাটের বোঝা নিয়ে বাজারের দিকে যেতে দেখা যাচ্ছে তাদের।
শুক্রবার দুপুরে জেলার সাতক্ষীরা-আশাশুনি সড়কের ধুলিহর এলাকায় পাটের আঁটি বাঁধছিলেন কৃষক মাজেদ আলী। তিনি বলেন, ১৯ দিন পানিতে জাগ দেওয়ার পর তিন-চার দিন আগে পাট থেকে আঁশ ছাড়িয়েছেন। এখন আঁটি বেঁধে শুকাচ্ছেন। ধান কাটার পর জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। কৃষক মাজেদ আলী খরচ বাদ দিয়ে এবার ভালো লাভ হবে বলে আশা করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামারবাড়ি) সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার সাত উপজেলায় মোট ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১১ হাজার ৬০৭ হেক্টর জমিতে। এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে ৬৮ হেক্টর।
চলতি মৌসুমে এসব জমি থেকে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি বেলে প্রায় ১৮২ কেজি পাট থাকে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এবার জেলায় পাটের আবাদ ও উৎপাদন সন্তোষজনক হয়েছে। এখনো কয়েকটি এলাকায় পাট কাটা চলছে। কৃষকরা প্রতি বিঘায় ১২ থেকে ১৫ মণ পর্যন্ত ফলনের কথা জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, পাটের পাতা মাটির উর্বরতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি পাটের আঁশ ও পাটকাঠি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়। তবে জেলায় পাটভিত্তিক কোনো শিল্প না থাকায় উৎপাদিত পাট স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি জেলার বাইরেও বিক্রি হয়।
সোমবার সকালে সদর উপজেলার মাধবকাঠি এলাকায় সড়কের ওপর পাটের আঁশ শুকাতে দেখা যায় এক নারীকে। প্রায় ২০ দিন পানিতে জাগ দেওয়ার পর আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকাচ্ছিলেন তিনি। একই সড়কের পাশে বিলের পানিতে বসে পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছিলেন কয়েকজন কৃষক।
পাটচাষি আশিকুর রহমান বলেন, ১১ শতক জমিতে পাট চাষ করতে বাজার থেকে ৩০০ গ্রাম বীজ কিনে বুনেছিলেন। প্রায় দুই মণ পাট হয়েছে। পাশাপাশি পাটকাঠিও পেয়েছেন। প্রতি আঁটি পাটকাঠি ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারবেন- এমনটা আশা তার।
সাতক্ষীরা সদর, তালা, কলারোয়া ও আশাশুনি উপজেলার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পাটখেতে রোগবালাইয়ের প্রকোপ কম ছিল। সাধারণত পাটে গোড়া পচা, পাতা শুকিয়ে যাওয়া ও বিছা পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। এবার এসব রোগবালাই তুলনামূলক কম হওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
কলারোয়া উপজেলার ঝাপাঘাট গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, পাঁচ কাঠা জমিতে পাট চাষ করেছেন। ৩৪ আঁটি পাটকাঠি হয়েছে। আর পাট হবে আড়াই থেকে তিন মণ। পাট চাষ ও ধোয়া বাবদ প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পাট ও পাটকাঠি বিক্রি করে এবার লাভ থাকবে বলে আশা করছেন তিনি।
তালা উপজেলার ইসলামকাটি এলাকার কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, গতবছর পাটে রোগবালাই বেশি ছিল। বারবার কীটনাশক দিতে হয়েছে। এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় রোগবালাই কম হয়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে। বাজারে পাটের দামও সন্তোষজনক।
কলারোয়ার হেলাতলা এলাকার কৃষক করিম হোসেন বলেন, প্রতিবছর দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেন তিনি। গত বছর ২৫ মণ পাট পেয়েছিলেন। এবার ফলন ভালো হওয়ায় প্রায় ৩০ মণ পাট পাওয়ার আশা করছেন।
পাটের আঁশ ছাড়ানোর পর তা রোদে শুকানোর পাশাপাশি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য পাটকাঠি সংরক্ষণ করছেন কৃষকরা। কোথাও বাড়ির আঙিনায়, আবার কোথাও সড়কের পাশে বড় বড় আঁটি করে রাখা হয়েছে পাটকাঠি।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ দামে মোটামুটি সন্তুষ্ট কৃষকরা। গত বছরও পাটের দাম কাছাকাছি ছিল। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং মৌসুমের শেষ দিকে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সালেহ্ মোহামাদ আবদুল্লাহ বলেন, জেলার পাটকেলঘাটায় পাটের বড়বাজার (মোকাম) রয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসায়ীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে পাট কিনছেন। বর্তমানে কৃষকরা বিভিন্ন মাধ্যমে সহজেই বাজারদর জানতে পারছেন।
সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে ভালো ফলন, তুলনামূলক কম রোগবালাই এবং সন্তোষজনক বাজারদর সাতক্ষীরার পাটচাষিদের স্বস্তি দিয়েছে। মাঠ থেকে আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকানো পর্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যেই এখন সোনালি আঁশ ঘরে তোলার অপেক্ষায় কৃষকরা।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স