শিক্ষিকা রনজিলা হত্যায় নতুন মোড়: র্যাবের ধরা 'ভুল', নতুন দুইজন গ্রেপ্তার
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১৬-০৯-২০২৬ ০৮:২০:০৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৬-০৯-২০২৬ ০৮:২৫:৩২ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় সরাসরি জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে এর আগে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের ওই ঘটনায় কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ডিবি।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম।
ডিবির দাবি, মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) মিরপুরের মনিপুর ও সাভারের বিরুলিয়া এলাকা থেকে খোকন ও রাজীব মাতব্বরকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার সময় রাজীব মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন এবং পেছনে বসে খোকন রনজিলার ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দেন। এতে রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন রনজিলা। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ডিবিপ্রধান জানান, গ্রেপ্তার দুজন ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন। তাদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, রনজিলার ভ্যানিটি ব্যাগ ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
রনজিলার স্বামী মোহাম্মদ আব্দুল মতিনও জানিয়েছেন, ডিবির উদ্ধার করা মালামাল তার স্ত্রী রনজিলা পারভীনের।
এর আগে একই ঘটনায় গত ৩০ আগস্ট র্যাব-২ রাকিব, প্যারা পনি ও সেড্রিক নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। রিমান্ড শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তখন র্যাব জানিয়েছিল, রাকিব ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির মালিক এবং অন্য দুজন তার সঙ্গে ছিলেন। তবে ওই ব্যক্তিরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল কি না, তা নিয়েও তখন প্রশ্ন ওঠে।
ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, ওই তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরবর্তী সময়ে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, গত ২৯ আগস্ট শেরেবাংলা নগর থানার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পূর্ব প্রান্তে জাতীয় সংসদ ভবনের খেজুরবাগানের সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন রনজিলা। ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় তার স্বামী মোহাম্মদ আবদুল মতিন শেরেবাংলা নগর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
ডিবি জানায়, ঘটনার পর ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ছিনতাইকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলে। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে খোকন ও রাজীবকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মঙ্গলবার মিরপুরের মনিপুর পশ্চিমপাড়া থেকে খোকনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ভোলার সদর উপজেলার গজারিয়া এলাকার বাসিন্দা। ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে খোকন ঘটনার সময় মোটরসাইকেলের পেছনে বসে রনজিলার ব্যাগে হ্যাঁচকা টান দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মিরপুর থানার বড়বাগ এলাকা থেকে রনজিলার ছিনতাই হওয়া ভ্যানিটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ব্যাগের ভেতরে তার ব্যবহৃত পোশাক, টিকিটের অংশ, চশমার খাপ ও কিছু ওষুধ ছিল। পরে মিরপুর-১ এলাকা থেকে রনজিলার মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
এরপর ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সাভারের বিরুলিয়া থেকে রাজীব মাতব্বরকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবির দাবি, ছিনতাইয়ের সময় রাজীব মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। এছাড়া রাজীবের কাছ থেকে ৬২২টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি।
ডিবির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, দস্যুতা, চুরি, মারামারি ও দ্রুত বিচার আইনের মামলাসহ মোট আটটি মামলা রয়েছে। খোকনের বিরুদ্ধে মাদকের তিনটি মামলা রয়েছে।
র্যাবের হাতে আগে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরবর্তী সময়ে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা ছিল এবং তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, তারা রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত নন।
ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে খোকন ও রাজীবকে শনাক্ত করা হয়। ফুটেজে ঘটনার সময় একটি মোটরসাইকেলে দুজনকে দেখা যায়। রাজীব সেটি চালাচ্ছিলেন এবং পেছনে ছিলেন খোকন।
ডিবি জানিয়েছে, ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি রাজীবের নিজের। এটি ভাড়া করা হয়নি। মোটরসাইকেলের পাশাপাশি খোকনের পরনের শার্ট, হাতে থাকা ঘড়ি ও মাথায় থাকা ক্যাপও উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ডিবি।
র্যাবের আগের অভিযানে উদ্ধার করা মোটরসাইকেল নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে ব্যাখ্যা দেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, র্যাব তখন ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল। কিন্তু সেটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা মোটরসাইকেলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে পার্থক্য পাওয়া যায়। ফুটেজে থাকা মোটরসাইকেলের রং এবং র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের রং এক নয়।
র্যাবের হাতে আগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে নতুন করে গ্রেপ্তার খোকন ও রাজীবের কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, তদন্তে তাদের মধ্যে কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। নতুন করে গ্রেপ্তার দুজন পশ্চিম মনিপুর এলাকায় থাকেন। আর র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার তিনজন তেজতুরীপাড়া এলাকার। তাদের দুটি পৃথক গ্রুপ বলেও জানান তিনি।
আগে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের রনজিলা হত্যা মামলায় সম্পৃক্ততা না পাওয়া গেলে তাদের এই মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শফিকুল ইসলাম। তবে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা থাকলে সেসব মামলায় আইনগত প্রক্রিয়া চলবে।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় রনজিলার স্বামী ছিনতাইকারীকে এক ঝলক দেখেছিলেন। পরে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তার মনে থাকা ওই ব্যক্তির চেহারার বর্ণনা তদন্তকারীদের জানান। পেছনে বসে থাকা খোকনকে দেখানোর পর তিনি তাকে শনাক্ত করেন বলেও জানিয়েছে ডিবি।
শফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্তে রনজিলার ভ্যানিটি ব্যাগ, মোবাইল ফোন, পরনের পোশাক, ওষুধ ও টিকিটের অংশসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, তদন্তে তথ্য-উপাত্ত ও আলামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ এবং উদ্ধার করা আলামত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তের পরবর্তী ধাপে গ্রেপ্তার দুজনের সঙ্গে ঢাকার অন্য কোনো ছিনতাই বা অপরাধের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স