ঢাকা , বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বের ভয়াবহতম হাম পরিস্থিতি বাংলাদেশে: রয়টার্স

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ০৯-০৯-২০২৬ ০৬:৩১:৫১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৯-০৯-২০২৬ ০৭:০৫:৫০ অপরাহ্ন
বিশ্বের ভয়াবহতম হাম পরিস্থিতি বাংলাদেশে: রয়টার্স ​ছবি: সংগৃহীত
একসময় হাম নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু টিকাদানে ঘাটতি ও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কারণে এখন দেশটি হাম রোগের ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাবের মুখে পড়েছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের এমন তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চে প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত হাম-সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯-এ পৌঁছেছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। দেখা দিয়েছে শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট। একই সঙ্গে প্রতিদিনই হাম আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে আসার সংখ্যা বাড়ছে।

এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের পর থেকেই শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। ওই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত এবং টিকা সরবরাহে সমস্যার ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু হাম থেকে সুরক্ষাহীন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ এই বয়সে নিয়মিত হাম টিকা দেওয়ার সুযোগ থাকে না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে দেশে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৮৩৫। হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯, যার মধ্যে ১০০টি মৃত্যু পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। এ পর্যন্ত ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করার পেছনে দুর্বল কর্মসূচি তদারকি, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং টিকা সংগ্রহের নীতিতে পরিবর্তন বড় ভূমিকা রেখেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে টিকা সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সংসদে তিনি বলেন, টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে সংকট তৈরি হয়েছিল। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত করা এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাতিল করার ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কথা জানিয়েছে। প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

গত এক দশকে হাম প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সাময়িকভাবে টিকাদানের হার কমে যাওয়া ছাড়া বেশির ভাগ সময়ই দেশে হাম টিকার আওতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি ছিল।

রোগতত্ত্ববিদ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানে ঘাটতির কারণেই বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে এর আগে কখনো এত বেশি সংখ্যক শিশুর হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা দেখা যায়নি। একই বছরে এত বেশি রোগীও কখনো দেখা যায়নি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আক্রান্ত ও মৃতদের বড় অংশই শিশু।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, টিকার আওতা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

রোগীর চাপে বিপর্যস্ত হাসপাতাল

হামের পাশাপাশি দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়ছে। ফলে একসঙ্গে দুটি সংক্রামক রোগের চাপ সামলাতে গিয়ে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবার একদিনেই ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৭১ জন—চলতি বছরের এক দিনে যা সর্বোচ্চ।

ঢাকার সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা রাখা হয়েছে। কিন্তু রোগীর চাপ এত বেশি যে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক চিকিৎসক নন্দদুলাল সাহা বলেন, রোগী এত বেশি আসছে যে সবাইকে জায়গা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

১ হাজার ৩৫০ রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা থাকা হাসপাতালটিতে বর্তমানে ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।

হাম রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত শিশুদের স্যালাইনেরও সংকট দেখা দিয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

টিকা না পাওয়ার অভিযোগ

হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ভুগছে শিশুরা। পরিবারগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরতে হচ্ছে। বাড়ছে চিকিৎসার খরচও।

৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগমের ১৩ মাস বয়সী ছেলে প্রায় দুই মাস আগে হাম আক্রান্ত হয়। চারটি হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১০ দিন পর ছাড়পত্র পেলেও এখনো তার জ্বর ফিরে আসছে এবং পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।

নাসিমা জানান, অসুস্থ থাকার কারণে সময়মতো তার ছেলেকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে টিকাদান কেন্দ্রে গেলে সেখানে টিকা পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। তার আগের চার সন্তান নিয়মিত টিকা পেয়েছিল।

আরেক পরিবারও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছে।

কারখানাশ্রমিক মোহাম্মদ রিপনের আট মাস বয়সী মেয়ের শরীরে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার কয়েক দিন পর আবারও ফুসকুড়ি ও হামের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। শেষ পর্যন্ত বিশেষায়িত হাম হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন।

রিপন বলেন, তারা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন, কিন্তু সঠিক তথ্য পাচ্ছেন না।

জরুরি টিকাদানেও পুরোপুরি কাটছে না সংকট

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। এতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি কর্মসূচি দিয়ে সংকট পুরোপুরি সমাধান হবে না। নিয়মিত টিকাদান আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি যেসব শিশু আগে টিকা পায়নি, তাদের জন্য বিশেষ ‘ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচিও প্রয়োজন।

হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ। সাধারণত জ্বর ও শরীরে বিশেষ ধরনের লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তবে দুটি ডোজ টিকা নিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

নাসিমার ভাষায়, আমি শুধু চাই আমার ছেলে সুস্থ হয়ে উঠুক। আর কোনো মাকে যেন নিজের সন্তানকে এই রোগে কষ্ট পেতে বা মারা যেতে না হয়।

বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে

হাম ও উপসর্গে মৃত্যু হাজার ছাড়াল, আক্রান্ত পৌনে দুই লাখ


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ