ঢাকা , রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের ভোট

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ০৬-০৯-২০২৬ ০৪:৩০:১৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৬-০৯-২০২৬ ০৪:৩০:১৬ অপরাহ্ন
ইরান যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের ভোট ​ছবি: সংগৃহীত
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করেছে। গত সপ্তাহ থেকে দুই দেশ আবারও পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়েছে। তবে এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপথে আগামী নভেম্বরের যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকান পার্টি তাদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নির্ধারিত হবে। ফলে নির্বাচনের আগে ইরানের সঙ্গে সংঘাত যেন পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে সতর্কতা রয়েছে।

গত মাসের শেষ দিকে রয়টার্স ও ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। বিপরীতে ৬৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন। সংঘাত শুরুর পর জনমনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতাও ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে।

এ পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন সরাসরি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর বদলে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। গত মাসে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা এবং বিশেষ করে দেশটির কাছ থেকে তেল কেনা ৬০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে অন্য দেশগুলোকেও সতর্ক করা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করলে তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।

পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির আশপাশ ও ইরানের বন্দর এলাকায় মার্কিন নৌবাহিনীর চাপ অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে তেহরানের তেল রপ্তানির ওপরও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

তবে এই কৌশল কত দিন ধরে রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ইরানও সামরিকভাবে পাল্টা জবাব দিলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। বিচ্ছিন্নভাবে হামলা চালিয়ে একদিকে যুদ্ধ না বাড়ানো এবং অন্যদিকে সামরিক চাপ বজায় রাখার নীতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

কেন নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক অবস্থানকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। রিপাবলিকানরা যদি কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে চায়, তাহলে ইরান যুদ্ধ নিয়ে জনমতের বিরোধিতা তাদের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশেষ করে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় যুদ্ধের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর আগে ২০২২ সালে দেশটিতে ডিজেলের দামে রেকর্ড হয়েছিল।

এই পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে আরও অস্বস্তিকর। কারণ নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি জ্বালানির দাম কমানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানি তেলের দামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় নিত্যপণ্যের দামেও চাপ তৈরি হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ছে। বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে জীবনযাত্রার ব্যয়কে অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে সামনে আনছেন।

আগস্টে পলিটিকোর এক জরিপে ৬১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে তাঁদের পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এক মাস আগের তুলনায় এই হার ৪ শতাংশ বেশি।

‘যুদ্ধ নয়, শান্তিও নয়’ ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল

ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, নভেম্বরের নির্বাচন পর্যন্ত সংঘাতকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখার চেষ্টা চলছে। ওয়াশিংটন একদিকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে সামরিক চাপও বজায় রাখছে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইরান সংঘাতের গুরুত্ব কমিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। হোয়াইট হাউসে এক ব্রিফিংয়ে নভেম্বরের নির্বাচনের আগে যুদ্ধ শেষ হবে কি না জানতে চাইলে তিনি এটিকে ‘যুদ্ধ’ বলতে চাননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তখন সক্রিয়ভাবে কোনো গোলাগুলি চলছিল না।

কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সীমিত সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত কঠিন। ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোর্তাজাভির মতে, দুই পক্ষই হয়তো মনে করছে তারা সংঘাতের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু প্রতিবার পাল্টাপাল্টি হামলা হলে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে।

এরই মধ্যে দক্ষিণ ইরানের কুহেস্তাকে একটি বেসামরিক বাড়িতে মার্কিন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। হামলায় শিশুসহ অন্তত চারজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা পেন্টাগনপ্রধান পিট হেগসেথকে সতর্ক করেছেন যে বর্তমান গতিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া টেকসই নয়। এতে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতি ও সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

ইরানের পাল্টা কৌশলও বড় ঝুঁকি

বিপুল সামরিক শক্তির অধিকারী যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধে ইরান বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করছে। তুলনামূলক কম খরচের ড্রোনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যস্ত রাখা, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা এর মধ্যে অন্যতম।

হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই পথে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন হওয়ায় সেখানে অস্থিরতা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

ইরান যদি মার্কিন সামরিক স্থাপনা, জাহাজ বা জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে ওয়াশিংটনের ওপর আরও কঠোর সামরিক জবাব দেওয়ার চাপ বাড়বে। এতে পাল্টাপাল্টি হামলার মাত্রা বাড়ার পাশাপাশি সংঘাত আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলও উল্টো ফল দিতে পারে। তেহরান যদি মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান থেকে সরে আসতে চাইছে, তাহলে তারা আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসির মতে, ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সামরিক হস্তক্ষেপ এড়ানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই আবার বোমা হামলা শুরু হয়েছে। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এক অবস্থান থেকে আরেক অবস্থানে চলে যাচ্ছে।

তেহরানের জন্যও নভেম্বরের নির্বাচন বড় হিসাব

ইরানের সামনে এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব হলো—ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে কখন সবচেয়ে দুর্বল থাকবেন। ইরানের কর্মকর্তারা মনে করতে পারেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে চাপের মুখে ফেলতে পারলে ওয়াশিংটনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়বে।

ত্রিতা পারসির মতে, তেহরান এমনও ভাবতে পারে যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে সংঘাত বাড়ালে ট্রাম্পের ওপর সর্বোচ্চ রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। কিন্তু এই হিসাব অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সংঘাত বাড়লে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আরও বড় সামরিক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে।

নির্বাচনের পর কী হতে পারে

৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পর ইরান নীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন। তবে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফেরার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

রিপাবলিকানরা নির্বাচনে জয়ী হলে ট্রাম্পের হাতে সামরিক পদক্ষেপ বাড়ানোর রাজনৈতিক সুযোগ তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। প্রশাসন নির্বাচনের ফলকে ইরান নীতির প্রতি জনগণের সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতে পারে।

অন্যদিকে রিপাবলিকানরা পরাজিত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। কংগ্রেসের একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়বে। যুদ্ধের কর্মকাণ্ড নিয়ে শুনানি, তদন্ত এবং সামরিক ব্যয়ের অনুমোদন নিয়েও কংগ্রেসে বাধার মুখে পড়তে পারে প্রশাসন।

তবে নির্বাচনে পরাজয় ট্রাম্পকে আরও সংযত করবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। বরং রাজনৈতিকভাবে বড় ধাক্কা খেলে তিনি আরও কঠোর ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

ফলে নভেম্বরের নির্বাচন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য নয়, ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচন পর্যন্ত সংঘাত সীমিত রাখা সম্ভব হবে, নাকি পাল্টাপাল্টি হামলা শেষ পর্যন্ত বড় যুদ্ধে রূপ নেবে, তার অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী দুই মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সিদ্ধান্তের ওপর।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ