কয়লাভিত্তিক প্ল্যান্টেই কমবে বিদ্যুতের ঘাটতি
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
২৯-০৮-২০২৬ ০৩:৩২:৪১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৯-০৮-২০২৬ ০৩:৩২:৪১ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
তীব্র গ্যাস সংকট এবং কয়লা পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বর্ষাকালের নানা বিঘ্নতার কারণে বাংলাদেশ গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসের শুরুর দিকে প্রতি ঘণ্টায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছানোয়, দেশের অন্যতম বৃহৎ একটি বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে বিনিয়োগের কৌশলগত গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এস এস পাওয়ার ওয়ান হলো চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারায় অবস্থিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এস আলম গ্রুপ, চীনের সেপকো থ্রি ইলেকট্রিক পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এবং এসটিজি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপের যৌথ অংশীদারিত্বে নির্মিত এই প্রকল্পে প্রায় ২৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম বৃহৎ একক শিল্প বিনিয়োগ। ব্যাংক অব চায়নার নেতৃত্বে প্রায় ১৭৫ থেকে ১৮০ কোটি ডলারের একটি সিন্ডিকেটেড ঋণ সুবিধার মাধ্যমে এর অর্থায়ন নিশ্চিত করা হয় এবং চায়না এক্সিম ব্যাংক এতে এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সি হিসেবে ভূমিকা রাখে।
এস এস পাওয়ার ওয়ানের একটি বড় মাইলফলক অর্জিত হয় ২০২৩ সালে, যখন এর প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হয়।
একই বছরের অক্টোবরের মধ্যে কেন্দ্রটির ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিটই বাণিজ্যিক উৎপাদনে চলে যায়। বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি শিল্প গ্রুপের জন্য এটি প্রকৌশল ও অর্থায়নের দিক থেকে এক বিশাল অর্জন ছিল। আধুনিক সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে নির্মিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আমদানিকৃত কয়লার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা এর নিজস্ব বিশেষ গভীর পানির জেটির মাধ্যমে খালাস করা হয়। এর ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির পাশাপাশি দেশের জ্বালানি আমদানি ও লজিস্টিকস সক্ষমতাও কিছুটা প্রসারিত হয়েছে।
প্রকল্পটির বাণিজ্যিক শর্তগুলো মূলত ভোক্তাদের কথা মাথায় রেখেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১৬ সালে অনুমোদিত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদী বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) অনুযায়ী, এস এস পাওয়ার প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৬ টাকা ৬১ পয়সা দরে বিক্রি করে। বর্তমান সময়ে যখন জাতীয় গ্রিডকে ঘাটতি মেটাতে তুলনামূলক ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হয়, তখন এই বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বর্তমান সংকটে বিপিডিবির ফার্নেস অয়েল বা এইচএফও ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দৈনিক খরচ প্রায় ৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। ফলে বাঁশখালীতে উৎপাদিত প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ যখন তেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদনকে প্রতিস্থাপন করে, তখন তা একদিকে যেমন সরকারি ব্যয় কমায়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের মূল্যঝুঁকি থেকে বাংলাদেশকে একধরনের সুরক্ষা দেয়।
২০২৩-২৪ সালের ডলার সংকটের কারণে কয়লা আমদানিতে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল, যার ফলে কেন্দ্রটির উৎপাদনও কিছুটা কমে যায়। তারপরেও কেন্দ্রটি বারবার উৎপাদনে ফিরে এসেছে। জ্বালানি সরবরাহ এবং বকেয়া পাওনা নিয়ে নিষ্পত্তির পর, ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্ল্যান্টটির লোড ফ্যাক্টর বা উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার প্রায় ৭৫ শতাংশে উন্নীত হয়। ২০২৬ সাল জুড়ে, এমনকি একটি ইউনিট চালুর অপেক্ষায় থাকা সত্ত্বেও, প্ল্যান্টটি নিয়মিতভাবে প্রায় ৫৬০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে গেছে।
বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এই কারণে যে, বিপিডিবির কাছে কোম্পানিটির বকেয়া পাওনার পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বলে জানা গেছে। এই বিশাল বকেয়া নগদ অর্থের প্রবাহে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে এবং নতুন কয়লার চালান আমদানির অর্থায়ন কঠিন করে তুলেছে।
তা সত্ত্বেও এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির নিরবচ্ছিন্ন সচল থাকা অত্যন্ত জরুরি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশের তিনটি প্রধান কয়লাভিত্তিক স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক—এস এস পাওয়ার, আদানি গ্রুপের গোড্ডা প্ল্যান্ট এবং আরএনপিএল—তাদের সম্মিলিত ৪ হাজার ২৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিপরীতে মাত্র ১ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল। একই সময়ে দৈনিক লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট।
হিসাবটি খুবই পরিষ্কার: এই দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুতের সরবরাহ ঘাটতি দূর করতে হলে বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে হবে। পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে গেলে একা বাঁশখালী প্ল্যান্টটিই বর্তমান গড় ঘাটতির প্রায় অর্ধেক পূরণ করতে পারে। তাছাড়া প্রকল্পটির গুরুত্ব কেবল গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর নির্মাণ ও অপারেশন পর্যায়ে চট্টগ্রামের তুলনামূলক অনুন্নত একটি উপকূলীয় উপজেলায় হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আন্তর্জাতিক ইপিসি অংশীদারদের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও জ্ঞান হস্তান্তরের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি, বন্দর ও জেটির অবকাঠামো স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে এবং স্থানীয় সরকারের জন্য স্থায়ী রাজস্বের উৎস তৈরি করেছে।
এমন এক সময়ে যখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিকারকরা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহকে সবচেয়ে বড় শর্ত বলে মনে করেন, তখন এস এস পাওয়ারের মতো কেন্দ্রগুলো থেকে পাওয়া নির্ভরযোগ্য অবিরাম বিদ্যুৎ দেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি প্রতিযোগিতাকেও জোরদার করেছে। সূত্র: কালের কণ্ঠ
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স