খালে বন্দি জীবন!
স্কুল কিংবা হাসপাতাল, সবখানেই বাধা ফাইতং খাল
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৪-০৮-২০২৬ ০৪:১২:৫৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৪-০৮-২০২৬ ০৫:৫৫:৩০ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
একটি সেতু—কতই বা বড় দাবি? কিন্তু বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কুজ্জাখেলা পাড়ার প্রায় ৩০০ পরিবারের কাছে এটি যেন বহু বছরের অধরা স্বপ্ন। দিন যায়, বছর পেরোয়, কিন্তু বদলায় না তাদের দুর্ভোগ। এই পাড়ার মানুষের চলাচলের প্রধান বাধা ফাইতং খাল।
শুষ্ক মৌসুমে কোনোভাবে খাল পেরোনো গেলেও বর্ষা এলেই বদলে যায় পরিস্থিতি। পাহাড়ি ঢলে ফুলে-ফেঁপে ওঠে খাল, বেড়ে যায় পানির স্রোত। তখন বুকসমান পানির স্রোত পেরিয়ে চলাচল করতে হয় স্থানীয়দের। নারী, শিশু, বৃদ্ধ কিংবা শিক্ষার্থী— কেউই বাদ যায় না এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা থেকে। তবে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হয় পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে।
রাতের আঁধারে কোনো রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসার পাশাপাশি স্বজনদের বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় খাল পার হওয়া। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পানির স্রোত বেড়ে গেলে রোগীকে কাঁধে করে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। পাড়ায় অ্যাম্বুলেন্স বা অন্য কোনো যানবাহন পৌঁছানোর সুযোগ নেই। ফলে একদিকে অসুস্থ রোগীর কষ্ট, অন্যদিকে উত্তাল পানির স্রোত— স্বজনদের তখন সময়ের সঙ্গে লড়াই করেই হাসপাতালে ছুটতে হয়।
একটি সেতুর অভাবে কুজ্জাখেলা পাড়ার মানুষের কাছে হাসপাতাল যেন হয়ে ওঠে অনেক দূরের পথ। শুধু রোগী নয়, প্রতিদিন শিক্ষার জন্যও ঝুঁকি নিতে হয় এখানকার শিক্ষার্থীদের। পাড়ায় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কলেজপড়ুয়াও রয়েছে। ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে যেতে হলে বর্ষায় অনেক সময় বুকসমান পানির স্রোত পেরিয়ে চলাচল করতে হয় তাদের।
বৃষ্টির দিনে সন্তান স্কুলে যাওয়ার পর নিরাপদে বাড়ি ফিরবে কি না— এমন দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় অভিভাবকদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সেতুর অভাবে বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার আবেদন ও যোগাযোগ করা হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, আর প্রতিশ্রুতি নয়— এবার প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ। ফাইতং খালের ওপর দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করে কুজ্জাখেলাবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান করা হোক।
কুজ্জাখেলা পাড়ার বাসিন্দা ফারুক শিকদার বলেন, বাড়িতে কেউ অসুস্থ হলে তখন সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে। বৃষ্টি হলে খালের পানি বেড়ে যায়। রোগীকে নিয়ে কীভাবে হাসপাতালে যাব— এই চিন্তায় থাকতে হয়। একটি ব্রিজের জন্য আমরা এত বছর ধরে কষ্ট করছি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য স্রৈমাঅং মার্মা বলেন, কুজ্জাখেলা পাড়ার মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগী ও প্রসূতি নারীদের নিয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হয়। খালে পানি বেড়ে গেলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ব্রিজ নির্মাণের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা পরিষদে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এখনো বাস্তব কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ফাইতং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক বলেন, এলাকার মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি তারা জানেন। সেতু নির্মাণের জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে এখনো কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, এটি শুধু রাস্তা বা যোগাযোগের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে মানুষের জীবন ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার বিষয়টি জড়িত। দ্রুত ব্রিজ নির্মাণ করা জরুরি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ফাইতং খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণে উদ্যোগ নেবে। আর বুকসমান পানির স্রোত পেরিয়ে স্কুলে যাওয়া কিংবা অসুস্থ স্বজনকে কাঁধে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার দিন শেষ হবে— এটাই এখন কুজ্জাখেলাবাসীর অপেক্ষা।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স