ঢাকা , শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬ , ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের শর্টকাট সমাধান দেখছে না সরকার

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ২১-০৮-২০২৬ ১১:৪২:১৩ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ২১-০৮-২০২৬ ১১:৪২:১৩ পূর্বাহ্ন
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের শর্টকাট সমাধান দেখছে না সরকার ফাইল ছবি
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নাভিশ্বাস অবস্থা থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করতে শর্টকাট কোনো পথ দেখছে না সরকার। হঠাৎ করে জ্বালানি সংকট, ভাসমান টার্মিনাল মেরামতে বিলম্ব এবং প্রতিশ্রুত এলএনজি কার্গো না আসার বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

চলমান এ ভয়াবহ সংকটের কবল থেকে উত্তরণের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ তদারক টিমের সদস্যরা বৈঠক করেন। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিশেষ এ বৈঠক হয়। বৈঠকে হঠাৎ করে সমস্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ উদঘাটনের পাশাপাশি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা আমার দেশকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

বৈঠকে সরকারের নীতিনির্ধারকরা ছাড়াও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ এবং এর অধীন বিভিন্ন সংস্থার প্রধানরা অংশ নেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদের কাছে প্রশ্ন ছিল—বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা থেকে দেশবাসী কবে নাগাদ মুক্তি পাবে? আমার দেশ-এর এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি দেখভালের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় রয়েছে। তারাই এ বিষয়ে বলবেন।

একই প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছি। তিনিও কিছু নির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়েছেন। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করছি। শিগগির দেশবাসী এর সুফল পাবে। 

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি। গত ১৮ বছর ধরে দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্রের অনুসন্ধান তেমন একটি হয়নি। আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে জ্বালানি খাত। চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকার পরও জ্বালানি সংকটের কারণে তীব্র লোডশেডিং হচ্ছে। এসব সমস্যার রাতারাতি সমাধান সম্ভব হবে না—এ বিষয়গুলো বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকে সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলাসহ দ্রুত অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানি আমদানিতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করে উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে এনে স্থায়ী সমাধানের জন্য তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে বলেও প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয় জ্বালানি বিভাগ থেকে।

সরকারের দেওয়া তথ্যমতে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩,৮০০ এমএমসিএফডি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত ইকোনমিক ও শিল্পকারখানাসহ গ্যাসের প্রকৃত চাহিদা ৫,০০০ এমএমসিএফডির বেশি। বিশাল এ চাহিদার বিপরীতে গতকাল ২,১৯৫ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১,৬২৫ এমএমসিএফডি আর এফএসআরইউয়ের মাধ্যমে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ৫৭০ এমএমসিএফডি। গতকাল গ্যাসের ঘাটতি ছিল ১,৬০৫ এমএমসিএফডি। আর এ ঘাটতির প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন, বাসাবাড়ির রান্নাবান্না ও শিল্প-কারখানায়।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, দেশে প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ ছিল ৭,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর প্রভাব পড়েছে সারা দেশে। রাতারাতি এ সংকট সমাধানযোগ্য নয় বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে জানান। স্বল্পমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার আওতায় জনগণকে কীভাবে স্বস্তি দেওয়া যায়, সে বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান একজন কর্মকর্তা।

গ্যাস বিদ্যুতের সমস্যা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ভুলনীতির ফল বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরাও। তাদের মতে, দেশে গ্যাসের অনুসন্ধান না করা ছিল বিগত সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ছিল ২৯.৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২.১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট আছে ৭.৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। দৈনিক ১,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ করা হলে ওই অবশিষ্ট ৭.৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুতের ভিত্তিতে আনুমানিক ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব হবে। নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে এক যুগ পর বাংলাদেশ প্রাকৃতিক গ্যাস শূন্য হয়ে যাবে বলে মনে করছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশসংবাদ

সূত্র আরো জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া প্রতি ঘনমিটারের গড় মূল্য পড়েছে তিন টাকা ৩৯ পয়সা। একই পরিমাণ গ্যাস আমদানিতে খরচ পড়েছে ৬৮ টাকা ৭১ পয়সা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া ৭২.২১ শতাংশ গ্যাসের দাম পড়েছে ৬৬২৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। একই সময়ে আমদানিকৃত ২৬.৮৯ শতাংশ গ্যাসের দাম পড়েছে ৪৩ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে চলতি বছর এলএনজি আমদানি ব্যয় ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও জানান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছেন। বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতেও আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। বর্তমানে যে গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ হলো বাংলাদেশের সীমিত এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করার সক্ষমতা।

তিনি বলেন, একসময় গ্যাস ছিল বাংলাদেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু গত ১৭ বছরে স্বৈরাচারী সরকার নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে উদ্যোগ নেয়নি। পুরো জ্বালানি খাতকে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা হয়েছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশের মাটিতে নতুন গ্যাসের সন্ধান ও অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মাধ্যমে এই কাজ এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য হলো দেশের গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের মানুষের হাতেই রাখা। সূত্র : আমার দেশ

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ