ঢাকা , বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬ , ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংকুচিত হচ্ছে মাসিক বাজেট: বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৯-০৮-২০২৬ ০৩:৩৮:১৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৯-০৮-২০২৬ ০৩:৪৫:০৮ অপরাহ্ন
সংকুচিত হচ্ছে মাসিক বাজেট: বাড়ছে  জীবনযাত্রার ব্যয় ছবি: এআই
খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে জ্বালানি, পরিবহন, বাসাভাড়া ও ইউটিলিটি বিল—জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ অনুভব করছে সাধারণ পরিবার। আয় একই হারে না বাড়ায় মাসের শুরুতেই তৈরি হচ্ছে হিসাবের টানাপোড়েন। প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে কমাতে হচ্ছে পোশাক, বিনোদন, বাইরে খাওয়া কিংবা অন্যান্য অপেক্ষাকৃত কম জরুরি ব্যয়। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে নিম্ন ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলো।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন বাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খুচরা দর সংগ্রহ করে। সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে দেখা যাচ্ছে, সব পণ্যের দাম একইভাবে না বাড়লেও ভোজ্যতেল, ডাল, আটা, লবণ, রসুন, ডিম, গুঁড়া দুধসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে ভোক্তাদের। মৌসুমি কারণে বিভিন্ন সময়ে সবজির দামেও ওঠানামা করছে। অন্যদিকে চালের বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা থাকলেও শুধু একটি বা দুটি পণ্যের দাম স্থির থাকায় সামগ্রিক পারিবারিক ব্যয়ের চাপ কমছে না। কারণ একটি পরিবারের মাসিক খরচ কেবল খাদ্যপণ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও মোবাইল-ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন খাতে নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মূল্যস্ফীতির তথ্যেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপের চিত্র পাওয়া যায়। সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও এর অর্থ এই নয় যে বাজারে পণ্যের দাম আগের জায়গায় ফিরে এসেছে। মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ হলো আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তি দামে পণ্য কিনতে থাকা পরিবারগুলোর ওপর চাপ থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারে এই চাপ আরও স্পষ্ট। মাসিক আয় নির্দিষ্ট থাকায় বাজারে কোনো একটি পণ্যের দাম বাড়লেও পুরো বাজেট নতুন করে সাজাতে হয়। খাবারের ব্যয় বাড়লে কমে যায় সঞ্চয়, চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতের বরাদ্দ। অনেক পরিবারকে মাসের শেষ দিকে ধারদেনা করেও দৈনন্দিন খরচ চালাতে হচ্ছে।

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান। মাসিক আয় বাড়লেও যদি একই সময়ে খাদ্য, বাসস্থান, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় দ্রুত বাড়ে, তাহলে প্রকৃত সঞ্চয় কমে যায়। ফলে একটি পরিবার আগে যে পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করতে পারত, এখন তা দিয়ে মাসের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক চাকরিজীবী বলেন, কয়েক বছর আগেও মাসের শুরুতে প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব হতো। এখন একই আয়ে বাজার, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে মাসের শেষ দিকে হাতে তেমন কিছু থাকে না। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তার ভাষ্য, পণ্যের ক্রয়মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা চালাতে আগের চেয়ে বেশি মূলধন প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় সব বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করাও সম্ভব হচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে স্বল্পমেয়াদে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বাজার তদারকি জোরদারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কম দামে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিবারের মাসিক বাজেটের ওপর চাপ কমাতে প্রয়োজন আয় বৃদ্ধির সুযোগ এবং স্থিতিশীল বাজারব্যবস্থা। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সাধারণ পরিবারের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয়ের বাস্তব চাপ এখনো বড়। মাসের শুরুতে যে আয় দিয়ে প্রয়োজনীয় খরচের হিসাব করা হয়, মাস শেষ হওয়ার আগেই সেই হিসাব বদলে যাচ্ছে। ফলে সংসারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে প্রয়োজনীয় খরচ সামলানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে অনেক পরিবারের মাসিক বাজেট।

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ