ঢাকা , বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬ , ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​চীনের অর্থনীতির রূপকার ঝু রংজি মারা গেছেন

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ১২-০৮-২০২৬ ০৭:২৭:৫৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১২-০৮-২০২৬ ০৮:৪২:২৮ অপরাহ্ন
​চীনের অর্থনীতির রূপকার ঝু রংজি মারা গেছেন ​ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে চীনের উন্মুক্ততা বাড়ানোর প্রধান কারিগর এবং দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, বেইজিংয়ের স্থানীয় সময় বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে অসুস্থতাজনিত কারণে ঝু রংজির মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।

তীক্ষ্ণভাষী ও সংস্কারপন্থী এই অর্থনীতিবিদ ১৯৯০-এর দশকে রাষ্ট্রীয় শিল্প খাতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে তাঁর নেতৃত্বেই চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগ দেয়।

১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রী এবং দেশটির সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক পদে থাকার সময় তিনি ব্যাপক ও দ্রুতগতির অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন করেন। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো দক্ষ ও লাভজনক করার উদ্যোগ নিতে গিয়ে ঝু রংজি কমিউনিস্ট পার্টির রক্ষণশীল অংশ এবং রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্তাদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ান। 

তাঁর সংস্কারের ফলে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারালেও এসব পদক্ষেপ চীনের অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করতে সহায়তা করে। পরবর্তী সময়ে চীন ২০১০ সালে জাপানকে ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়।

১৯৯৮ সালে ৬৯ বছর বয়সে চীনের প্রধানমন্ত্রী হন ঝু। সরকারি অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার পাশাপাশি সরকারের ব্যর্থতার দায় নিজের ওপর নেওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। 

কঠোর প্রশাসনিক শৈলীর কারণে তার ডাকনাম হয়েছিল ‘বস’ এবং ‘ঝু ফেংজি’—অর্থাৎ ‘পাগল ঝু’। ১৯৯৮ সালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান বোঝাতে ঝু বলেছিলেন, তিনি ১০০টি কফিন প্রস্তুত রেখেছেন—৯৯টি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য এবং একটি নিজের জন্য।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ১৯৯০-এর দশকে উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঝু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি মূল্যনিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন এবং লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দেওয়া বন্ধ করেন। স্থানীয় নেতাদের বিরোধিতা সত্ত্বেও এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি নিয়ে দলের রক্ষণশীল অংশের সঙ্গে বিরোধেও একই ধরনের দৃঢ় অবস্থান নেন।

চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টায়ও ঝু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮০-এর দশকে শুরু হওয়া দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন প্রশাসনের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। তবে ওয়াশিংটন তার প্রস্তাবকে অপর্যাপ্ত মনে করে প্রত্যাখ্যান করে। দেশে তার রাজনৈতিক বিরোধীরা আবার অভিযোগ তোলে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ছাড় দিতে চেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ঝু রাজনৈতিকভাবে টিকে যান এবং ২০০১ সালের ডিসেম্বরে চীন ডব্লিউটিওতে যোগ দেয়।

১৯৯৮ সালে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির উদ্যোগের মাধ্যমে চীনে বাড়ির মালিকানা বৃদ্ধির নতুন যুগের সূচনা হয়। পরিবারগুলো ব্যাপকভাবে বাড়ি কিনতে শুরু করে এবং এক দশকের মধ্যে দেশটির শহরাঞ্চলের অধিকাংশ আবাসন ব্যক্তিমালিকানাধীন হয়ে যায়।

তবে ঝু মুক্তবাজারের প্রবক্তা ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন দক্ষ এক আমলা, যিনি কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশনা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় শিল্প খাতকে আরো কার্যকর করার চেষ্টা করেন। ব্যাংক, বিমান সংস্থা, তেল কম্পানিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে লাভভিত্তিক করপোরেশনে রূপান্তরের পরিকল্পনা প্রণয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানা সরকারের হাতেই রাখার পক্ষে ছিলেন তিনি।

ঝু সরকারি ব্যর্থতার দায় স্বীকার করতেও পিছপা হতেন না। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় ৪ হাজার ১৫০ জনের মৃত্যু এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর তিনি কিছু বাঁধের দুর্বলতা নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানান। এ ছাড়া ২০০১ সালে দক্ষিণ চীনের একটি স্কুলে বিস্ফোরণে অন্তত ৪২ জন নিহত হওয়ার পর জাতীয় টেলিভিশনে সরকারের ব্যর্থতার জন্য ক্ষমা চান তিনি।

জনসমক্ষে রসিকতা করেও দলের প্রচলিত নিরস ভাবমূর্তি কিছুটা বদলে দিয়েছিলেন ঝু। তবে শেষমেশ প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়ার পর অবশ্য তাকে খুব কমই জনসমক্ষে দেখা গেছে। 

উল্লেখ্য, তীক্ষ্ণভাষী ও সংস্কারপন্থী এই অর্থনীতিবিদ ১৯২৮ সালের ২৩ অক্টোবর দেশটির হুনান প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। অর্থনৈতিক পরিকল্পনাবিদ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও ১৯৫৭ সালে হাঙ্গেরি ও যুগোস্লাভিয়ার সংস্কারের প্রশংসা করায় তাকে ‘ডানপন্থী’ আখ্যা দিয়ে ২২ বছর রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তাকে গ্রামে শ্রমিকের কাজ করতে পাঠানো হয়।

১৯৭৯ সালে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার পর দ্রুত উত্থান ঘটে তার। ১৯৮৭ সালে সাংহাইয়ের উপদলীয় সম্পাদক এবং পরের বছর মেয়র হন। ১৯৮৯ সালে সাংহাইয়ের মেয়র হিসেবে গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে তিনি মধ্যপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিতি পান।

১৯৯১ সালে উপপ্রধানমন্ত্রী এবং ১৯৯৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর স্থায়ী কমিটির সদস্য হন ঝু। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ