কচুরিপানায় ঐতিহ্য হারাচ্ছে রাজদিঘি
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১২-০৮-২০২৬ ০২:৫৫:৫০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১২-০৮-২০২৬ ০৩:৩৩:৩৬ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া চৌধুরী অভিনীত ‘সন্ন্যাসী রাজা’ সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৫ সালে। এর তিন যুগের বেশি সময় পর ২০১৮ সালে যিশু সেনগুপ্ত ও জয়া আহসান অভিনীত ‘এক যে ছিল রাজা’ সিনেমাও নির্মিত হয় একই ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। দুটি সিনেমারই পটভূমি বাংলাদেশের ভাওয়াল রাজপরিবারের ঘটনাবহুল ইতিহাস।
গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ি বর্তমানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেই রাজপরিবারের ইতিহাস, সম্পদ ও প্রতিপত্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা। এরই একটি ভাওয়াল রাজদিঘি, স্থানীয়ভাবে যা ‘ঢোলসমুদ্র’ নামেও পরিচিত।
তবে ঐতিহাসিক সেই রাজদিঘি এখন কচুরিপানা, ময়লা-আবর্জনা ও অব্যবস্থাপনায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিনের অযত্নে দিঘিটির অধিকাংশ অংশ ঢেকে গেছে কচুরিপানায়। কোথাও কোথাও ফেলা হচ্ছে পলিথিন ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। ফলে একসময়কার স্বচ্ছ পানির দিঘিটি এখন পরিণত হয়েছে দূষিত জলাশয়ে। ইতিহাসের সাক্ষী এই জলাধারের এমন করুণ পরিণতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে সরেজমিন দেখা যায়, ভাওয়াল রাজদিঘির প্রায় পুরো অংশই ঘন কচুরিপানায় ঢেকে আছে। কোথাও স্বচ্ছ পানির দেখা নেই। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, বিশাল জলাশয়টি যেন সবুজ কোনো মাঠ।
দিঘির পশ্চিম ও উত্তর অংশে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ ও ময়লা-আবর্জনা। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বর্জ্য ফেলার কারণে পানির গুণগত মানও নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় এই দিঘিতে প্রতিদিন শত শত মানুষ গোসল ও সাঁতার কাটতেন। দিঘির শান বাঁধানো ঘাট ছিল স্থানীয়দের অন্যতম আড্ডা ও বিনোদনের স্থান। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন দিঘিটির অধিকাংশ অংশ কচুরিপানায় ঢাকা।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৮৩৫ সালে ভাওয়াল সন্ন্যাসী রাজা রামেন্দ্র নারায়ণের পিতামহ জমিদার কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী এই দিঘি খনন করেন।
গাজীপুর মহানগরীর বাসিন্দা বুরহানউদ্দিন অরণ্য বলেন, ‘শৈশবের অনেক স্মৃতি রয়েছে ভাওয়াল রাজদিঘিকে ঘিরে। বন্ধুরা দলবেঁধে খেলাধুলা শেষে রাজদিঘীর শান বাঁধানো ঘাটে কত ঝাঁপাঝাপি, সাঁতার কেটেছি। একসময় দিঘির পানি খুবই স্বচ্ছ ছিল। অযত্ন-অবহেলার কারণে আজ ঐতিহাসিক রাজদিঘী অস্তিত্ব সংকটে। এটি মারাত্মক অবহেলার ছাপ।’
নগরীর বাসিন্দা মো. কাজল মিয়া বলেন, ‘দিঘির উত্তর পাশে কয়েকটি অংশে যত্রতত্র পলিথিন ব্যাগসহ ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এটি রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। পুরো দিঘি কচুরিপানায় ভরা। দিঘিতে পানি আছে নাকি সবুজ মাঠ—দূর থেকে বোঝা যায় না।’
তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিক রাজদিঘিটি পরিষ্কার ও সংস্কার করা হলে এটি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় একটি স্থান হতে পারে। এতে নগরবাসীও উপকৃত হবে।’
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, ‘ভাওয়াল রাজার আমলের ঐতিহাসিক জলাধার হিসেবে পরিচিত ভাওয়াল রাজদিঘী সংস্কার ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। একটি ঐতিহাসিক জলাধারের এমন করুণ পরিণতি অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শনটি একসময় বিলীন হয়ে যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ভাওয়াল রাজদিঘীকে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করে একটি নান্দনিক, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক বিনোদনকেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব। এজন্য প্রথমেই দিঘির কচুরিপানা, আবর্জনা ও অন্যান্য দূষণ অপসারণ করে পানির গুণগত মান ও জলজ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।’
মনির হোসেন আরও বলেন, ‘দিঘির চারপাশে পরিকল্পিতভাবে কাঠের ওয়াকওয়ে, বসার স্থান, সবুজায়ন ও জীববৈচিত্র্যবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে এটি নগরবাসীর জন্য আকর্ষণীয় উন্মুক্ত বিনোদন ও অবসরকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘একটি জীবন্ত জলাশয় শুধু মানুষের বিনোদনের জন্য নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিবেশ। সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন দিঘী মাছ, জলজ প্রাণী, পাখি এবং বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে জলাশয়টি স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা কমানো এবং মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখতে পারে।’
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘ইতিমধ্যে সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে রাজদিঘির সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু পরিষ্কার নয়, দিঘীটিকে ঢেলে সাজানো হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে এটি শহরের অন্যতম সুন্দর স্থান হিসেবে জায়গা করে নেবে।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স