কলাপাড়ায় বহুমুখী সংকটে মাধ্যমিক শিক্ষা
ষষ্ঠ থেকে দশমে উঠতেই ঝরে পড়ছে ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৯-০৮-২০২৬ ০৫:৪৭:৩৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৯-০৮-২০২৬ ০৫:৫৮:৩৫ অপরাহ্ন
সংবাদচিত্র : ফোকাস বাংলা নিউজ
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় মাধ্যমিক শিক্ষা ভয়াবহ সংকটে পতিত হয়েছে। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পৌছতে গড়ে ঝরে পড়ছে এক তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী। কোন কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়ছে শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি। দরিদ্রতার পাশাপাশি বাবা-মায়ের সংসারের আর্থিক যোগান দিতে গিয়ে ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়ছে। আবার বাল্যবিয়ের কারণে অসংখ্য ছাত্রী শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে। তবে দারিদ্র্য আর বাল্যবিয়ে এখনো ঝরে পড়ার প্রধান কারণ।
এছাড়া যথাযথভাবে বিদ্যালয়ে পাঠদান করানো হয় না। কতিপয় শিক্ষক স্কুলে নিয়মিত যান না। গেলেও নির্দিষ্ট সময়ের আগে স্কুল থেকে ফিরে যান। ক্লাশে পাঠদান না করে প্রাইভেটে ও বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারে পড়তে বাধ্য কিংবা উৎসাহ দেয়ার ঘটনায় দরিদ্র শিক্ষার্থীরা সঠিক পাঠদান থেকে বঞ্চিত থাকছে। ক্লাসমুখি হচ্ছে না অর্ধেক শিক্ষার্থী। এভাবে মাধ্যমিক শিক্ষায় ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও অষ্টম থেকে দশম শ্রেণিতে পৌছানোর আগেই গড়ে এক তৃতীয়ংাশ শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে। কলাপাড়ার মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া তথ্যে এমন সংকটের চিত্র পাওয়া গেছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের দেয়া তথ্যানুসারে, ২০২২ সালে কলাপাড়ার ২৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির মোট শিক্ষার্থী ছিল ২৩০৮ জন। এর মধ্যে ছাত্র-১১৪২ এবং ছাত্রী ১১৬৬জন। এই ব্যাজটির শিক্ষার্থীরা এবছর (২০২৬) দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। কিন্তু শিক্ষার্থী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫২৫ জনে। কমেছে ৭৮৩ জন, ঝরে গেছে। যার মধ্যে ছাত্র ৩৯৪ ও ছাত্রী ৩৮৯ জন। শতকরা হারে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যানুসারে ষষ্ঠ থেকে দশমে পৌছতে ৩৩ দশমিক ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে গেছে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে এসব তথ্য।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে খেপুপাড়া মডেল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই প্রতিষ্ঠানে ২০২২ সালে ষষ্ঠতে শিক্ষার্থী ছিল ২৯৮ জন। ছাত্র ১৭৯, ছাত্রী ১১৯ জন। এরা এখন দশমে অধ্যয়নরত। কিন্তু সংখ্যা ১৫২ জন, কমেছে ১৪৬ জন। শতকরা ৪৮ দশমিক ৯৯ ভাগ ঝরে গেছে। যার মধ্যে ছাত্র ৮৮ জন, আর ছাত্রী ৫৮ জন। ষষ্ঠে থাকা ২৯৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে অষ্টমে পৌছতে শিক্ষার্থী ছিল ২৪৮ জন। কমেছে ৩১ জন। নবমে গিয়ে পৌছেছে ১৫৫ জনে। শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির এখন শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
শিক্ষাব্যবস্থাপনায় নেই কোন শৃঙ্খলা। অভিযোগ দুপুরের পরে শিক্ষার্থীরা অধিকাংশ ক্লাশে আসে না। আবার নবম ও দশমে উপস্থিতি কোন কোন শাখায় শূণ্যে পৌছেছে। অভিযোগ রয়েছে কতিপয় শিক্ষক বিকাল থেকে রাত অবধি ৭-৮ বিষয়ে প্রাইভেট কোচিংএ শিক্ষাদান করেন। বাণিজ্যিক শিক্ষার ধকলে এই প্রতিষ্ঠানটির চরম বেহাল দশা। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, যে বিষয়ে নিয়োগ দেয়া শিক্ষক তিনি ওই বিষয় পড়ান না। পড়ায় তার ভালো লাগা বিষয়ে।
খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল ১৪৮ জন। যারা এখন দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত রয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা পৌছেছে ১০০ জনে। কমেছে ৪৮ জন। একই দৃশ্য লালুয়া সুরাতখান জয়নব বিবি (এসকেজেবি) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ৫১ জন। এরা এখন দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত, কিন্তু সংখ্যা মাত্র ২১ জন। যার মধ্যে ছাত্র ৯ জন আর ছাত্রী ১২ জন। কমেছে ৩০ জন। ছাত্রী নেই ১৮ জন, ছাত্র ১২ জন। ঝরে গেছে, যার শতকরা হার ৫৮ দশমিক ৮২ ভাগ। একই দশা তেগাছিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। এখানে ২০২২ সালে ষষ্ঠতে শিক্ষার্থী ছিল ৬০ জন। ছাত্র ২৮ জন, ছাত্রী ৩২ জন। এরা এখন দশম শ্রেণিতে পড়ছে। তবে সংখ্যায় মাত্র ৩৬ জন। ছাত্র ২৪, ছাত্রী ১২ জন। নেই ২৪ জন। ঝরে গেছে। ছাত্র নেই ৪ জন, আর ছাত্রী নেই ২০ জন। ঝরে পড়ার হার শতকরা ৪০ শতাংশ।
ধানখালী সোনাগাজী হায়াতুন্নেছা এন্ড আশ্রাফ একাডেমী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠতে শিক্ষার্থী ছিল ১০০ জন। ছাত্র ৪৭, ছাত্রী ৫৩ জন। যারা এ বছর দশমে পড়ছে। কিন্তু ঝরে গেছে ৪০ জন। ছাত্র ১৬ জন, ছাত্রী ২৪ জন। উত্তরপূর্ব পাটুয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠতে শিক্ষার্থী ছিল ৬৫ জন। যারা এখন দশমে পড়ছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা কমেছে ২৫ জন। আছে মাত্র ৪০ জন। তুলাতলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠে শিক্ষার্থী ছিল ৫৫ জন। ছাত্র ৩১, ছাত্রী ২৪জন। এরা এখন দশমে পড়ছে। কিন্তু আছে ২৯ জন। ঝরে গেছে ২৬ জন। ছাত্র ১৫ আর ছাত্রী ১১ জন। ঝরে পড়ার হার ৪৭ দশমিক ২৭ শতাংশ।
হাজীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠে শিক্ষার্থী ছিল ৭০ জন। ৩৫ ছাত্র, ৩৫ ছাত্রী। এরা এখন দশমে পড়ছে মাত্র ৩০ জন। ছাত্র ১২, ছাত্রী ১৮ জন। এখানে ঝরে গেছে ৪০ জন। ছাত্র নেই ২৩, ছাত্রী ১৭ জন। ঝরে পড়ার হার ৫৭ শতাংশেরও বেশি।
মহিপুর কো-অপারেটিভ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠে শিক্ষার্থী ছিল ১৭৩ জন। ছাত্র ৯০, আর ছাত্রী ৮৩ জন। এরা এখন দশমে পড়ছে। কিন্তু সংখ্যা ১২৭ জন। ছাত্র ৬৮, ছাত্রী ৫৯ জন। মোট ঝরে গেছে ৪৬ জন। মধ্য টিয়াখালী আলহাজ¦ কেরামত হাওলাদার মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ছিল ৬৬ জন। ছাত্র ৩৪, ছাত্রী ৩২ জন। অথচ দশমে এখন আছে মাত্র ৩০ জন। ঝরে গেছে ৩৬ জন। ছাত্র নেই ২১ জন, আর ছাত্রী নেই ১৫ জন। ঝরে পড়ার হার ৫৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ধুলাসার বহুমূখি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এবছর (২০২৬) দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী রয়েছে ৭০ জন। অথচ এরা ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে যখন ভর্তি হয় তখন শিক্ষার্থী ছিল ৯১ জন। দশমে আসতে ঝরে গেছে ২১ জন। এর মধ্যে ছাত্রী নেই ১৮ জন।
চরচাপলী ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ছিল ১২৮ জন। যারা এখন দশমে অধ্যয়নরত রয়েছে। এখান থেকে ঝরে গেছে ৫৬ জন। এখন আছে ৭২ জন। এর মধ্যে ছাত্রী নেই ১৯ জন, আর ছাত্র নেই ৩৭ জন। ষষ্ঠ থেকে দশমে পৌছতে কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী ঝরে গেছে। গড়ে এখানকার ২৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দশমে পৌছতে ঝরে যাচ্ছে গড়ে এক তৃতীয়াংশেরও বেশি শিক্ষার্থী।
তবে কুয়াকাটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বেতমোড় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, লোন্দা হাফিজ উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা ভালো। এসব প্রতিষ্ঠানে ঝরে পড়া নেই বললেই চলে। পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র।
লালুয়া জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সানজিদা জানায়, তার সহপাঠিদের মধ্য থেকে ইতি, লামিয়া, তিষা, সাথী, নাদিম, শাহদাৎ, মুনসুর, সাইফুল, রিফাত ঝরে গেছে। জানালেন, এদের মধ্যে মেয়েদের অধিকাংশ বিয়ে হয়ে গেছে। কারও সন্তান রয়েছে। করছে ঘর সংসার। ছেলেদের অনেকে শ্রমজীবীর কাজ করছে। একই ক্লাশের জান্নাতিও জানায়, সহপাঠি মিম. ওুবিনা, কলি শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে গেছে। এই দুই শিক্ষার্থীর দাবি দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে ঝরে পড়ার প্রধান কারণ। পাশাপাশি মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বখাটেপনার শিকারও এক ধরনের বড় সমস্যা রয়েছে। তারা জানায়, বর্তমানে এক শ্রেণির কিশোর-যুব মাদকসেবীর কারণে বাড়ি থেকে স্কুল পর্যন্ত আসা এবং স্কুল থেকে বাড়িতে যাওয়া অনেকটা অনিরাপদ। এ কারণেও বহু ছাত্রীকে মা-বাবা বিয়ে দিয়ে দেন। এরা এমনও মন্তব্য করে যে, তাঁদের সহপাঠীদের মধ্যেও কেউ কেউ বখাটেপনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে।
কলাপাড়ায় মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এভাবে শিক্ষার্থী ঝরে যাওয়ার পেছনে শিক্ষকদের দাবি দারিদ্র্য ও বাল্যবিয়ের কারণে কমছে শিক্ষার্থী সংখ্যা। খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহসিন রেজা জানান, মূলত বাল্যবিয়ের কারণে তার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ঝরার প্রধান কারণ। অভিভাবকদের অসেচতনতায় এটি হচ্ছে। চরচাপলি ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গাজী আলী আহম্মেদ জানান, মূলত ছেলেদের মধ্যে শতকরা ৭০ শতাংশ দরিদ্রতার কারণে এবং ছাত্রীদের মধ্যে শতকরা ৯০ শতাংশ বাল্যবিয়ের কারণে স্কুল থেকে, শিক্ষা জীবন থেকে ঝরে পড়ছে। করোকালীন থেকে এমন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি এই শিক্ষকের। এখান থেকে এখন পর্যন্ত বেরিয়ে আসা যায়নি।
কিন্তু অভিভাবকরা দাবি করছেন ওই দুটি কারণ ছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কতিপয় শিক্ষক নিজেদের খেয়ালখুশিমতো ক্লাশে পড়ায়। তাঁরা তাঁদের মতো করে দেরিতে ক্লাশে আসেন। আবার চলে যান নির্দিষ্ট সময়ের আগেই। যথাযথ মনিটরিং নেই। বহু শিক্ষক রয়েছে যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বকে অতিরিক্ত হিসেবে বিবেচনা করছেন। তাঁরা প্রাইভেট কোচিং ও অন্যান্য কাজকে প্রধান্য দিচ্ছেন। ঝরে পড়া রোধে নেই কোন প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ।
কলাপাড়া উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো: মনিরুজ্জামান খান জানান, এমন সমস্যা থেকে উত্তরণের চেষ্টা চলছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সমন্বয়ে কাউন্সিলিং করা হচ্ছে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুজ্জামান জানান, মাধ্যমিক শিক্ষার এই সংকট উত্তরণের চেষ্টা চলছে। দরিদ্র ও মেধাবীদের শিক্ষা সহায়তা এবং বাল্যবিয়ে বন্ধে সচেতনতার পাশাপাশি আইনি প্রতিকার চলছে। এছাড়া অভিভাবক সমাবেশের মধ্য দিয়ে সচতেনতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স