জ্বালানি খাত বেসরকারিকরণের নামে ‘লুটপাটের লাইসেন্স’ দেয়া হচ্ছে: জামায়াত
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৮-০৮-২০২৬ ০৬:২১:৪৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৮-০৮-২০২৬ ০৬:২১:৪৮ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
জ্বালানি খাত বেসরকারিকরণের নামে সংস্কারের পরিবর্তে একচেটিয়া ব্যবসা কয়েকটি প্রভাবশালী বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, এটি সংস্কার নয়, বরং জ্বালানি খাতে ‘দুর্নীতি ও লুটপাটের নতুন লাইসেন্স’ দেয়ার প্রক্রিয়া।
শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ’ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।কৃষি অনুষ্ঠান
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ খসড়া নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন বিপিসি চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার চার দিনের মধ্যে এ খসড়া তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এটি সংস্কার নয়, এটি হস্তান্তর। এটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স।’
জামায়াতের এই নেতা বলেন, দলটি বাজার অর্থনীতি ও বেসরকারি বিনিয়োগের বিরোধী নয়। তবে দেশ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে জবাবদিহিহীন হস্তান্তর এবং দুর্নীতির সুযোগ বিস্তারের বিরোধিতা করবে জামায়াত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আওয়ামী লীগের মতোই যদি দেশে লুটপাট চলে, তাহলে জুলাই আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল কেন?’
বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দাম কমবে—সরকারের এমন যুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেল আমদানির ব্যবসায় গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন ও বিপুল ব্যাংকিং সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে বাস্তবে হাতেগোনা কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীই এ বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা রাখে। এতে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবসা ভেঙে বেসরকারি একচেটিয়া ব্যবসা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিপিসিকে অদক্ষ ও লোকসানি প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে বেসরকারিকরণের যুক্তিও প্রত্যাখ্যান করে জামায়াত। মিয়া গোলাম পরওয়ারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর আগে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি যথাক্রমে ১ হাজার ৯৮৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকা লোকসান করেছিল।
বর্তমান জ্বালানি সংকটকে বিপিসির ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখারও বিরোধিতা করেন তিনি। তার দাবি, বিশ্ববাজার ও ভূরাজনৈতিক সংকটই এর মূল কারণ। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে দেশে দাম না বাড়ানোর কারণে বিপিসি প্রতিদিন প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে বলে সংসদে জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকটকে কাজে লাগিয়ে সরকার তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার আশঙ্কা, এতে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ কমে গিয়ে দরদাতা সংকট, বেশি দাম এবং সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, দ্রুততা আর স্বচ্ছতা পরস্পরবিরোধী নয়। কিন্তু এখানে দ্রুততার নামে স্বচ্ছতাই বিসর্জন দেয়া হচ্ছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি বাজার কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে গেলে প্রতি লিটারে সামান্য বাড়তি মুনাফাও বছরে হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত আয়ে পরিণত হতে পারে। জ্বালানি তেলকে সাধারণ পণ্য নয়, কৃষি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, বিমান চলাচল ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন জামায়াতের এই নেতা।
বাংলাদেশে একটি মাত্র শোধনাগার—ইস্টার্ন রিফাইনারি—এবং সীমিত মজুত সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, যুদ্ধ বা দুর্যোগের সময় বেসরকারি কোম্পানিকে রাষ্ট্র কীভাবে নির্দেশ দেবে। দুর্গম ও অলাভজনক এলাকায় জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্বও বেসরকারি কোম্পানি নেবে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের আইনি সুরক্ষা কমানোর উদ্যোগ নিয়েও অভিযোগ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। শ্রম আইনের ১৮৭ ধারা জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের ক্ষেত্রে রহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ছয় দফা দাবি জামায়াতের:
জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিতের দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
দলটির অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে—খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করে অন্তত ৬০ দিন জনমত গ্রহণ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানি এবং বেসরকারিকরণের পরিবর্তে বিপিসির সংস্কার।
এ ছাড়া স্বাধীন নিরীক্ষা, বিপিসির বোর্ডে পেশাদারদের নিয়োগ, জ্বালানি ক্রয়ে ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা এবং প্রতি তিন মাসে আমদানি মূল্য ও পরিমাণ প্রকাশের দাবি জানিয়েছে দলটি।
একই সঙ্গে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট ও কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং জ্বালানি খাতের শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা খর্বের সব সুপারিশ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘প্রতিযোগিতা মানে একচেটিয়া হাতবদল নয়। সংস্কার মানে প্রতিষ্ঠান মেরামত, প্রতিষ্ঠান বিক্রি নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা মানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নয়।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পাবনা-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। সূত্র: চ্যানেল ২৪
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স