আতঙ্কে হাজারো মানুষ
পদ্মার ভাঙনে হুমকির মুখে দৌলতদিয়া ফেরি ও লঞ্চ ঘাট
আপলোড সময় :
০৩-০৮-২০২৬ ০৩:৩০:৩৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৩-০৮-২০২৬ ০৩:৩০:৩৫ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের এই প্রধান নৌরুট দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও যানবাহন যাতায়াত করে। একইসঙ্গে এই ঘাট থেকে সরকার প্রতিবছর বিপুল রাজস্ব আদায় করে থাকে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই নৌরুটের দৌলতদিয়া প্রান্ত এখন পদ্মার তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে। অব্যাহত নদীভাঙনে ফেরিঘাট, লঞ্চঘাট, বসতভিটা, দোকানপাট, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে দিন-রাত উৎকণ্ঠায় সময় কাটাচ্ছেন পদ্মাপাড়ের হাজারো মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই পদ্মার ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। নদীর প্রবল স্রোত ও তীব্র ভাঙনে একের পর এক বসতভিটা ও স্থাপনা বিলীন হয়ে যায় নদীগর্ভে। ভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন সময় জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারছে না। ফলে একদিকে যেমন নদীপাড়ের মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারানোর আতঙ্কে রয়েছেন, অন্যদিকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাট রক্ষার বিষয়টিও নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দৌলতদিয়া ঘাট এলাকার বিভিন্ন অংশে পদ্মার ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদীর পাড়ের মাটি ধসে পড়ছে। কোথাও কোথাও নদীর তীর থেকে বড় বড় অংশ ভেঙে পদ্মার পানিতে বিলীন হচ্ছে। এতে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক। নদীর পাড়ে থাকা বসতবাড়ি, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন স্থানীয়রা। অনেকে ভাঙন শুরু হওয়ায় নিজেদের ঘরবাড়ি ও মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পদ্মার ভাঙন নতুন কোনো ঘটনা নয়। বছরের পর বছর ধরে এই নদী ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে তাদের। কখনো ভাঙনের কবলে পড়ে বসতভিটা হারাতে হয়েছে, কখনো হারিয়েছেন ফসলি জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অনেক পরিবারকে একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। কিন্তু এবার ভাঙনের যে তীব্রতা দেখা দিয়েছে, তাতে ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ সরদার বলেন, প্রতিবছর পদ্মার ভাঙনে আমাদের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এবারও ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি, কখন জানি বসতভিটা নদীতে চলে যায়। তাই দ্রুত স্থায়ী নদীশাসনের মাধ্যমে দৌলতদিয়া ঘাট ও নদীপাড়ের মানুষকে রক্ষা করার দাবি জানাই।
নদীপাড়ের দোকানদার শাহীন খান বলেন, নদীভাঙন যেভাবে বাড়ছে, তাতে আমাদের দোকানপাট ও ব্যবসা নিয়ে চরম আতঙ্কে আছি। যেকোনো সময় নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে সবকিছু। তাই দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।
ফেরিঘাটের বাসিন্দা রুহুল বলেন, নদীভাঙনে আমরা খুবই আতঙ্কের মধ্যে আছি। প্রতিদিনই নদীর পাড় ভেঙে যাচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ফেরিঘাটসহ আমাদের বসতবাড়িও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।
শিক্ষার্থী রুমানা বলেন, নদীভাঙনের কারণে আমাদের স্কুল ও আশপাশের এলাকা নিয়ে আমরা খুবই আতঙ্কে আছি। ভাঙন আরও বাড়লে পড়াশোনায়ও বড় ধরনের সমস্যা হবে। তাই দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পদ্মার ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে নদীর তীরবর্তী জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো। বসতবাড়ির পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, সড়ক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষের অনেকেই প্রতিদিন আতঙ্কে থাকেন- কখন তাদের বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যায়, সেই চিন্তায় কাটছে তাদের সময়।
তাদের অভিযোগ, ভাঙন শুরু হওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও অনেক সময় ভাঙনের গতি এতটাই তীব্র থাকে যে, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই নদী তীরবর্তী অনেক জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তাই শুধু ভাঙন শুরু হলে জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিবর্তে আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে স্থায়ী নদীশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাথী দাস বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ফেরিঘাট এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। যেসব পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে এবং যেখানে জনবসতি ও বিদ্যালয় রয়েছে, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। পরবর্তীতে বিভিন্ন ধাপে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যও কাজ করা হচ্ছে।
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. তাজমিনুর রহমান বলেন, দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় দুটি বিভাগের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রতিরোধমূলক কাজ করা হয়ে থাকে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ভাঙন রোধে কাজ শুরু করা হয়েছে। তাদের জরিপ অনুযায়ী, দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় প্রায় ৬০০ মিটার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান রয়েছে। এরমধ্যে যেসব এলাকায় বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনা রয়েছে, সেই ২০০ মিটার এলাকায় কাজ শুরু করা হয়েছে। বাকি ৪০০ মিটার এলাকায় কাজের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে ওই অংশেও কাজ শুরু করা হবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, দৌলতদিয়া এলাকায় নদীভাঙন অত্যন্ত প্রবল। বিষয়টি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। এই এলাকায় স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধে একটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। নদীভাঙন রোধে কাজ করে যাওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন- প্রতিবছর ভাঙন দেখা দেওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার পরিবর্তে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ কবে বাস্তবায়ন হবে? তারা বলছেন, দৌলতদিয়া ঘাট থেকে সরকার প্রতিবছর বিপুল রাজস্ব আদায় করে। দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এই ঘাটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অথচ ঘাট রক্ষায় স্থায়ী নদীশাসন ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে একদিকে সরকারি সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে নদীপাড়ের সাধারণ মানুষও হারাচ্ছেন তাদের শেষ সম্বল বসতভিটা।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স