অপহরণ ও গুলির শব্দে আতঙ্কে জনপ্রতিনিধিরাও
বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে টেকনাফবাসি
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৩-০৮-২০২৬ ১২:৫৬:২৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৩-০৮-২০২৬ ০১:২২:৫৩ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
দিন-রাত থেমে নেই গুলির শব্দ। পাহাড়ঘেরা জনপদে এখন আর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নেই। সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্ক, শুরু হয় গোলাগুলির শব্দ। সেই আতঙ্কের মধ্যেই একের পর এক অপহরণের ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া-নোয়াখালী এলাকার বাসিন্দারা। প্রাণভয়ে ইতোমধ্যে পাহাড়ঘেঁষা দুই গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেকে রাত হলে বাড়িতে থাকছে না। এমনকি জনপ্রতিনিধিরাও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত বলে জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতি চলছে গত কয়েক মাস ধরে। এর আগে মাঝেমধ্যে এসব ঘটনা ঘটলেও এখন নিত্যদিন ঘটছে। এ অবস্থায় উখিয়া-টেকনাফসহ বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পোস্টার টানিয়ে অপহরণ বন্ধে প্রতিবাদ চলমান রয়েছে।
একের পর এক অপহরণ:
গত ১৭ জুলাই বিকালে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর নয়াপাড়া এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশ থেকে শিশু মো. আরাফাতকে (১২) অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিয়ে যায় পাহাড়ের অস্ত্রধারীরা। পরদিন চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়। গত ২৮ জুন দুপুরে একই ইউনিয়নের নোয়াখালী জুম্মাপাড়ায় পাহাড় থেকে নেমে আসে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারা অস্ত্রের মুখে একটি বাড়িতে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে চিকিৎসক কামাল উদ্দিনকে (৬৫) অপহরণ করে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যায়। এখনও তার কোনও সন্ধান মেলেনি। এর আগে একই এলাকার বাসিন্দা হোসেন আলীকে (৫০) অস্ত্রের মুখে অপহরণ করা হয়েছিল। পরে পরিবারের সদস্যরা মুক্তিপণ দেওয়ার পর তিনি ফিরে আসেন।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালী ও কচ্ছপিয়া পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। সম্প্রতি সময়ে অব্যাহত গোলাগুলি ও একের পর এক অপহরণের ঘটনায় সবার মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। আরও অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে।
জনপ্রতিনিধিরাও আতঙ্কে:
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্যমতে, সন্ধ্যা নামলেই পাহাড় থেকে ভেসে আসে গুলির শব্দ। সেই শব্দেই ঘুম ভাঙে, আবার সেই শব্দের মধ্যেই রাত কাটাতে হয়। শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ পুরো জনপদের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় ভেঙে পড়েছে। আতঙ্কে অনেকেই সন্তানদের নিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তারাও বিকল্প স্থানে আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পাহাড়ঘেঁষা এই জনপদ আরও বেশি জনশূন্য হয়ে পড়তে পারে এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এ বিষয়ে বাহারছড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, “আমার ওয়ার্ডে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ পরিবারের বসবাস। কিন্তু টানা অপহরণ, মুক্তিপণসহ রাত-দিন গোলাগুলির কারণে পুরো এলাকা এখন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। মানুষ ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে। ইতোমধ্যে আমার গ্রামের অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বা অন্য নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “সর্বশেষ পল্লী চিকিৎসক কামাল উদ্দিন এবং শিশু আরাফাতকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এখন আরও অনেক পরিবার এলাকা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভয় ও অনিশ্চয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমিও নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। প্রয়োজনে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবছি।” তিনি বলেন, দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিত অভিযান চালিয়ে অপহরণকারীদের গ্রেফতার না করলে এবং পাহাড়ঘেঁষা জনপদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে পুরো এলাকা জনশূন্য হয়ে যাবে। এখানের মানুষ এখন শুধু নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা চায়।
৩২০ জন অপহরণের শিকার:
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের তথ্য বলছে, টেকনাফের পাহাড়ঘেঁষা এই জনপদে অপহরণ, মুক্তিপণ এবং সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত তিন বছরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ৩২০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু গত এক বছরেই ১৫টি ঘটনায় প্রায় ১৫৫ জনকে অপহরণ করা হয়, যাদের মধ্যে ৯৬ জনই রোহিঙ্গা নাগরিক। অধিকাংশ ভুক্তভোগী পরিবারের দেওয়া মোটা অঙ্কের মুক্তিপণের বিনিময়ে ফিরে এসেছেন।
অপহরণের পাশাপাশি বেড়েছে সহিংসতা। গত ৩ মে নোয়াখালীপাড়া ব্রিজ এলাকায় অপহরণের চেষ্টার সময় শহীদ উল্লাহ (১৯) নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। এর আগে এপ্রিল মাসে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে সুমাইয়া নামে এক তরুণী নিহত হন। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে একই এলাকায় বস্তাবন্দি এক অজ্ঞাত ব্যক্তির খণ্ডিত লাশ এবং পাহাড়ি এলাকা থেকে তিন জনের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। একের পর এক অপহরণ, হত্যা ও গুলির ঘটনায় এখানে দিন দিন আতঙ্ক বাড়ছে।
কেন বাড়িঘর ফেলে চলে যাচ্ছে মানুষ:
জানতে চাইলে নোয়াখালী জুম্মাপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাকের বলেন, “আমার বাড়ির আশপাশের অন্তত ১০টি পরিবার ঘরে তালা ঝুলিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। শুধু তারাই নয়, গুলি ও অপহরণের আতঙ্কে আরও অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। এখানে মানুষের নিরাপত্তা বলতে কিছুই নেই। দিন-রাত অবিরাম গুলির শব্দ শোনা যায়। একের পর এক অপহরণের ঘটনার পরও আমরা কোনও কার্যকর সমাধান দেখতে পাচ্ছি না। তাই মানুষ প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে এলাকা ছাড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের পরিবারে পাঁচ জন সদস্য। কিন্তু এখন আমি ছাড়া বাড়িতে আর কেউ থাকে না। পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে স্ত্রী-সন্তানদের টেকনাফ পৌরসভার পুরান পল্লানপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় রেখে এসেছি। আমি দিনে বাড়িতে থেকে ঘর পাহারা দিই, আর সন্ধ্যা হলে নিরাপত্তার কারণে অন্যত্র গিয়ে রাত কাটাই। নিজের বাড়িতে থেকেও আজ আমরা নিরাপদ নই। এটি শুধু আমার নই, পুরো এলাকাবাসীর চিত্র।”
নোয়াখালীপাড়ার পান ব্যবসায়ী মো. সাব্বির বলেন, “আমরা এখন চরম প্রাণের ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঘরে পাঁচ হাজার টাকাও নিরাপদে রেখে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি না। প্রতিটি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটছে। আমাদের জীবন কতটা অনিরাপদ হয়ে পড়েছে, সেটি একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে।”
যা বলছেন জনপ্রতিনিধিরা:
কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে সংঘটিত অপহরণ, মাদক ও অন্যান্য অপরাধ দমনে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যেই বিশেষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুব দ্রুত অভিযান চলবে। এছাড়া অপহরণ প্রবণতা এলাকায় পুলিশের চৌকি স্থাপনের জন্য ডিও লেটারও দেওয়া হয়েছে। বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন বলেন, “রাত-দিন গোলাগুলি ও অপহরণের ঘটনায় মানুষ চরম আতঙ্কে রয়েছে। অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। দ্রুত যৌথ বাহিনীর অভিযান জোরদার না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হবে।”
কী বলছে প্রশাসন:
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান শুরু হবে। আমরা কোনও অপরাধীকে ছাড় দিচ্ছি না। ইতিমধ্যে বাহারছড়া এলাকায় পুলিশের মোবাইল টিম দেওয়া হয়েছে। দ্রুত বাহারছড়াকে নিরাপদ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।’ এ ব্যাপারে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, “বাহারছড়ার অপহরণ ও সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনে বড় পরিসরে যৌথ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেখানে পুলিশের চৌকির স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।”
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স