ঢাকা , শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬ , ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুয়েটে পড়েও দেশে নেই মানসম্মত কর্মসংস্থান

এক দশকে বিদেশগামী শিক্ষার্থী বেড়েছে ১০৫ শতাংশ

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ০১-০৮-২০২৬ ১১:১৩:২৪ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ০১-০৮-২০২৬ ১১:৫৫:৫০ পূর্বাহ্ন
এক দশকে বিদেশগামী শিক্ষার্থী বেড়েছে ১০৫ শতাংশ ফাইল ছবি
প্রতিবছর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা। গত এক দশকে বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে শুধু উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ থেকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের প্রায় তিনগুণ।

এই যেমন কিছুদিন আগেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়—বুয়েটের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করেছেন রাতুল ইশতিয়াক। স্বপ্ন ছিল টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে গবেষণা করে একদিন দেশের স্বাস্থ্যখাতে নতুন কিছু যোগ করার। কিন্তু বাংলাদেশে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণাগার, অর্থায়ন কিংবা কাজের সুযোগ না থাকায় অনেকটা অভিমান নিয়েই বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে রাতুল ইশতিয়াক বলেন, দেশে কাজ করলে যে পরিমাণ বেতন পাওয়া যায়, তার তুলনায় বিদেশে জীবনযাত্রার মান ভালো হবে। পাশাপাশি বাইরের গবেষণাগারে থাকা প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও সুযোগ-সুবিধাও দেশের অনেক ল্যাবের তুলনায় বেশি উন্নত।

দেশের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর চোখেও একই অনিশ্চয়তা। তাদের অভিযোগ, দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে মানসম্মত কাজের সুযোগ খুবই সীমিত। তারা বলেন, চাকরিতে শুরুর বেতন এত কম যে ছাত্রজীবনে টিউশন করেই তার চেয়ে বেশি আয় করা সম্ভব। তারা দেশকে যতটা দিতে চান, দেশ সেই সুযোগ তৈরি করতে পারছে না কিংবা নিচ্ছে না।

এছাড়াও সরকারি যেসব পদ রয়েছে, তার অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৌশল স্নাতকদের চেয়ে ডিপ্লোমাধারীদের প্রাধান্য বেশি বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, ডিপ্লোমা করে আসা শিক্ষার্থীরা ১১তম গ্রেডে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে পদোন্নতি পেয়ে ওপরের গ্রেডে চলে যান। ফলে প্রকৌশলীদের জন্য পর্যাপ্ত পদ খালি থাকে না। ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে কাজের ক্ষেত্র তৈরি না হলে নিজেদের উন্নতির জন্য বিদেশে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

তবে বিষয়টি শুধু কিছু মেধাবী শিক্ষার্থীর দেশ ছাড়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে শুধু উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি।

ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিসটিকসের তথ্য বলছে, ২০১৩ সালে বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৭ হাজার। ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৭৭ হাজার। অর্থাৎ এক দশকে বিদেশমুখী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০৫ শতাংশ।History

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব বলেন, দেশের চাকরির বাজারে যে বেতন দেওয়া হয়, তা বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ও কারিগরি কাজের ক্ষেত্রও পর্যাপ্তভাবে তৈরি করা যায়নি।

শিক্ষাবিদদের মতে, দেশে গতানুগতিক চাকরির বাইরে প্রযুক্তি ও গবেষণাভিত্তিক খাতে এখনো পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান এবং মানসম্মত গবেষণার পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। ফলে অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী ইচ্ছায় নয়, প্রয়োজনেই দেশের বাইরে ভবিষ্যৎ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।

ড. মো. আহসান হাবীব আরও বলেন, দেশের একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ বিষয়ে আলাদা কেন্দ্র বা নির্দিষ্ট পদ তৈরি করে একাডেমিয়া ও শিল্পখাতের মধ্যে সংযোগ বাড়ানো গেলে বেকারত্বের সমস্যা কিছুটা কমানো সম্ভব।

ক্ষমতায় আসার পর সব সরকারই উন্নয়নের মহাপরিকল্পনার কথা বলে। তবে সেই পরিকল্পনায় মেধাবী তরুণদের ভবিষ্যৎ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু শিক্ষা বাজেট বাড়ালেই হবে না। মেধাবী তরুণদের দেশে রাখতে তৈরি করতে হবে পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও গবেষণার সুযোগ এবং নিশ্চিত করতে হবে সামাজিক নিরাপত্তা। তবেই দেশের মেধাবী তরুণদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ