ঢাকা , সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ , ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছয় মাস ধরে স্থবির সেন্টমার্টিন, রয়েছে আরাকান আর্মির আতঙ্ক

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৭-০৭-২০২৬ ০১:০৪:২৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৭-০৭-২০২৬ ০১:০৪:২৮ অপরাহ্ন
ছয় মাস ধরে স্থবির সেন্টমার্টিন, রয়েছে আরাকান আর্মির আতঙ্ক ছবি : সংগৃহীত
প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের নানা বিধিনিষেধের কারণে সেখানকার পর্যটননির্ভর অর্থনীতি প্রায় ছয় মাস ধরে স্থবির হয়ে পড়েছে। মাছ ধরা ছাড়া বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় দ্বীপটির হাজারো পরিবার অর্থনৈতিকভাবে চরম সংকটে পড়েছে। জমানো সঞ্চয় ফুরিয়ে আসায় খাদ্য ও মৌলিক চাহিদা মেটাতে এখন টানাটানি শুরু হয়েছে দ্বীপবাসীর জীবন-জীবিকায়।

সেন্টমার্টিনের বিভিন্ন পেশার অন্তত ৩০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক সময় মাছ ধরাই ছিল দ্বীপবাসীর একমাত্র প্রধান পেশা। তবে পর্যটন শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে হোটেল, রিসোর্ট, নৌযান, স্থানীয় যানবাহন ও বিভিন্ন সেবাভিত্তিক ব্যবসায় যুক্ত হন তারা। এতে স্থানীয়দের জীবনযাত্রার মানে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল। কিন্তু দুবছর আগে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিবেশ রক্ষার যুক্তিতে বছরে কেবল ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই দুই মাস পর্যটকদের জন্য দ্বীপ উন্মুক্ত রেখে বাকি ১০ মাস যাতায়াত ও অবস্থানের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে। এতে হতাশায় পড়েন স্থানীয়রা। তবে বর্তমান সরকারের সময়েও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের আগে অনেকেই অনেক আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর মন্ত্রী-এমপিদের কেউই কথা রাখেননি। সবাই এসে শুধু বৈঠকই করেন, কাজের কাজ কিছুই হয় না।

অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও পরিবেশবিদদের দাবি, পর্যটকের অতিরিক্ত চাপ কমায় সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থান ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে দ্বীপটিকে টিকিয়ে রাখতে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

ফুরিয়ে গেছে সঞ্চয়, বিকল্প আয়ের খোঁজে দ্বীপ ছাড়ছেন অনেকে:

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্তমানে সেন্টমার্টিনে দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনেও প্রশাসনের আগাম অনুমতি নিতে হচ্ছে। এমনকি অনুমতি ছাড়া নিজ উপজেলার সাধারণ বাসিন্দারাও সহজে যাতায়াত করতে পারছেন না। গত ফেব্রুয়ারি থেকে পর্যটনব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ থাকায় মানুষের সঞ্চয় শূন্যে ঠেকেছে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার বিকল্প আয়ের খোঁজে দ্বীপ ছেড়ে মূল ভূখণ্ডে পাড়ি জমাচ্ছে।

দ্বীপের হোটেল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জিয়াউল হক জিয়া বলেন, বছরের মাত্র দুই মাসের আয় দিয়ে ১০ মাস চলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যা সঞ্চয় ছিল, তাও শেষ। নতুন করে ব্যাংক ঋণও পাওয়া যাচ্ছে না। উপরন্তু শাহপরীর দ্বীপ ঘাটেও অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির শিকার হতে হয়। আমরা কোনো ত্রাণ চাই না, নিজেদের ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হতে চাই।

দ্বীপ ছেড়ে টেকনাফ সদরে এসে টমটম চালাচ্ছেন সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান। তিনি বলেন, সেন্টমার্টিনে এখন যাত্রী কম, ভাড়াও পাওয়া যায় না। তাই সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে টেকনাফ বাজারে এসে টমটম চালাচ্ছি।

সেন্টমার্টিন অটোরিকশা লাইনম্যান মো. হামিদ জানান, দ্বীপে দুই শতাধিক অটোরিকশা রয়েছে, যার সবগুলোই এখন বসা। দুই মাসের আয়ের জমানো টাকা ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।

শিক্ষার্থী জাবেদ ইকবাল জানায়, বর্তমানে সেন্টমার্টিনের প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ শিক্ষার্থী দ্বীপের বাইরে থেকে পড়াশোনা করছে। প্রত্যেকের পেছনে মাসে গড়ে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হয়। পরিবারের একমাত্র আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন তাদের শিক্ষাজীবন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

সেন্টমার্টিন যাত্রী পরিবহন সার্ভিস বোট মালিক সমিতির সভাপতি রশিদ আহমদ বলেন, টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে ২৭টি ট্রলারের অনুমোদন থাকলেও এখন নিয়মিত চলে মাত্র দুটি। পুরো দ্বীপে এখন হাহাকার। গত মৌসুমে ব্যবসার পরিচালন খরচই ওঠেনি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য ছৈয়দ আলম বলেন, একটা হোটেল ১০ মাস বন্ধ রেখে মাত্র দুই মাস সচল রাখা অসম্ভব। আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে যায়, কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়। স্থানীয় মানুষের অবস্থা এখন খুবই করুণ।

সাগরে মাছ ধরতেও আরাকান আর্মির ভয়:

স্থানীয় সূত্র জানায়, সেন্টমার্টিনে হাজারো জেলে পরিবার থাকলেও সরকারি খাতায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা মাত্র ৭৯৯ জন। নিবন্ধিতরা মাঝে মাঝে কিছু সরকারি সহায়তা পেলেও অধিকাংশই তা থেকে বঞ্চিত। সমুদ্র থেকে মাছ ধরা যাদের একমাত্র সম্বল, মিয়ানমারের সীমান্ত সংলগ্ন সাগরে সশস্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র দৌরাত্ম্যে তাদের সেই পথও এখন অবরুদ্ধ।

মাঝেরপাড়ার জেলে আবদুর রহিম জানান, একটু গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলেই আরাকান আর্মির সদস্যরা ধাওয়া করে। ধরে নিয়ে যায় জাল, ট্রলার ও জেলেদের।

ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল করিম বলেন, গত এক বছরে বহু বাংলাদেশি জেলেকে অপহরণ করেছে আরাকান আর্মি। ইতোমধ্যে ২৮ জন ফেরত এলেও এখনো ৮ জন বন্দি অবস্থায় রয়েছে। এই ভয়ে জেলেরা সাগরে যেতে পারছেন না। বন্দি জেলেদের পরিবারগুলো চরম অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।

৭০ শতাংশ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে:

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত সেন্টমার্টিন মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, দ্বীপটির মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এক হাজার ৪৪৫টি পরিবারে মোট জনসংখ্যা নয় হাজার ৮৮৫ জন। প্রতি পরিবারে গড়ে সদস্যসংখ্যা ৬ দশমিক ৮৪ জন, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।

মাস্টারপ্ল্যানের তথ্যমতে, মোট জনসংখ্যার ৪২ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে এবং ৪৪ শতাংশের বয়স ১৯ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। দ্বীপে বর্তমানে ১৯০টির বেশি হোটেল-রিসোর্ট থাকলেও তার অর্ধেকের বেশি মালিক বাইরের লোক। ফলে পর্যটন ব্যবসার মূল সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা।

চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল, নেই সি-অ্যাম্বুলেন্স:

দ্বীপে মানসম্মত চিকিৎসাসেবার সংকট প্রকট। বর্ষা মৌসুমে নৌপথ উত্তাল থাকায় জরুরি সংকটাপন্ন রোগীদের টেকনাফ বা কক্সবাজারে নেওয়া সম্ভব হয় না। নেই কোনো সি-অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা।

একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্রটি বর্তমানে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, পদায়ন পাওয়া অনেক চিকিৎসক নানা অজুহাতে দ্বীপে দায়িত্ব পালন করতে যান না।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনা করে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে একটি সি-অ্যাম্বুলেন্স চালুর জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বাজেট পেলেই সেবা শুরু হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সহায়তার তহবিল নিয়ে গড়মিলের অভিযোগ: 

পরিবেশ অধিদপ্তর ৩ বছর মেয়াদি ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছে। ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার এই প্রকল্পের অধীনে কাছিমের প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি, কেয়াবন সৃজন ও পর্যটন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দ্বীপের অতিদরিদ্র ৫০০টি পরিবারকে মাসে ৫ হাজার ৭০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক কামরুল হাসান জানান, টেকনাফ ইউএনওর মাধ্যমে গত এক বছরে ৫০০ পরিবারকে ১১ হাজার টাকা করে মোট ৫৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। তিন বছরের মধ্যে পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। তবে ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলামের দাবি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ৫০০ জনকে ১১ হাজার ৪০০ টাকা করে দেওয়া হলেও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে দ্বীপবাসী কোনো আর্থিক সহায়তা পায়নি।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাস্তার পাশে দু-একজনকে দিয়ে ময়লা কুড়ালে পরিবেশ রক্ষা হয় না। বাস্তবে পরিবেশের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। টেকসই বেড়িবাঁধ ও বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে জনগণকে সঙ্গে নিয়েই পরিবেশ রক্ষা করতে হবে।

সম্প্রতি যোগদান করা টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, প্রকল্পটির বিষয়ে একটি অবহিতকরণ সভা হয়েছে। দ্রুতই দ্বিতীয় পর্যায়ের আর্থিক সহায়তা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কড়াকড়ি ও পরিবেশ সুরক্ষা নির্দেশনা: 

সরকারি বিধিনিষেধ অনুযায়ী, সেন্টমার্টিনের সৈকতে রাতে আলো জ্বালানো, উচ্চশব্দে গান বাজানো, বারবিকিউ পার্টি করা, কেয়াবনে প্রবেশ ও কেয়া ফল কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া সামুদ্রিক কাছিম, সামুদ্রিক পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া ও শামুক-ঝিনুকের কোনো ক্ষতি করা যাবে না।

সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো যান্ত্রিক যানবাহন চালানো নিষেধ। একই সঙ্গে পর্যটকদের পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক না আনা এবং নিজস্ব পানির বোতল বা ফ্লাক্স ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য যে, পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালেই সেন্টমার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করেছিল। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী সেন্টমার্টিন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ‘সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার।

 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ