ঢাকা , বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬ , ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাওরে গোখাদ্যের সংকট, কম দামে গবাদিপশু বিক্রি করছেন খামারিরা

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৫-০৭-২০২৬ ০৩:১৬:৩৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৫-০৭-২০২৬ ০৪:১৪:৫৩ অপরাহ্ন
হাওরে গোখাদ্যের সংকট, কম দামে গবাদিপশু বিক্রি করছেন খামারিরা ছবি : সংগৃহীত
অকাল বন্যায় ফসল হারিয়ে প্রায় নিঃস্ব হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা। এবার সেই ক্ষতির প্রভাব পড়েছে কৃষকের গোয়ালঘরেও। বোরো ধান পচে যাওয়ায় গবাদিপশুর প্রধান খাদ্য খড় সংগ্রহ করতে পারেননি কৃষকেরা। ফলে বর্ষার শুরুতেই নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে তীব্র গোখাদ্য সংকট। নিরুপায় হয়ে অনেকেই ক্ষতি কমাতে কম দামে গোয়ালের গরু-ছাগল বিক্রি করে দিচ্ছেন।

স্থানীয় খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছর বোরো ধান কাটার পর খড় শুকিয়ে সারাবছরের গোখাদ্য হিসেবে সংরক্ষণ করেন তারা। কিন্তু গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে নেত্রকোণার বিস্তীর্ণ বোরো ক্ষেত তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতায় বেশিরভাগ ধান পচে যাওয়ায় খড় সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

কলমাকান্দা উপজেলার বড়খাপন হাওড় এলাকার খামারি মো. আব্দুল্লাহ জানান , প্রতি বছর বর্ষায় একটু-আধটু গোখাদ্যের সংকট হলেও এবারের মতো কঠিন পরিস্থিতি কখনো দেখিনি। স্থানীয় বাজারে খড় মিলছেই না, আর বাইরে থেকে বেশি দামে খড় আনতে গিয়ে পরিবহন খরচে কুলাচ্ছে না। গবাদিপশু টিকিয়ে রাখাই এখন দায় হয়ে পড়েছে।

আরেক খামারি মিলন বিশ্বাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বন্যায় ফসল তো গেছেই, এখন জীবিকার শেষ সম্বল গবাদিপশুগুলোও ঝুঁকির মুখে। দ্রুত সহায়তা বা প্রণোদনা না মিললে এই অঞ্চলের প্রাণিসম্পদ খাতে বড় বিপর্যয় নেমে আসবে।

নেত্রকোণার বারহাট্টা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ও অন্যতম বৃহৎ পশুর হাট নৈহাটি গরুর বাজার। এ বাজারে গরু বিক্রি করেছেন এক‌ই উপজেলার আবুল কালাম। কেমন দামে গরু বিক্রি করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি অনেক আশা নিয়ে আমার খামারের দেশি জাতের গরু এই নৈহাটি বাজারে বিক্রির জন্য নিয়েছিলাম। বাজারে এখন প্রচুর গরুর আমদানি, সেই তুলনায় কাস্টমার একটু কম। তাছাড়া গোখাদ্যের যে দাম, সেজন্যই আমি লাভ কিছুটা কম রেখে কম দামে গরু বিক্রি করে দিয়েছি।

মজিদ মিয়া নামের আরেক বিক্রেতা বলেন, নৈহাটি বাজার আমাদের এলাকার খুব বড় ও ঐতিহ্যবাহী হাট। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে গরু কিনতে আসে। আমি এবার যে গরুগুলো এনেছিলাম, সেগুলো নিজের তত্ত্বাবধানেই লালন-পালন করা। বর্তমান বাজারে কাস্টমারের বাজেট কিছুটা কম মনে হলো। বেশি দামের আশায় গরু বাজারে আটকে না রেখে, ক্রেতাদের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে একটু কম দামেই ছেড়ে দিলাম। লোকসান না হোক, কিন্তু নামমাত্র লাভে বিক্রি করেছি যাতে ক্রেতারা সন্তুষ্ট থাকেন। 

এদিকে খামারিদের হাহাকারের বিপরীতে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ দাবি করছে, পরিস্থিতি এখনও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক দাবি করলেও মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। খামারিদের আশঙ্কা, বর্ষা দীর্ঘায়িত হলে এই গোখাদ্য সংকট আরও মারাত্মক রূপ নেবে। হাওড় অঞ্চলের সচেতন নাগরিকদের মতে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের টিকিয়ে রাখতে দ্রুত গোখাদ্য ও জরুরি প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কৃষির পর প্রাণিসম্পদ খাতের এই বিপর্যয় হাওড়াঞ্চলের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত পারে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, জেলাজুড়ে মোট ৩ হাজার ৩০৫ টন শুকনা খড় এবং ১০৩ টন কাঁচা ঘাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলাভিত্তিক ক্ষতির মধ্যে খালিয়াজুরিতে প্রায় ৩০০ টন শুকনা খড় ও ১০০ টন কাঁচা ঘাস এবং মোহনগঞ্জে প্রায় ২০০ টন শুকনা খড়ের ক্ষতি হয়েছে। তবে মদন উপজেলায় উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি হয়নি।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার মতে, সার্বিক বিবেচনায় এই ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি বড় নয় এবং এতে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের সহায়তার জন্য উপজেলা প্রশাসন (ইউএনও) ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের (পিআইও) সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। সরকারি ত্রাণ তহবিল থেকে বিশেষ কোনো বরাদ্দ পাওয়া গেলে তা দ্রুত খামারিদের মাঝে বিতরণ করা হবে।

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ