দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরীক্ষা, তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১৩-০৭-২০২৬ ০৮:২২:৫৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৩-০৭-২০২৬ ০৮:৪৪:৫৩ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার মধ্যেই দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের ষষ্ঠ দিনের পরীক্ষা। সোমবার (১৩ জুলাই) দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোমরসমান পানি পেরিয়ে, নৌকা ও ভ্যানে চড়ে চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে দেখা গেছে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা। পরিস্থিতি বিবেচনা করে তারা চলমান পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন।
বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং এর আওতাধীন মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের পরীক্ষা আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত আগেই স্থগিত করা হয়েছিল। তবে অন্যান্য বোর্ডের পরীক্ষা যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়। রোববার (১২ জুলাই) রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকা তলিয়ে গিয়েছিল। এতে করে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা বাতিল করে স্কুল কলেজ বন্ধ ঘোষণা করে। সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কেন্দ্রগুলোতে বৃষ্টি উপেক্ষা করে উপস্থিত হন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। অনেক এলাকায় রবিবারের বৃষ্টির পানি এখনও জমে আছে। নতুন করে বৃষ্টি হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা।
দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বন্যার কারণে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত দুর্বিষহ। নোয়াখালীর হাতিয়ার কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্রে পানি জমে যায় এবং উপজেলার শত শত পরিবার জলাবদ্ধতায় আটকে পড়ে। এছাড়া কুমিল্লার সরকারি মহিলা কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ও ভাষাসৈনিক অজিত গুহ কলেজ কেন্দ্রেও ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে— তা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, পরীক্ষার্থীরা নৌকা, ভ্যান ও কোমরসমান ময়লা পানি পেরিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাচ্ছে। অনেকেই এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে সোমবারের পরীক্ষা স্থগিত না করার সিদ্ধান্তকে অমানবিক বলে উল্লেখ করেন। তবে শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতির জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও তাদের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়েছে।
রোববার দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলের ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের রোববারের নবম শ্রেণির অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষা, দশম শ্রেণির প্রাক-নির্বাচনি পরীক্ষা এবং একাদশ শ্রেণির ব্যবহারিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। অতি বৃষ্টির কারণে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম থেকে নবম শ্রেণির দ্বিতীয় সাময়িক সিটি পরীক্ষা ও ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে। সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুলের দাদশ শ্রেণির ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া, দশম শ্রেণির প্রাক-নির্বাচনি পরীক্ষা স্থগিত করে ১৭ জুলাই নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
একই কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোমবারের সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। তবে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে সরকার কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকেই। পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে অনেকেই সোচ্চার হচ্ছেন সামাজিক মাধ্যমে। সেখানে অনেকেই বলছেন, বন্যা, জলাবদ্ধতা, বৃষ্টিতে আগে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভাবা উচিত। একটি পরীক্ষার তারিখের চেয়ে হাজারো শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি ও সমান সুযোগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগের মধ্যে পরীক্ষা দিচ্ছে। মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে হলেও পরীক্ষা স্থগিত করা উচিত। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে কেউ কেউ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেছেন।
ফেসবুকে একজন পরীক্ষার্থী লিখেছেন, টানা বৃষ্টি, রাস্তায় জলাবদ্ধতা এবং বাসায় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন অবস্থায় পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় বসতে হবে। বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে আলোচনা করে এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনায় পরীক্ষা নেওয়া বা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। যেসব পরীক্ষা পিছিয়ে যাবে, সেগুলো পরে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও লিখছেন, আমরা চাইনি পরীক্ষা পেছাতে। এমন না যে স্টুডেন্টরা সারাবছর পড়ালেখা করে নাই, তাই বলে পরীক্ষার আগে আসছে এসব বলতে। কিন্তু আপনারা একবার ভেবে দেখেছেন— যেই ছেলেটার বাসা অব্দি পানি উঠে আছে, সেই ছেলেটা কি এখনও ঘুমাতে পারছে? তার প্রিপারেশনটা কি ঠিক মতো নিতে পেরেছে? বলতে পারেন সবার তো এমন হয় নাই, কিন্তু কিছু কিছু এরিয়াতে অবশ্যই হয়েছে এবং ড্যাম শিউর অনেক এক্সাম হলেও পানি উঠে আছে। ঢাকা শহরের অধিকাংশ জায়গায় এখনও পানির নিচে। একে তো এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ের আগে এক দিন গ্যাপ, তার ওপর আবহাওয়া ও পরিস্থিতি এতটা বাজে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে একটাই প্রশ্ন — কী এমন হতো যদি এই এক্সামটা কালকে না নিতেন? কী এমন হয়ে যেতো? না রাখতে পারলেন আপনাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি আর না রক্ষা করতে পারলেন— সকল বোর্ডের অধিকার। উল্টো সকল বোর্ডের নাম করে স্ট্যান্ডার্ডহীন প্রশ্ন হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন। মনে রাখবেন, লাখো লাখো শিক্ষার্থীর অভিশাপ নিজের কাঁধে নিয়ে রেখেছেন।
শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত সরকারের। আমরা নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘‘মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের দাবি পুনর্বিবেচনা করুন। টানা বৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ আজ চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। চট্টগ্রামসহ অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে অসংখ্য পরিবার। আবহাওয়া অধিদফতরও আগামী ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। সিলেট ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি জেলায় বন্যার পূর্বাভাস রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা এবং তাদের অভিভাবকরা গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক জায়গা থেকে পরীক্ষা স্থগিতের দাবিও উঠেছে। আজকে পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির ভিডিওগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় নিশ্চয়ই আপনাদের চোখে পড়েছে।’’
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ‘‘শিক্ষামন্ত্রীর কাছে বিনীত আহ্বান, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাদের দাবিটি পুনর্বিবেচনা করা হোক। পরীক্ষা পেছালে মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক অ্যাকাডেমিক প্লানে নতুন করে কিছু জটিলতা তৈরি হবে এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি একজন শিক্ষার্থী সারা জীবনে একবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে এবং তার ফলাফল পরবর্তী জীবনের প্রত্যেকটি ধাপে ইম্প্যাক্ট রাখবে, এটাও সত্য। কোনও শিক্ষার্থী যেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে লাইফ টাইম ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের কোনও ধরনের ক্ষতি হলে, তার দায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এড়াতে পারবে না।’’
শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, ‘‘আমাদের প্রতিবছরই জুলাই-আগস্ট মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় অনেক বেশি বৃষ্টি হয়। পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে তো আর এটা ফ্লেক্সিবল হতে পারে না। সেই জায়গায় যে বিষয়টা হচ্ছে— এলনিনো বলে একটা বিষয় আছে, আবার ‘লা নিনা’ আছে । যেটা প্রশান্ত মহাসাগরের স্রোত ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর ফলে কখনও খরা বেশি হয়— কখনও বন্যা বৃষ্টিপাত বেশি হয়, লা নিনার প্রভাবে বৃষ্টিপাত বেশি হয়, এবার লালিনার বছর। আমাদের যারা আবহাওয়া নিয়ে কাজ করেন তারা জানেন যে, এ বছর আমাদের বৃষ্টি-ঝড়-জলোচ্ছ্বাস এগুলো অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি হবে। সেই জায়গায় আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে যদি আমাদের এই পাবলিক পরীক্ষার রুটিনগুলোকে একটু রি-অ্যাডজাস্ট করা হয়— তাহলে পরীক্ষার্থীদের জন্য ভালো হয়। পরীক্ষার্থীরা যখন একটা রুটিন পায়, তাদের একটা মানসিক প্রস্তুতি থাকে, পরীক্ষার্থীদের তাদের অভিভাবকদের এবং স্কুলের শিক্ষকদেরও প্রস্তুতি থাকে।’’
তিনি বলেন, ‘‘বিদ্যালয়ের সেই প্রস্তুতির জায়গায় ওপরের ম্যানেজমেন্ট আছে, কিন্তু এক্সিকিউশন লেভেলে তো তারা আছে— তাদের ওই জায়গাটাকে ফ্যাসিলিটেট করার জন্য আবহাওয়া অধিদফতরের সাথে আমাদের মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগটা আরও দৃঢ় হওয়া দরকার বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।’’ সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স