ঢাকা , সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬ , ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিপিডিসির পরিচালনা পর্ষদের ১০ নম্বরে চলছে পছন্দের প্রমোশন

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ১২-০৭-২০২৬ ০৪:১৪:২২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১২-০৭-২০২৬ ০৪:১৪:২২ অপরাহ্ন
ডিপিডিসির পরিচালনা পর্ষদের ১০ নম্বরে চলছে পছন্দের প্রমোশন ফাইল ছবি
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) এখন চরম অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও স্বজনপ্রীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এ প্রতিষ্ঠানে সার্ভিস রুলস বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা ও তদবিরের জোরে অযোগ্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কবজায় চলে গেছে ডিপিডিসির পুরো নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক কর্মমূল্যায়নে (এসিআর) সিংহভাগ নম্বর থাকলেও, পরিচালনা পর্ষদের হাতে থাকা মাত্র ১০ নম্বরের অপব্যবহার করে চলছে পছন্দের প্রমোশন বাণিজ্য। এতে মেধার বদলে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক সুবিধা প্রাধান্য পাওয়ায় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে জুনিয়রদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে, এমনকি শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও পদ পাওয়ার নজির গড়েছে ডিপিডিসি। অন্যদিকে, সিন্ডিকেটের বাধায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ডেপুটেশনে আসতে না পারায় শূন্য থাকছে শীর্ষ পদগুলো। ডিপিডিসির বর্তমান প্রশাসনও সেই তালিকা অনুযায়ী গ্রেডেশন তালিকা করে কিছু কর্মকর্তাকে স্থায়ীভাবে এগিয়ে দিচ্ছে, যা আইনত অবৈধ।

এ চরম বৈষম্য ও অনিয়মের কারণে যোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়াচ্ছে, যার ফলে অনেকেই হতাশ হয়ে চাকরি ছাড়ছেন এবং ২৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী এ প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কর্মপরিবেশ ও উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিপিডিসির চাকরিতে কর্মদক্ষতার বার্ষিক গোপনীয় মূল্যায়ন (এসিআর) প্রতিবেদনে ৭৫ নম্বর রয়েছে। অধিকাংশ কর্মকর্তা এসিআরের নম্বর ভালো, কিন্তু পদোন্নতির ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের হাতে যে ১০ নম্বর রয়েছে, সেখানেই অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়। পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের পছন্দের আলোকে ১০ নম্বর ভাগাভাগি করে দেওয়া হয়। অথচ ডিপিডিসিতে পদোন্নতির মাধ্যমে কোনো শূন্যপদ পূরণের ক্ষেত্রে মেরিট বা মেধাই মূল যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা ছিল। চাকরি জীবনে শাস্তি না পেয়ে থাকলে তিনি সর্বোচ্চ ১০ মার্ক পাবেন। কেউ শাস্তি পেলে প্রতিটি লঘু শাস্তির জন্য ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে মার্ক হ্রাস পাবে। গুরুতর শাস্তির জন্য পুরো ১০ মার্ক হ্রাস পাবে এবং স্থায়ীভাবে পদোন্নতির অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। তিনটি লঘু শাস্তি পেলে অর্থাৎ ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বা তার বেশি মার্ক কর্তন করা হলে কোনো প্রার্থী পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হবেন না। এসব নিয়মনীতি কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রদানসহ অসংখ্য অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে বাড়ছে অসন্তোষ।

ডিপিডিসির পরিচালনা পর্ষদ ১৩ সদস্য বিশিষ্ট। কমিটির সিদ্ধান্তে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া হয়। নীতিমালা লঙ্ঘন এবং অনিয়ম বন্ধে ডিপিডিসির চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেছেন ডিপিডিসির ইএসপিএসএন (জি টু জি) প্রকল্প দপ্তরের ডেপুটি ম্যানেজার (এইচআর) শাহ মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব। ওই আবেদনে বলা হয়েছে, ডিপিডিসির সার্ভিস রুলস-২০১৭ লঙ্ঘন করে ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে মনগড়া উদ্ভট এক জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ পদ্ধতি অনুসরণ করে জুনিয়র কর্মকর্তাদের সিনিয়রদের ওপর জ্যেষ্ঠতা প্রদান করা হয়েছে, যার আইনগত কোনো ভিত্তি নেই।

২০২০ সালে ৮টি অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার (আইসিটি) পদের জন্য মোট ২১ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল পরিচালনা পর্ষদ। জ্যেষ্ঠতা তালিকার লঙ্ঘন করে প্রথম এবং দ্বিতীয় কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে ১৮ ও ২০ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে ছয়জনকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করা হয়েছে। তালিকায় ২০ ও ২৩ নম্বরে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দিয়ে ২ ও ৩ নম্বরে রাখা হয়। ডিপিডিসির সার্ভিস রুলস-২০১৭ কার্যকর হওয়ার পর ডিপিডিসির নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা ২০১৩ অনুসরণ করে ২০২২ সালের মার্চে জুনিয়র অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার (আইসিটি) থেকে ডেপুটি ম্যানেজার (আইসিটি) পদে মৃদুল রায়, লুৎফর রহমান, রাশেদুল ইসলাম, এ কে এম রেজাউল করিম এবং মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। হঠাৎ করে কয়েকটি পদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা-২০১৩ প্রয়োগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, চরম বৈষম্যমূলক এবং বেআইনি হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির পদোন্নতির ক্ষেত্রেও নীতিমালা ভঙ্গ করা হয়েছে। উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির ক্রমানুসারে কনিষ্ঠ কর্মকর্তাকে সিনিয়র কর্মকর্তার ওপরে জ্যেষ্ঠতা প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য কয়েকজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এসব কারণে হতাশ হয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

ডিপিডিসির অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজারের (ফিন্যান্স) প্রতিটি শূন্যপদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে দুই থেকে তিনজন কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেয় পরিচালনা পর্ষদ। কিন্তু, ২০২০ সালে দুটি শূন্যপদে পদোন্নতিতে ১০ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। তালিকার ১০ নম্বরে থাকা কর্মকর্তার শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা স্বত্ত্বেও পদোন্নতি দেওয়া হয়। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা বিকম (পাস) হলেও ডেপুটি ম্যানেজার (ফিন্যান্স) পদে পদোন্নতির জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা মাস্টার্স (কমার্স), যা ডিপিডিসির সার্ভিস রুলস, ২০১৭-এর চরম লঙ্ঘন।

জানা গেছে, নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক ক্ষমতা কবজায় রাখতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ক্যাডার কর্মকর্তাদের ডেপুটেশনে প্রেরণ করলে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকমের গুজব রটায় ও কাজের ক্ষেত্রে অসহযোগিতা করেন ডিপিডিসির সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ডিপিডিসিতে প্রশাসন ক্যাডারের নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) ও কোম্পানি সেক্রেটারির পদ খালি রয়েছে। প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা ডিপিডিসিতে সহজে যেতে চাচ্ছেন না।

ডিপিডিসির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিপিডিসিতে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৫ হাজার ৭১৮টি, এর মধ্যে কর্মরত জনবল রয়েছে ৫ হাজার ৮৮ জন। নিজস্ব জনবল ৩ হাজার ১৩৭ জন এবং আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত জনবল ১ হাজার ৯৫১ জন। শূন্যপদ ৫৭৫টি এবং পদোন্নতি শূন্যপদের সংখ্যা ৫২০টি রয়েছে। ডিপিসিসির সাংগঠনিক কাঠামোতে অনেক পদ খালি থাকায় একই ব্যক্তি একাধিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পদোন্নতি যোগ্য ৫২০টি পদ খালি থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে পদোন্নতি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

ডিপিডিসি শ্যামলী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, শের-এ-বাংলা নগর, রামপুরা ব্রিজ থেকে বালু নদী, শীতলক্ষ্যা, গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ শহর পর্যন্ত মোট ২৫০ বর্গ কিলোমিটার পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। সংস্থা থেকে প্রথমে বছরের শুরুতে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর জন্য কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়—যেমন কাজের পরিমাণ, সময়মতো সম্পন্ন করা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও টিমওয়ার্ক। বছর শেষে নির্দিষ্ট সময়ে সে লক্ষ্যগুলো কতটা অর্জিত হয়েছে, তা মূল্যায়ন করে ডিপিডিসি। সরকারি বিধিমালা অনুসারে বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনস্থ অন্যান্য বিতরণ সংস্থার মতো ফিডার পদের জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রণয়নের জন্য দাবি জানানো হয়েছে।

ডিপিডিসিতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে এসব অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও সিনিয়র সচিব (পিআরএল) মো. হামিদুর রহমান খানের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিক বার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন লিখে পাঠালেও তিনি জবাব দেননি। এমনকি তার অফিসে গিয়েও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সূত্র: কালবেলা

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ