ট্রলারেই পারাপার হতে হয় কীর্তিনাশা নদী
বারবার ঠিকাদার বদলেও শেষ হয়নি সেতুর কাজ
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৫-০৭-২০২৬ ০২:৫৭:০৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৫-০৭-২০২৬ ০২:৫৭:০৫ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
এক দশকের অপেক্ষা, তিন দফা ঠিকাদার পরিবর্তন, ব্যয় প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি—তবুও শেষ হয়নি শরীয়তপুরের কীর্তিনাশা নদীর ওপর ভাষাসৈনিক গোলাম মাওলা সেতুর নির্মাণকাজ। ২০১৭ সালে ১৪ কোটি টাকার প্রকল্প হিসেবে যাত্রা শুরু করা সেতুটি শেষ করতে এখন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ কোটি ২ লাখ টাকা। এদিকে, পুরোনো সেতু ভেঙে ফেলার পর গত তিন বছর ধরে নড়িয়া-জাজিরা সড়কে চলাচলকারী হাজারো মানুষকে ট্রলারে নদী পার হতে হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, নড়িয়া উপজেলা সদরকে কীর্তিনাশা নদীর পশ্চিম তীরের মোক্তারের চর, রাজনগর, নশাসন, জপসা ইউনিয়ন এবং জাজিরা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে সংযুক্ত করতে ১৯৯৭ সালে ১০৫ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে সেটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ভারী যান চলাচল বন্ধ করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪৫ মিটার দীর্ঘ নতুন সেতু নির্মাণের দায়িত্ব পায় নাভানা কনস্ট্রাকশন। কিছুদিন কাজ চালানোর পর প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয় এবং ২০১৯ সালে প্রকল্প ছেড়ে চলে যায়। এ সময় পর্যন্ত তাদের ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। পরে ২০২১ সালে নতুন দরপত্রের মাধ্যমে প্রকল্পে ভায়াডাক্ট যুক্ত করে এর পরিধি বাড়ানো হয়। ২৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্পে ১০৫ মিটার সেতু ও ২২২ মিটার ভায়াডাক্ট নির্মাণের দায়িত্ব পায় কোহিনুর এন্টারপ্রাইজ। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র অর্ধেক কাজ শেষ করে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে ৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী আরও ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হবে।
অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে সম্প্রতি তৃতীয় দফায় নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়েছে এলজিইডি। ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে এক বছরের মধ্যে বাকি নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রথম ঠিকাদারের ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা, দ্বিতীয় ঠিকাদারের ১৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং নতুন ঠিকাদারের ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকা—মোট ৩৯ কোটি ২ লাখ টাকা ব্যয় হবে সেতুটি নির্মাণে। অথচ ২০১৭ সালে পুরো প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ছিল মাত্র ১৪ কোটি টাকা।
সেতুর নির্মাণকাজ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নড়িয়া ও জাজিরার বাসিন্দারা। পদ্মা সেতু চালুর পর এ সড়কে যানবাহনের চাপ ও মানুষের যাতায়াত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু কীর্তিনাশা নদীর ওপর সেতু না থাকায় কোনো যানবাহন সরাসরি পারাপার করতে পারছে না। ফলে অনেককে প্রায় ১৫ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে জেলা শহরের প্রেমতলা হয়ে পদ্মা সেতুর দিকে যেতে হচ্ছে।
২০২৩ সালে নতুন সেতুর কাজের জন্য পুরোনো সেতুটি ভেঙে ফেলা হলে নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে ট্রলার। বর্তমানে তিনটি ট্রলারে যাত্রী ও মোটরসাইকেল পারাপার করা হচ্ছে। প্রতিদিন নড়িয়া উপজেলা সদরের একটি কলেজ, দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি এবং চিকিৎসাসেবা নিতে আসা অসংখ্য মানুষ এভাবেই নদী পার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ট্রলারে পারাপারের সময় কয়েক দফা দুর্ঘটনায় বহু যাত্রী আহত হয়েছেন। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বাড়লে ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করে নিরাপদ ও স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে শরীয়তপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রাফেউল ইসলাম বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিতে হয়েছে। কাজ অসমাপ্ত রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য বিল থেকে ২০ শতাংশ জরিমানাও কেটে রাখা হবে।
বাংলাস্কুপ/ প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স