ঢাকা , রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬ , ২১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুনে মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩৮ প্রাণহানি

সড়কে ৫৬ শিশুর অকালমৃত্যু!

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৫-০৭-২০২৬ ১২:১৩:১৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৫-০৭-২০২৬ ০১:০০:৪৪ অপরাহ্ন
সড়কে ৫৬ শিশুর অকালমৃত্যু! ফাইল ছবি
সদ্য বিদায়ী জুন মাসে দেশে ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৪৩৮ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৬ জনই শিশু। এছাড়াও নিহতদের মধ্যে ৪৪ জন নারী। রোববার (৫ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে দেশে ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৪৩৮ জন নিহত ও ৫৬১ জন আহত হয়েছেন। এরমধ্যে ১৪৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর সদ্য বিদায়ী মাসটিতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩০ দশমিক ৭২ শতাংশ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এছাড়া যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৭ জন (প্রায় ১৩ শতাংশ)। অন্যদিকে সদ্য বিদায়ী জুনে দেশে ৯টি নৌ দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত এবং ৪ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ২১টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত ও ৭ জন আহত হয়েছেন।

৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ও নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত মাসে শুধু মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী নিহত হয়েছেন ১৩৪ জন (৩০ দশমিক ৫৯ শতাংশ) এবং বাসের যাত্রী নিহত হয়েছেন ২৭ জন (৬ দশমিক ১৬ শতাংশ)। এছাড়াও ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রলি আরোহী ৩৭ জন (৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ), প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস-অ্যাম্বুলেন্স আরোহী ১৪ জন (৩ দশমিক ১৯ শতাংশ), থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক) ১১২ জন (২৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-টমটম-মাহিন্দ্র) ১৫ জন (৩ দশমিক ৪২ শতাংশ) এবং রিকশা-বাইসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন ৮ জন (১ দশমিক ৮২ শতাংশ)।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৫১টি (৩২ শতাংশ) জাতীয় মহাসড়কে, ১৯৪টি (৪১ দশমিক ১০ শতাংশ) আঞ্চলিক সড়কে, ৬৪টি (১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ) গ্রামীণ সড়কে, ৫৭টি (১২ দশমিক ০৭ শতাংশ) শহরের সড়কে এবং ৬টি (১ দশমিক ২৭ শতাংশ) অন্যান্য স্থানে সংঘটিত হয়েছে। এরমধ্যে ১০৯টি সড়ক দুর্ঘটনা (২৩ দশমিক ০৯ শতাংশ) মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে হয়েছে। এছাড়াও ২০৬টি সড়ক দুর্ঘটনা (৪৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ৯৭টি (২০ দশমিক ৫৫ শতাংশ) পথচারীকে চাপা অথবা ধাক্কা দেয়া, ৫৩টি (১১ দশমিক ২২ শতাংশ) যানবাহনের পেছনে ধাক্কা দেয়া এবং ৭টি (১ দশমিক ৪৮ শতাংশ) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।

দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনার হার ২৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং প্রাণহানি ঘটেছে ২৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। পাশাপাশি রাজশাহী বিভাগে ১৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ দুর্ঘটনায় ১৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ প্রাণহানি, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৩ দশমিক ৭২ শতাংশ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ২৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ, খুলনা বিভাগে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ, বরিশাল বিভাগে ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ৫ দশমিক ০২ শতাংশ, সিলেট বিভাগে ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ, রংপুর বিভাগে ১০ দশমিক ১৬ শতাংশ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ৮ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৪ দশমিক ০২ শতাংশ দুর্ঘটনায় ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রাণহানি ঘটেছে।

এরমধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি (১১৬টি) দুর্ঘটনায় ১১৮ জন নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি ময়মনসিংহ বিভাগে সবচেয়ে কম (১৯টি) দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া শুধু রাজধানী ঢাকায় ৩২টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত ও ৪৯ জন আহত হয়েছেন। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ছাড়াও বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

এই অবস্থায় নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে ১২টি সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সুপারিশগুলো হলো-

১. জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন করে এই কাউন্সিলের অধীনে বিআরটিএ, বিআরটিসি এবং ডিটিসিএ পরিচালনা করতে হবে। সেই সঙ্গে কাউন্সিলের হাতে আইন, বিধি ও নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা থাকতে হবে।

২. বিআরটিএ, বিআরটিসি এবং ডিটিসিএর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং এসব টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে।

৩. মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৪. সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার করতে হবে।

৫. রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করতে হবে।

৬. বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিবহন সেবা উন্নত করে সরকারের পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

৭. দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বৃদ্ধি করে তাদের বেতন, কর্মঘন্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

৮. স্বল্পগতির ছোট যানবাহনের জন্য সব মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণসহ নিরাপদ রোড ডিজাইন করতে হবে।

৯. সব রেল ক্রসিংয়ে গেইট-কিপার নিয়োগ করতে হবে।

১০. সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতন করতে ও দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।

১১. প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ, তারা জনপ্রশাসন পরিচালনা ও নীতিমালা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১২. টেকসই পরিবহন কৌশলের অধীনে সড়ক, রেল ও নৌ-পরিবহন একত্রিত করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে। এতে করে সমন্বিত, পরিকল্পিত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন মনে করে, সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষা-সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অতীব জরুরি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি।
 
বাংলাস্কুপ/ প্রতিবেদক/এনআইএন

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ