যে গ্রামে রবিবার পর্যটকদের প্রবেশ নিষেধ
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
২৯-০৬-২০২৬ ১২:১৯:০৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৯-০৬-২০২৬ ১২:১৯:০৫ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
‘এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর মাওলিনং এখন অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘালয় রাজ্যে অবস্থিত ছোট্ট একটি গ্রাম ‘মাওলিনং’। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের ৬০০ মানুষের এই গ্রামটি পুরো বিশ্বে পরিচিত ‘এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম’ হিসেবে।
প্রতিদিন হাজারো পর্যটক আসেন এই গ্রামের ফুল বিছানো রাস্তা আর নিখুঁত পরিচ্ছন্নতা দেখতে। কিন্তু গত ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে গ্রামবাসীরা নিয়েছেন এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত! প্রতি রবিবার এই গ্রামে পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কিন্তু কেন? যে পর্যটন এই গ্রামের ভাগ্য বদলে দিয়েছে, তাকেই কেন সপ্তাহের একটা দিন ‘না’ করে দিলেন গ্রামবাসীরা?
২০০৩ সালে ‘ডিসকভার ইন্ডিয়া’ ম্যাগাজিন মাওলিনংকে এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রামের খেতাব দেওয়ার পর থেকেই এখানে পর্যটকদের ঢল নামে। গ্রামবাসী চাষবাস ছেড়ে হোমস্টে, রেস্তোরাঁ ও স্যুভেনির দোকান খুলে বসেন। ঘাসের ছাউনি দেওয়া ঘরগুলো রাতারাতি কংক্রিটের দালানে রূপ নেয়।
তবে গত দুই দশকে পর্যটকদের অতিরিক্ত ভিড় এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মাথায় ‘গোপ্রো’ ক্যামেরা লাগানো মানুষের আনাগোনা গ্রামবাসীদের অতিষ্ঠ করে তুলেছে। গ্রামের কমিটির সদস্য প্রিসিয়াস খংদুপ জানান, গ্রামের প্রায় ১০০ ভাগ মানুষই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। রবিবারের এই নিষেধাজ্ঞা মূলত তাদের নিজেদের ‘আসল গ্রামীণ জীবন’ ফিরে পাওয়ার এবং শান্তিতে গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা করার একটি চেষ্টা।
গ্রামের এক বাসিন্দা ফেস্টিভাল খারিম্বা বলেছেন, ‘রবিবার আমাদের চার্চে যাওয়ার দিন, প্রার্থনার দিন। এই দিনে পর্যটকরা থাকলে আমাদের নিজেদের জন্য কোনো সময় থাকে না। তাই এই বিরতিটা আমাদের খুব প্রয়োজন ছিল।’
মাওলিনং গ্রামের পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি দেখার মতো। এখানকার শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে শিশুরা রাস্তা ঝাড়ু দেয়। কিন্তু গ্রামবাসীদের অভিযোগ, সব পর্যটক এই নিয়ম মানেন না।
কিছুদিন আগেই একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যায় পর্যটকরা মাওলিনং-এর সুন্দর রাস্তায় প্লাস্টিকের বোতল ও ময়লা ফেলে রেখে গেছেন। এই ঘটনা গ্রামবাসীদের ভীষণ আঘাত করে। কমিটির সদস্যরা জানান, সপ্তাহের ৬ দিন তারা পর্যটকদের জন্য জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করেন, কিন্তু একটি দিন তাদের নিজেদের সংস্কৃতিরক্ষার জন্য বিশ্রামের প্রয়োজন।
রবিবার সকাল হতেই মাওলিনং যেন একদম চেনা রূপ ছেড়ে অন্য এক শান্ত চাদরে ঢেকে যায়। কোনো পর্যটক নেই, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা একদম ফাঁকা, আর দোকানপাটের কাঠের দরজায় ঝোলে বড় বড় তালা।
গ্রামের রাস্তায় তখন দেখা মেলে কেবল স্থানীয় মানুষদের—যারা নিজেদের সবচেয়ে সুন্দর পোশাকটি পরে, হাতে বাইবেল নিয়ে শান্ত মনে গির্জার দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। চারপাশ থেকে ভেসে আসে কেবলই প্রার্থনার মধুর সুর।
তবে যে পর্যটকরা আগে থেকেই শনি ও রবিবারের জন্য গ্রামে হোটেল বা হোমস্টে বুক করে রেখেছেন, তারা এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকেন। তবে রবিবার গ্রামের সব দোকান ও রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকায় তাদের কিছুটা পানির বোতল বা খাবার কিনতে সমস্যায় পড়তে হয়। কিন্তু গ্রামবাসীদের দাবি, তারা চান দর্শনার্থীরা যেন তাদের আসল আতিথেয়তা বুঝুক, কোনো বাণিজ্যিক কৃত্রিমতা নয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তার ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’-এর সময় এই গ্রামের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। নতুন দিল্লি থেকে আসা পর্যটক বিজয়া দেবনাথ বলেছেন, ‘রবিবার এসে ফিরে যেতে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু গ্রামবাসীদের এই সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান জানাই। ভারত তথা পুরো বিশ্বের মাওলিনং থেকে শেখা উচিত কীভাবে নিজের এলাকা পরিষ্কার রাখতে হয়।’
সপ্তাহের ছয় দিন মাওলিনং বুক চিয়ে স্বাগত জানায় সারা বিশ্বের মানুষকে, আর সপ্তম দিনে এসে এটি নিজের মতো করে জিরিয়ে নেয়।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স