ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬ , ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চা শিল্পের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা: উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২২-০৬-২০২৬ ১২:৪৬:৪৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২২-০৬-২০২৬ ১২:৪৬:৪৭ অপরাহ্ন
চা শিল্পের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা: উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম ছবি : সংগৃহীত
প্রায় ১৭০ বছর ধরে চা উৎপাদন হচ্ছে বাংলাদেশে। চাষাবাদে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগায় ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চা উৎপাদন বাড়েছে। তবে খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাপের মধ্যে আছে এই শিল্পটি। বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধি, সার, কীটনাশক, বিদ্যুৎ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় চা বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

জানা যায়, ১৮৩৫ সালে চীন দেশের সীমানার বাইরে সর্বপ্রথম চা উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১৮৫৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে সিলেটের মালিনীছড়া চা বাগানের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় চা চাষের বিস্তার বৃদ্ধি পেতে থাকে। একেক করে গড়ে তুলা হয় ১৬৮টি চা বাগান। এসব বাগানে সময় যত যাচ্ছে আধুনিকতার ছোঁয়ায় চা উৎপাদন ততই বেড়ে চলছে। তবে ২০২২ সালে শ্রমিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করা, তেলের দাম বৃদ্ধিতে পরিবহন খাতে খরচ বেড়ে যাওয়া, সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় চা উৎপাদন খরচ অনেকটা বেড়ে যায়। আর এতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে বাগান কর্তৃপক্ষকে।

চা উৎপাদনের বিষয়ে বাগান কর্তৃপক্ষ বলেন, আমরা চাই চা বেশি করে উৎপাদন হোক। তবে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আর্থিক সংকট। আমাদের অনেক বাগান ঋণ পাচ্ছে না আবার কেউ চাহিদার তুলনায় কম পাচ্ছে, এর কারণ হলো এসব বাগান লোকসানে আছে অথবা আগের ঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে পারেনি, এ জন্য ঋণ পাচ্ছে না। বাগান মালিকরা যেখানে বাগান চালাতে পারছে না, সেখানে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস ছাড়া অন্য কিছু দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও তা দেওয়া সম্ভব হয় না। শ্রমিকদের বেতন ১২০ টাকা থেকে যখন ১৭০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে এরপর পরিবহন খাতে অনেক খরচ বেড়েছে। বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধি হওয়ার পর থেকে। এ ছাড়া, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত দাম বেড়ে যাওয়া। এসবের দাম বেড়ে যাওয়ার পর থেকে বাগানে বিভিন্ন সমস্যা শুরু হয়েছে। কারণ চা শিল্পটা হলো পুরোপুরি শ্রমিকসহ অন্যান্য খরচের ওপর নির্ভলশীল। বর্তমানে শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি পাচ্ছেন ১৭৮ টাকার ওপরে। চা উৎপাদনে যদি ১০০ টাকা খরচ হয় তাহলে ৮০ টাকা শ্রমিকদেরকে দিতে হচ্ছে। বাকি ২০ টাকা অন্যান্য খাতে ব্যায় হচ্ছে। চা বাগান শিল্পকে কৃষির আওতায় নিলে হয়তো কম লাভে ঋণ পাওয়া যেতো। এ ছাড়া, চায়ের দাম বৃদ্ধি করা খুবই প্রয়োজন।

চা শ্রমিকরা বলেন, ২০২২ সালে আন্দোলনের পর আমাদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করা হয়। বর্তমানে আমরা দৈনিক মজুরি ১৭৮ টাকা ৫০ পয়সা পাচ্ছি। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর ৫ শতাংশ হিসেবে মজুরি বৃদ্ধির কথা রয়েছে। তবে মালিক পক্ষ আমাদের মজুরি বৃদ্ধি করছেন না।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ১০ কোটি ২ লাখ কেজি, ২০২৪ সালে ৯ কোটি ৩০ লাখ কেজি ও ২০২৫ সালে ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। ২০২৬ সালে ১০৪ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি বছরে আগাম বৃষ্টি হয়েছে। গতবছরের তুলনায় এবার চা উৎপাদন বেশি হবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। গত ১০ বছর ধরে চা উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২০২৪ সালে প্রতি কেজি চা নিলামের গড় মূল্য ছিলে ১৭১ টাকা ২৪ পয়সা, ২০২৪-২০২৫ সালে ছিল ২০২ টাকা ৪৬ পয়সা ও ২০২৫-২০২৬ সালে ২৪৫ টাকা ৫০ পয়সা গড় মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। যা বিগত ১০ বছরের তুলনায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামে এ বছর বিক্রি হচ্ছে চা।

চা শ্রমিক পূর্ণিমা রেলি, জাদব রবিদাস, অঞ্জু বলেন, আমরা ১৭০ বছর ধরে এদেশে চা উৎপাদন করছি। আমাদের বাবা দাদারা বিভিন্ন দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছেন। আমরাও কোনো দাবি জানালে আমাদেরকে সেই বৃটিশ আমলের চুক্তিনামা ধরিয়ে দেওয়া হয়। আমরা যে মজুরি পাচ্ছি তা দিয়ে একজন শ্রমিকের পরিবারের ডালভাত কখনো জুটবে না। আমাদের মজুরি প্রতি বছর বৃদ্ধি করার কথা থাকলেও তা করা হয়না। এ ছাড়া, আমাদের বেতন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা সময় মতো দেওয়া হয় না।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, চা শিল্পের অবস্থা গত কয়েকবছরের তুলনায় এখন ভালো। উৎপাদন ভালো হচ্ছে। তবে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে না। প্রতি বছর শ্রমিকের মজুরি ৫ শতাংশ বৃদ্ধির কথা থাকলেও তা বৃদ্ধি করা হচ্ছে না।

চাতলাপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক শুভঙ্কর চন্দ্র নাথ বলেন, চা উৎপাদন বেড়েছে ঠিক তবে চা বাগানগুলোর অবস্থা তেমন ভালো যাচ্ছে না। কারণ চা শিল্পে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। হয়তো হাতেগোনা কয়েকটি বাগান ভালো চলছে তবে বেশিরভাগ বাগানের অবস্থা একই। যতক্ষণ পর্যন্ত চায়ের দাম বৃদ্ধি না হবে ততদিন পর্যন্ত এই সমস্যা থেকেই যাবে। তবে অনেক বাগান কোয়ালিটি রক্ষা করে চা বানাতে পারে না, এজন্য দাম কম পাচ্ছে। আবার কেউ চা বানানোর পর বিক্রি হলো না তখন দুই দিক থেকেই লোকসান হচ্ছে। কারণ হলো অনেক বাগান টাকা খরচ করে চা বানালো আবার বিক্রি করতে পারলো না। বিশেষ করে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি এখন আবার তেলের দাম বৃদ্ধি ও আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ার পর অনেক চা বাগান চালাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। চায়ের গুণগত মান রক্ষা করে চা উৎপাদন বৃদ্ধি করা হলে হয়তো বাগন মালিকদের ক্ষতি কম হবে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডর ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক (পরিকল্পনা) সুমন সিকদার বলেন, ২০২৬ সালে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১০৪ মিলিয়ন কেজি নির্ধারণ করা হয়। ২০২৫ সালে চা উৎপাদন হয়েছিল ৯৪ দশমিক ৯১ মিলিয়ন কেজি। আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০৩ মিলিয়ন কেজি। গতবছরের   চেয়ে এই বছর উৎপাদন ভালো হবে বলে আশাকরি।

বাংলাদেশ চা বোর্ডর চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমার চা উৎপাদনে সমস্যার কথা বলবো না। আমরা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এগিয়ে যাচ্ছি। এই শিল্প থেকে প্রতি বছর আনুমানিক ৪০০ কোটি টাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। চা শিল্পকে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে রক্ষা করা, জলাবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া, যেখানে পানি নেই সেখানে পানি সংগ্রহ করা সবগুলোই হচ্ছে আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া, আরও অনেক চ্যালেঞ্জ আছে সবগুলো সমাধান করে শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা যা করা দরকার আমরা তা করছি।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ