২০৩৩ সাল পর্যন্ত টানতে হবে ঘানি
বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জের খেসারত দিচ্ছে জনগণ
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৬-০৬-২০২৬ ১০:৪০:২৯ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
০৬-০৬-২০২৬ ১১:১২:৫৮ পূর্বাহ্ন
ফাইল ছবি
বেসরকারি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র অনুমোদন ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জের খেসারত দিচ্ছে জনগণ। কিছুদিন পরপরই বিদ্যুতের দামের বড় বোঝা চেপে বসে দেশের মানুষের কাঁধে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাস, কয়লা এবং তেল আমদানি নির্ভরতার কারণে বিদ্যুতের উৎপাদনও ব্যয় বাড়ে। আর সেটির ঘানি টানতে হয় সবাইকে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, প্রয়োজন ছাড়াই বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বেসরকারি খাতে ৩০০ মেগাওয়াট তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানোর চুক্তি করে। সেই চুক্তি শেষ হবে ২০৩৩ সালে। এই তেলভিত্তিক কেন্দ্রের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় সহজে কমবে না। কেননা ওই কেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতে বিশৃঙ্খলার কারণে আগামী বছর সরকারের লোকসান হবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বাড়তি বিদ্যুতের দামের কারণে ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা আয় বাড়লেও বাকি টাকা ভর্তুকি হিসাবে দিতে হবে সরকারকে।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, গত ২০ বছরে বিদ্যুৎ খাতে ঠিকমতো পরিকল্পনা করা হয়নি। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ আমলে কোনো প্রয়োজন ছাড়া চেহারা দেখে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। যার খেসারত দিচ্ছে দেশের জনগণ। যেমন এখন বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা হচ্ছে ১৮০০০-১৮৫০০ মেগাওয়াট। কিন্তু দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা আছে ৩০ হাজার ৯৮১ মেগাওয়াট। এখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ বা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতে চক্রের জালে পড়ে গেছে দেশের জনগণ। সুচিন্তিত ও পরিকল্পিতভাবে এই খাতকে এখনই উদ্ধার করতে হবে। এ জন্য ব্যয় কমাতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিতে হবে। প্রাথমিকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির খরচ বেশি হলেও পরে এর সুফল পাওয়া যাবে।
জানা গেছে, আগস্টে দেশের একমাত্র পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসছে। তার খরচ সরকারকে বহন করতে হবে। এর বাইরে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ৮০০ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র এবং চট্টগ্রামে ইউনাইটেডের ৬০০ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র এ বছরের মধ্যে আসতে পারে। এই কেন্দ্রগুলোকে বড় অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে সরকারকে।
বিইআরসি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের বড় ফাঁদ হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১৩ টাকা দিয়ে কিনে বিতরণ কোম্পানির কাছে ৭ টাকায় বিক্রি করে আসছে। এখন দাম বাড়ানোর কারণে প্রতি ইউনিট প্রায় ১০ টাকায় বিক্রি করবে। এই ১০ টাকার মধ্যে প্রতি ইউনিটে ৫ টাকা ৪৬ পয়সাই হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। অথচ ২০১১ সালে প্রতি ইউনিট ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হতো ২ টাকা ৩৫ পয়সা।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০১১-২০১২ সালে এই চার্জ ছিল ৫ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা, ২০২৪-২০২৫ সালে ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা, ২০২৬-২০২৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৫২ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। বিদ্যুতের চাহিদা আছে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এখন বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে গিয়ে জনগণকে বড় মাশুল দিতে হচ্ছে।
ইউনিট মূল্য ৩ হাজার ৭৫ টাকা : বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পিডিবির ৫০টি ছোট-বড় কেন্দ্র থাকলেও সচল আছে ৯টি। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি বড় রকমের লোকসান দিচ্ছে। যেমন-ঘোড়াশাল ২৬০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় বন্ধ থাকে। কিন্তু এটিকে রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। এজন্য এই কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য পড়ে ৩ হাজার ৭৫ টাকা। একইভাবে টঙ্গী ইউনিটের বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট মূল্য পড়ে ৫ হাজার ১৮৯ টাকা ও বাঘাবাড়ি কেন্দ্রে ইউনিট মূল্য ২ হাজার ৯৭২ টাকা। দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে পিডিবি। অথচ তার জনবল ১০ হাজারের বেশি। পিডিবির বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ৩১ টাকা। অথচ বিক্রি মূল্য ১০ টাকার মতো।
সরকারি বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র রাউজান ২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য পড়ে ৩১ টাকা ৮২ পয়সা। পায়রা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের মূল্য পড়ে (প্রতি ইউনিট) ১৪ টাকা ৫৮ পয়সা। কর্মকর্তারা জানান, গত ১৬ বছরে পিডিবির দক্ষতাকে ভঙ্গুর করে বেসরকারি কোম্পানিকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এর খেসারত আরও কত বছর দিতে হবে কেউ জানে না।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থা : ঘোড়াশাল (নরসিংদী) ১০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট ৫৩ টাকা ৮ পয়সা, নারায়ণগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র ৩৭ টাকা ৪৪ পয়সা, ইউনাইটেডের আনোওয়ারা ৩০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের উৎপাদিত প্রতি ইউনিটের দাম ৪৫ টাকা ৯৭ পয়সা এবং আদানির ইউনিট ১৪ টাকা ৯২ পয়সা। এভাবে অসংখ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম বিক্রি মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বছরের পর বছর ধরে না চালিয়ে প্রতিমাসে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ নিচ্ছে। এসব বেরসকারি কোম্পানির অনেক ব্যাংকের ঋণখেলাপি হয়ে গেছে। তেল আমদানি বা ক্রয়ের এলসি করতে পারছে না। কিন্তু নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জের বিল দিতে হচ্ছে তাদের।
দেশে এখন দৈনিক ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে পিডিবি এবং অন্যান্য সরকারি কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ৪০ শতাংশ। বাকি বিদ্যুৎ বেসরকারি খাত বা ভারত থেকে আমদানি করা হয়। এভাবে পুরো বিদ্যুৎ খাত বেরসরকারি খাতের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। যে কারণে ওইসব বেসরকারি কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত তাদের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ইতঃপূর্বে বলেছেন, বিএনপির নীতি হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতকে বেসরকারি নির্ভরতা কমানো। এখন বেসরকারি খাত থেকে ৬৫ শতাংশের মতো বিদ্যুৎ কেনা হয়। সরকার মনে করে এটি ৩০ শতাংশের বেশি হবে না।
সূত্র: যুগান্তর
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স