ঢাকা , বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬ , ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মালয়েশিয়ার পর ভারত বা চীন যাত্রা

শিগগিরিই শুরু হবে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০২-০৬-২০২৬ ১১:৫৪:৫১ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ০২-০৬-২০২৬ ১১:৫৪:৫১ পূর্বাহ্ন
শিগগিরিই শুরু হবে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিদেশ সফর মালয়েশিয়া দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এক নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ওই সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী আগামী ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হবে তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফর। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে এ সফর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সফরে তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। তিনি মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গেও মতবিনিময় করবেন। এ ছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বৈঠকেও বসবেন সরকারপ্রধান। এদিকে আরেক নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেখান থেকে সরকারি সফরে ভারত কিংবা চীনে যেতে পারেন। তবে তিনি আগে ভারত না চীনে যাবেন তা নির্ধারণ হয়নি। এরই মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করলেও দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে চীন চাইছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুন দেশটিতে সরকারি সফরে যান।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে বিএনপি সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে প্রবাসী কল্যাণ, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, বাণিজ্য-বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ককে প্রাধান্য দেবে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), রপ্তানি, হালাল ফুড সার্টিফিকেশন, শ্রম বাজারসহ অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে আলোচনা হবে।

যা থাকতে পারে মালয়েশিয়া সফরের এজেন্ডায়: মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শুরুর দিকে যে কয়টি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, মালয়েশিয়া তার অন্যতম। বর্তমানে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। প্রায় ৯ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী সেখানে কাজ করেন, যারা নির্মাণ, কলকারখানা, সেবা খাতসহ নানা কাজে নিয়োজিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, দুই সরকারপ্রধানের বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শোষণমুক্ত নিয়োগ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের অনেক সমস্যা রয়েছে। নিয়োগকারী এজেন্সির অতিরিক্ত ফি, চুক্তিভঙ্গ, নির্যাতন এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। নতুন সরকার এসব সমস্যা সমাধানে আলোচনা করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশ আম রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেখানকার বড় বাংলাদেশি কমিউনিটির কারণে বাংলাদেশের ম্যাঙ্গো রপ্তানিকারকরা মালয়েশিয়াকে সম্ভাব্য নতুন বাজার হিসেবে দেখছেন। এ ছাড়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করবেন তারা। হালাল ফুড সার্টিফিকেশন শিক্ষা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সহযোগিতার বিষয়টিও বৈঠকে উঠতে পারে।

এ নিয়ে সরকারের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার বিদেশি শ্রমিকের মধ্যে শীর্ষস্থানে (প্রায় ৩৭ শতাংশ)। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। মালয়েশিয়া বাংলাদেশে পাম অয়েল, পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি করে এবং বাংলাদেশ থেকে পোশাক, চামড়া ও ওষুধ আমদানি করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে এই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এফটিএ সই হলে উভয় দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে সহজে উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হতে পারবে।

মালয়েশিয়া থেকে ভারত অথবা চীন সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফর শেষ করে ভারতে কিংবা চীনে সরকারি সফরে যেতে পারেন। যদি তিনি মালয়েশিয়া থেকে দ্বিতীয় কোনো দেশে সফরে যান তাহলে এটি তার প্রথম ভিভিআইপি বিদেশ সফরের দ্বিতীয় অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থগিত করে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার নানা পদক্ষেপ দৃশ্যমান ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়েও ভারতের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিবর্তন করে তা সামরিক অঞ্চলে রূপান্তর করা হয় এবং সেখানে তুরস্ক ও চীনকে গোলাবারুদ, ড্রোন উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দেশকে বিনিয়োগের জন্য স্থান বরাদ্দ করার পর এভাবে তা পরিবর্তন করা হলে দুদেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ নিয়ে শঙ্কায় থাকেন।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উদ্যোগী হয়। ভারতও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে জনকেন্দ্রিক ও সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সম্মত হয়। এরই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফরে যান, যদিও বাংলাদেশ সরকার এটিকে শুভেচ্ছা সফর হিসেবে উল্লেখ করেছিল। সেই সফরে উপস্থিত থাকা সরকারের এক কর্মকর্তা  বলেন, সেই সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে আলোচনা হয়। এদিকে চীনও চাইছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশটিতে সফরের উদ্দেশে যান। তবে তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফরের পর আগে ভারতে নাকি চীনে যাবেন—তা এখনো নির্ধারণ হয়নি।

নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, তারেক রহমান যদি চীনে যান, তাহলে তিস্তা নদী প্রকল্প, এনার্জি, বাণিজ্য-বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে উদ্যোগী। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী। পদ্মা সেতু, পায়রা বন্দর, বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অসংখ্য প্রকল্প চীনের সহায়তায় বাস্তবায়িত হয়েছে। নতুন সরকার এ সম্পর্ককে আরও গভীর ও লাভজনক করতে চায় তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (টিআরসিএমআরপি), অবকাঠামো, বাণিজ্য-বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ চীনের কাছে তিস্তা প্রকল্পে সহায়তা চেয়েছে। নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীন সফরে গেলে দেশটির পক্ষ থেকে এ নিয়ে আলোচনা হয় এবং এতে বিনিয়োগ করতে দেশটির এক্সিম ব্যাংক আগ্রহ প্রকাশ করে। এ নিয়ে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের এক কূটনৈতিক কালবেলাকে বলেন, ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে চীন। দুই দেশের দীর্ঘ বন্ধুত্বে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কখনোই হস্তক্ষেপ করেনি চীন। বাংলাদেশও ওয়ান চায়না পলিসিকে সমর্থন জানিয়ে এসেছে। দুই দেশের মধ্য যে সম্মান ও পারস্পরিক বন্ধন, তা আরও গভীর করার উদ্দেশ্যে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী চীন।

বিএনপি সরকারের বৈদেশিক নীতি; প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ: বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন। নতুন সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ দর্শনের ভিত্তিতে একটি বাস্তববাদী, অর্থনৈতিককেন্দ্রিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করতে চায়। এ নীতির মূল লক্ষ্য জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে প্রবাসী কল্যাণ, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, বাণিজ্য-বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক কূটনীতি, প্রবাসী কল্যাণ, বিশ্বেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক; ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রাখা এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকার আশা করছে, ভারসাম্যপূর্ণ নীতির মাধ্যমে ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে। তবে বাংলাদেশ ভারত ও চীনের মধ্যে ভূ-কৌশলগত অবস্থান সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোরও চাপ সামলাতে হবে। এ ছাড়া চীনের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, সুদের হার ও শর্তাবলি নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে বলে মনে করেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, অতীতে অনেক প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নতুন সরকারকে এসব এড়িয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। এ ছাড়া দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাবে না। বিএনপি সরকারকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করতে হবে।

সূত্র: কালবেলা

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন   

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ