মাইলস্টোন দুর্ঘটনার মামলার বাদীকে কেএনএফ সদস্য আখ্যা
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১৩-০৫-২০২৬ ০৭:৩৭:১৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৩-০৫-২০২৬ ০৭:৩৭:১৪ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ তুলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, বিমানবাহিনী প্রধানসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করেছিলেন যিনি, সেই উসাইমং মারমাকে পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সদস্য আখ্যা দিল এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন।
সশস্ত্র বাহিনীর সাবেকদের এ সংগঠনের প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট (অব.) সাইফুল্লাহ খান সাইফ বুধবার (১৩ মে) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “তার নাম উসাইমং মারমা। আমরা আপনাদের অনুরোধ করব, এই উসাইমং মারমা কে, তার সম্পর্কে একটু খোঁজ নেন।”
উসাইমং মারমা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী উক্য ছাইং মারমার বাবা। সম্প্রতি তিনি ফেইসবুক লাইভে এসে অভিযোগ করেন, মামলার আবেদন করার পর তার রাঙামাটির বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
উসাইমং মারমা ওই অভিযোগ তোলার দুই দিনের মাথায় ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে পাল্টা অভিযোগ আনল এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, "গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, তাদের পেশাদার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা এবং সদস্যদের মনোবল দুর্বল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।”
সাইফুল্লাহ খান সাইফ বলেন, "যখন বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিকে আরও সুদৃঢ় করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে এবং সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক, যুগোপযোগী ও সক্ষম বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, ঠিক সেই সময় ধারাবাহিকভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য, অপপ্রচার ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
“বিশেষ করে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন কার্যক্রম, ফাইটার প্লেন ক্রয় এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জনের উদ্যোগ সামনে আসার পর থেকেই একটি গোষ্ঠী বাহিনীকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সম্মানিত বিমান বাহিনী প্রধানের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন, বিমান বাহিনীর সাথে চরমপন্থার মত স্পর্শকাতর বিষয়কে জড়ানোর অপচেষ্টা এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে জনমনে সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত।"
উসাইমং মারমা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ তুলে গত ৭ মে মামলার আবেদন করলে তা গ্রহণ করার মত ‘উপাদান না থাকার’ কারণ দেখিয়ে খারিজ করে দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম।
সেই মামলার আবেদনে বলা হয়, প্রতিদিনের মতো মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা গত বছরের ২১ জুলাই স্কুলে গিয়েছিল। সেদিন দুপুর ১টা ১৮ মিনিটের দিকে ‘আসামিদের সরাসরি দায়িত্বে ও তত্ত্বাবধানে থাকা ত্রুটিযুক্ত’ প্রশিক্ষণ বিমান এফ-৭ বিজিআইকে উড্ডয়নের আদেশ দেওয়া হয়। ‘নবীন’ পাইলট একা ওই যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করলে ‘ত্রুটিজনিত কারণে’ মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিধ্বস্ত হয়।
এতে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষিকা, তিনজন অভিভাবক এবং একজন পরিচালকসহ ৩৫ জন মারা যায়। এছাড়া ১৭২ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
আবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটিতে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকায় এবং ভবনটি যথাযথ বিধি মোতাবেক নির্মাণ না করায় উদ্ধার কাজে চরম ব্যাঘাত ঘটে। এ কারণে উদ্ধারকর্মীরা উদ্ধার কাজে সহায়তা শুরু করলেও হাসপাতালে নেওয়ার আগেই শিক্ষার্থীরা মারা যায়।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়াও সেই সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, সাবেক শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুবায়ের, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, এয়ার ভাইস মার্শাল মোরশেদ মোহাম্মদ খায়ের উল আফসার, গ্রুপ ক্যাপ্টেন রিফাত আক্তার জিকু, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিংবডির উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নুরনবী, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম, প্রিন্সিপাল (প্রশাসন) মাসুদ আলম, স্কুল শাখার প্রিন্সিপাল রিফাত নবী, রাজউক চেয়ারম্যান, রাজউকের ফিল্ড সুপারভাইজারকে (উত্তরা) সেখানে আসামি করা হয়।
মামলা খারিজ হওয়ার পর গত ১১ মে ফেইসবুক লাইভে এসে উসাইমং মারমা বলেন, গত শুক্রবার গভীর রাতে তিনি যেখানে চাকরি করেন, সেখানে ২০-৩০ জন পুলিশ গিয়ে তার খোঁজ করে।
“আমার নিজ গ্রামে আমার নিজ বাড়িতে আশেপাশে প্রতিবেশীদের বাসায় পুলিশ আমাকে তল্লাশি করে খুঁজছিল যে আমি আছি কি না। কেন? প্রতিবেশীরা জানতে চাইল কেন? যে বললো ‘উনার নামে ওয়ারেন্ট আছে, ওই ওয়ারেন্ট যেহেতু আছে আমরা উনাকে ধরতে আসছি আর কি’।
“তো পাশাপাশি গতকাল বাংলাহিলিয়া আর্মি ক্যাম্প থেকে ওয়ারেন্ট অফিসার আমাকে জিজ্ঞাসা করল যে ‘আপনি কী করেন? আপনি কোথায় চাকরি করেন? আপনার ওয়াইফ কোথায় থাকে? কী চাকরি করে?’ এই বিষয়গুলো কিন্তু উনারা জানতে চেয়েছে। আমি কিন্তু উনাদেরকে বলেছি। তো বলার পর আজকে সকালে নাকি আবার আমার নিজ এলাকার মধ্যে আর্মিরা নাকি আমাকে খুঁজছে, খোঁজখবর নিচ্ছে।”
এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন জানিয়ে উক্য ছাইং মারমার বাবা বলেন, “মামলা করাটাই কি আমার অপরাধ ছিল? আমি আমার ছেলের বিচার চেয়েছি। আমি আমার ছেলের বিচারের প্রেক্ষিতে আমি ক্ষতিপূরণ চেয়েছি এবং বিগত সরকার আমাকে কোনো কিছু সুরাহা করে নাই। এবং আমি বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তরে আমি ঘুরেছি কিন্তু আমি এটার সুরাহা কোনো কিছু পাই নাই।
“তো সেই ক্ষেত্রে আমি যেহেতু আমার ছেলে তো মারা গেছে, আমার তো কিছু নাই আর। আমার তো কিছু নাই। আমার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে কোনো কিছু একটা করার একটা স্বপ্ন ছিল। আমার তো সব স্বপ্ন ভেঙে গেছে। তো এখন যা দেখছি যে আমি কেন মামলা করলাম? কেন যাদের বিরুদ্ধে আমি মামলা করেছি, কেন তাদের বিরুদ্ধে আমি মামলা করলাম এইটা যে আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এখন আমাকে পুলিশ খুঁজছে, আর্মি খুঁজছে।”
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে উসাইমং মারমা ভিডিও বার্তায় বলেন, “আমার একটাই আবেদন থাকবে যে যাতে আমি সুন্দর জীবনযাপন করতে পারি মতো, নিরাপত্তাহীনতা না ভুগি মতো প্রধানমন্ত্রী আমাকে সেই সুব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
বুধবার এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সংবাদ সম্মেলনে উসাইমং মারমার মামলার আবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন করলে সংগঠনের প্রেসিডেন্ট সাইফুল্লাহ খান পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেন, "মামলাটা কত মাস পর করতে গেছেন তিনি? ওই মামলাটা কে করেছেন তার নাম আপনারা জানেন?"
মামলা দায়েরকারী ব্যক্তি মাইলস্টোন স্কুলে ফাইটার প্লেন দুর্ঘটনায় নিহত এক শিশু শিক্ষার্থীর বাবা জানানো হলে সাইফুল্লাহ খান বাদী সম্পর্কে সাংবাদিকদের ‘খোঁজখবর’ নিতে বলেন।
“তিনি কোথায় থাকেন, তার ব্যাকগ্রাউন্ড কী এসব জানার চেষ্টা করেন। কয়েকদিন আগে সন্তু লারমার স্ত্রী কানাডায় একটা প্রোগ্রামে সশস্ত্রবাহিনী সম্পর্কে অসংখ্য মিথ্যাচার করেছেন। পাহাড়ে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী এই করে সেই করে–এসব যত ধরনের মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর কথা বলা যায়, তিনি বলেছেন। এরা হল সব কুকি চিন যারা আছে, এদেরই একটা অংশ... আমি শুধু আপনাদের এতটুকু ক্লু দিলাম।"
কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন।
বিমান বাহিনীর কয়েকজন সদস্যকে ‘উগ্রপন্থার’ সঙ্গে জড়িত সন্দেহে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে কিছুদিন আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেই সংবাদ প্রতিবেদনগুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন জানতে চাইলে সাইফুল্লাহ খান বলেন, "সশস্ত্র বাহিনীর বিষয়ে তথ্য ও খবর দিয়ে থাকে আইএসপিআর। যেহেতু এ বিষয়ে তাদের কাছ থেকে কোন বক্তব্য আসেনি, তাই বিষয়টাকে গুজব বলে ধরে নেওয়া যায়।"
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচএইচ/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স