ঢাকা , বুধবার, ০৬ মে ২০২৬ , ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​রাবনাবাদ চ্যানেল

জলেই গেল সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা: নাব্যতা সংকটে মাদার ভেসেল আসছে না

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৬-০৫-২০২৬ ০৬:২৪:০০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৬-০৫-২০২৬ ০৬:২৪:০০ অপরাহ্ন
জলেই গেল সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা: নাব্যতা সংকটে মাদার ভেসেল আসছে না পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলে প্রস্তুত প্রথম টার্মিনাল। (ডানে) চ্যানেলের মে মাসের নাব্যতার চার্ট। ছবি: বাংলাস্কুপ
বিগত সরকারের সময় দক্ষিণের তথা বৃহত্তর বরিশালের সবচেয়ে আলোচিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ছিল পায়রা বন্দর নির্মাণ। দেশের তৃতীয় এই সমুদ্র বন্দর নির্মাণকে ঘিরে এই জনপদের মানুষকে দেখানো হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের স্বপ্ন। রঙিন সেই স্বপ্নে বিভোর থাকা লালুয়ার কৃষক ও জেলেসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁদের চাষাবাদের তিন ফসলী কৃষি জমি কোন ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই পায়রা বন্দরকে ছেড়ে দেন। বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় সাত হাজার একর কৃষি জমির দখল বুঝে নেয়। ২০১৬ সাল থেকে বন্দরের প্রকল্প এলাকার কার্যক্রম শুরু হয়। টিয়াখালী নদী তীরে পায়রা বন্দরের প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। গ্রামীণ প্রবাদের মতো গোয়ালঘর করার আগে গরু কেনার মতো অবস্থা ছিল পায়রা বন্দর নির্মাণ প্রক্রিয়া। পায়রা বন্দর চালুর আগেই ব্যাপক সংখ্যক জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ এখনো পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনালগামী সড়ক ও সেতুর কাজ সম্পন্ন হয়নি। 

সবচেয়ে আলোচিত ছিল ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ড্রেজিংএর কাজ। ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলে পণ্য বোঝাই মাদার ভেসেল চলাচল উপযোগী করা হয়েছে এই ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে। বলা হয়েছে, নাব্যতা বাড়ানো হয়েছে প্রায় সাড়ে দশ মিটার পর্যন্ত। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কার্যক্রম আদৌ সময়োপযোগী ছিল কি না- তা নিয়ে এখন নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কারণ পোর্ট, ফার্স্ট টার্মিনাল চালু হয়নি; অথচ পাঁচ বছর আগে কেন ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হয়েছে, এমন প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনেও ঘুরপাক খাচ্ছে। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করেছে, পায়রা বন্দরে গত দুই বছরে পণ্যবাহী কিংবা কয়লাবাহী কোন মাদার ভেসেল ভিড়েনি। এই চ্যানেলের বর্তমান নাব্যতা মাদার ভেসেল চলাচল উপযোগী নয়। অবস্থানভেদে বর্তমানে এই চ্যানেলের নাব্যতা পাঁচ-সাড়ে ছয় মিটার।

পায়রা বন্দরসূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ১৯ মার্চ কয়লাবাহী একটি মাদার ভেসেল (ডেজার্ট ভিক্টোরি) চট্টগ্রামে এসে পৌছেছে। সেখান থেকে লাইটারিং করে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌছানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাসহ সচেতন মহলের দাবি, ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে নামে মূলত রাষ্ট্রের ছয় হাজার কোটি টাকা লুটপাট কিংবা ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে পায়রা বন্দরের একটি সিন্ডিকেট সরাসরি জড়িত রয়েছে।

একাধিক দায়িত্বশীল পর্যায়ের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে বলেছেন, ওই টাকা দিয়ে চ্যানেলের স্বাভাবিক নাব্যতা বজায় রাখতে নিয়মিত (রেগুলার মেইনটেনেন্স) খননের জন্য ড্রেজার মেশিন কিনে রাখলে আজকের এই বন্দরের চ্যানেলটি জাহাজ চলাচলের উপযোগি রাখা যেত।

পায়রা বন্দরের দায়িত্বশীল সূত্রমতে, বর্তমানে ফার্স্ট টার্মিনাল পর্যন্ত সিক্সলেন সড়কের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া আন্ধারমানিক নদীর ওপর ফোরলেন সেতুর নির্মাণ কাজ প্রায় ৭৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের শেষের দিকে সড়ক পথে সরাসরি পণ্য খালাশের কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। তাহলে কেন তড়িঘড়ি করে পাঁচ বছর আগে (২০২১ সালে) ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে শুরু করা হয় ক্যাপিটাল ড্রেজিং। 

পায়রা বন্দরসূত্রে জানা গেছে, রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পে ব্যয় করা হয় ৬৫০০ কোটি টাকা। বেলজিয়ামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জান-ডি-লুন এই কাজ সম্পন্ন করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চ্যানেলের নাব্যতা ১০ দশমিক ৫ মিটার গভীরতায় উন্নীত করার লক্ষ্য ছিল। ২০২১ সালে শুরু হয়ে ২০২৩ সালে এই ড্রেজিং কার্যক্রম সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে দ্রুত পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় এই ড্রেজিংয়ের কার্যকরিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বর্তমানে নাব্যতা ছয় মিটারে নেমে এসেছে। কোথাও কোথাও আরো কম। সাড়ে পাচঁ মিটার। বাংলাদেশের ইতিহাসে এতো বেশি ব্যয় করে কোন বন্দরের ড্রেজিং করা হয়েছে কি না তাও আলোচনায় উঠে এসেছে। তাও আবার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে এই ব্যয় মেটানো হয়। 

স্থানীয় জেলেদের দাবি, এই চ্যানেলে সচরাচর ৭-৮ থেকে কখনো বর্ষা মৌসুমে ১০ মিটারের বেশি নাব্যতা থাকত। খননের কাজ আদৌ ঠিকঠাক হয়েছে কি না তা নিয়ে সহজ-সরল মনের জেলেসহ সাধারণ কৃষকরাও নানান প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন। মূলত এটি ভাগবাটোয়ারা ও লুটপাটের প্রকল্প ছিল এমনটাও প্রচার পাচ্ছে ।

কয়লাসহ লাইটার জাহাজের চালক, বালি বহনকারী বিভিন্ন বাল্কহেড চালক ও রাবনাবাদ চ্যানেলের ফিশিংবোট মাঝিদের দাবি, ২০২৩ সালে ক্যাপিটাল ড্রেজিং শেষে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ রাবনাবাদ চ্যানেলের নাব্যতা সাড়ে দশ মিটার বলে জানিয়েছিল। যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে পাঁচ দশমিক আট থেকে সর্বোচ্চ ছয় দশমিক পাঁচ মিটারে। মাত্র এক/দেড় বছরের মধ্যে নাব্যতা প্রায় অর্ধেক নেমে গেছে। বর্তমানে আরো কমে গেছে বলে জেলেরা জানিয়েছেন। চ্যানেলের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, অনেক সময় শুধু জোয়ারে (হাই টাইড) জাহাজ চলতে পারে। বর্তমানে গড় নাব্যতা ৫ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ৩ মিটারে পৌছেছে।  

পায়রা বন্দরের ওয়েবসাইটে বর্তমানে মে মাসের দেওয়া তথ্যানুসারে, পায়রার রাবনাবাদ চ্যানেলের গড় নাব্যতা প্রায় পাচ দশমিক চার মিটার থেকে পাঁচ দশমিক নয় মিটারের মধ্যে ওঠানামা করছে। কাউয়ারচর পয়েন্টের জোয়ার-ভাটার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া চার্ট থেকে নাব্যতার এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে জোয়ারের সময় এই নাব্যতা সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পায়। ভাটার সময় অনেক কম। ফলে এই গভীরতার চেয়ে বেশি ড্রাফটসম্পন্ন জাহাজ বর্তমানে চ্যানেলে প্রবেশ করতে পারে না। পারে না বন্দরে ভিড়তে।

মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে চ্যানেলটির গভীরতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। লালুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শওকত হোসেন তপন বিশ্বাস জানান, ২০২১ সালে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না। এটি ছিল নিজস্ব গোয়ার্তুমির ফল। টাকাটাই জলে গেছে। 

পায়রা বন্দরের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে, রাবনাবাদে হিমালয় থেকে আসা বিপুল পরিমাণ পলি (বছরে প্রায় ৪০ কোটি ঘনমিটার) এই চ্যানেলে জমা হওয়ার কারণে সারাবছর নাব্যতা ধরে রাখা একটি বড় প্রযুক্তিগত ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ। তবে সরকার ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ১২ লক্ষ ঘনমিটার রক্ষণাবেক্ষণের ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চ্যানেলের নাব্যতা নয় মিটারে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এবং এই বছরের শেষের দিকে বন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, এটি এখন অগভীর নদীবন্দরের অবস্থায় নেমে গেছে। এক কথায়, নাব্যতা সংকট প্রকট হয়েছে। জাহাজের চালকদের দেয়া তথ্যমতে, ছোট কার্গো (১০০০ টিইউ) চলাচলে অন্তত ৮ দশমিক ৭ মিটার নাব্যতার প্রয়োজন হয়। একইভাবে বড় জাহাজ (৪০০০ টিইউ) চলাচলে নাব্যতা দরকার ১২ দশমিক ৫ মিটার। আর সেখানে রাবনাবাদের নাব্যতা পৌছেছে ৫দশমিক ৮ থেকে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৫ মিটারে। এক কথায় বড় জাহাজ এই চ্যানেলে ঢোকার মতো নাব্যতা নেই। ফলে পায়রা বন্দরের কোন জেটিতে মাদার ভেসেল সরাসরি ভিড়তে পারে না। কয়লা কিংবা অন্য কোন মালামালবাহী মাদার ভেসেল মাঝসমুদ্রে বহির্নোঙরে কিংবা অন্য কোন (চট্টগ্রাম) বন্দরে ভিড়ে খালাশ করতে হয়। তারপরে ছোট জাহাজ কিংবা লাইটার ভেসেল দিয়ে পায়রায় নিতে হয়।

স্থানীয় প্রবীণ জেলে আফসার আলী দাবি করেন, এই অঞ্চল পলি বহনকারী নদী। তারপরে এই চ্যানেলটি সাগরের মিলনস্থলে। প্রতিদিন নতুন করে পলি জমতে থাকে। ভরাট হতে সময় লাগে না। 

একাধিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই চ্যানেল প্রাকৃতিকভাবে সিল্ট-প্রবণ। হাজার কোটি টাকা দিয়ে ড্রেজিং করলেও ড্রেজিং বন্ধ থাকলে আবার দ্রুত ভরাট হয়ে যায়। প্রতিনিয়ত ড্রেজিং দরকার। নইলে এটিকে মাদার কিংবা বেশি গভীরতার লাইটার ভেসেল চলাচলের উপযোগী রাখা কোনভাবেই সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের নদ-নদী, পরিবেশ ও জলবায়ু আন্দোলনের নেতা ধরীত্রি রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সদস্য সচিব ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, ‘গঙ্গা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম পলি বহনকারী নদীব্যাবস্থা হওয়ায় মেঘনা মোহনার ডান দিকে অবস্থিত রাবনাবাদ চ্যানেলটি খুব কম সময়ে পলি দ্বারা ভরাট হয়ে যাবে। তাই বাংলাদেশ ডেল্টার উপকূলীয় অঞ্চলের এই অংশে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর ও তাকে ঘিরে গড়ে উঠা আমদানিনির্ভর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্রসহ অন্যান্য শিল্পায়ন ছিল অপরিকল্পিত ও অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড, যা আমরা শুরু থেকেই উল্লেখ করে আসছি। কিন্তু তৎকালীন সরকার আমাদের কথায় কর্ণপাত না করে এই অঞ্চলে বন্দর ও ভারী শিল্পকারখানা স্থাপন করে। কিন্তু বর্তমানে পায়রা বন্দরে বড় জাহাজ আসতে না পারায় এই পথে পণ্য পরিবহন খরচ বহুগুণে বেড়েছে। প্রতি টনে অন্তত তিন থেকে পাঁচ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পরিবহনে সমস্যা হওয়ায় বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় পাশাপাশি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বন্দরে বড় জাহাজ না আসায় বন্দরের কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। উল্টো ইলিশসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা আজ ধ্বংসের মুখোমুখি, বিশাল জেলেগোষ্ঠীর জীবিকা বিপন্ন ও ঐ অঞ্চলের বিরল প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে।

অভিজ্ঞমহলের মতে, পায়রা বন্দরের এখন মূল সমস্যা পলি জমা। এর সমাধান নিয়মিত ড্রেজিং করা। যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু এটিও অস্থায়ী সমাধান। পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের সমস্যাটি প্রকৃতিগত। তাই শুধুমাত্র ড্রেজিং দিয়ে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ কারণে পায়রা বন্দর বহু আগে নদীপথে পণ্য খালাশের কার্যক্রম চালু করলেও পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। বড় জাহাজ আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে চ্যানেলের এমন অবস্থার খবরে এই জনপদের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত বন্দরের ভবিষ্যত নিয়ে উৎকন্ঠায় পড়েছেন।

বাংলা স্কুপ/প্রতিনিধি/এইচএইচ/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ