ঢাকা , সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬ , ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লোডশেডিংয়ে মরে যাচ্ছে মুরগি, মহা সংকটে খামারিরা

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৭-০৪-২০২৬ ০৭:৫৫:৪৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৭-০৪-২০২৬ ০৮:০১:২৭ অপরাহ্ন
লোডশেডিংয়ে মরে যাচ্ছে মুরগি, মহা সংকটে খামারিরা সংবাদচিত্র: সংগৃহীত
দেশে চলমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে যোগ হয়েছে ঝড়ের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এতে করে লোডশেডিং বেড়েছে চরম আকারে। ফলে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পোলট্রিশিল্প। বিশেষ করে গ্রামের খামারিরা লোডশেডিং ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। প্রচণ্ড গরমে প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে খামারের মুরগি। এতে ডিম ও মাংসের উৎপাদনও কমেছে। ঘরের চালে ঝরনা, বাড়তি ফ্যানের ব্যবস্থা করেও মুরগি সুস্থ রাখতে পারছেন না। ফলে চরম লোকসানে পড়ছেন খামারিরা।  সোমবার (২৭ এপ্রিল) প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত-

ময়মনসিংহ: ‘দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুৎ না থাকলে রাতের অন্ধকারে ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা খাবার খেতে চায় না। দিনের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকলে গরমে মুরগি ও বাচ্চা হাঁপাতে থাকে। একপর্যায়ে স্ট্রোক করে মারা যাচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে এরকম ঘটনার ঘটছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে খামার খালি হয়ে যাবে। তখন চালান তোলাও সম্ভব হবে না।’ কথাগুলো বলেছেন ময়মনসিংহ সদরের গোপালনগর গ্রামের ব্রয়লার মুরগির খামারি নজরুল ইসলাম। তিনি  জানান, তার খামারে চলতি মাসের ৮ এপ্রিল ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা এনে পালন করছেন। বর্তমানে বাচ্চার বয়স ১৮ দিন। এরই মধ্যে লোডশেডিংয়ে হিটস্ট্রোক করে অনেকগুলো বাচ্চা মারা গেছে। বিদ্যুতের এই অবস্থা থাকলে মৃত্যুর হার আরও বাড়বে। তখন ব্যাপকভাবে লোকসানে পড়তে হবে। শুধু নজরুল নন, লোডশেডিংয়ের কারণে জেলার বেশিরভাগ খামারিদের একই অবস্থা। একই গ্রামের খামারি আল আমিন  বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্যানের বাতাস খামারে দেওয়া সম্ভব হয় না। প্রয়োজনীয় বাতাস না পেলে মুরগির বাচ্চা হাঁপাতে থাকে। একপর্যায়ে স্ট্রোক করে মারা যায়। এ কারণে মৃত্যুর হাত থেকে বাচ্চাকে রক্ষা করার জন্য দামি দামি ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়। খরচ বেড়ে যায়। পরে বিক্রি করেও চালান তোলা যায় না। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আমরা বড় ধরনের লোকসানে পড়ে যাবো।’ শহরের আরেক মুরগি খামারি আব্দুস সালাম বলেন, ‘বর্তমানে দিনে রাতে ঘন ঘন লোডশেডি হচ্ছে। খামারিদের ব্যবসা বাঁচাতে হলে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ দিতে হবে। না হয় কোনও খামারি টিকবে না।’ লোডশেডিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ ভবনের সহকারী প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম  বলেন, ‘নানা কারণে লোডশেডিং অনেক বেড়েছে। সরকার কমিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমরা চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছি না, এজন্য গ্রাহকদের সরবরাহ করতে পারছি না।’

গাজীপুর:  গাজীপুরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে খামারের মুরগি মারা যাচ্ছে। আবার জ্বালানির দাম বাড়ায় ও সংকটে মাঝেমধ্যে জেনারেটর চালিয়েও মুরগি বাঁচানো যাচ্ছে না। এমনটি জানিয়েছেন শ্রীপুর উপজেলার গোলাঘাট গ্রামের খামারি আবু তালেব। ২৫ বছর ধরে পোলট্রিশিল্পের সঙ্গে যুক্ত তিনি। নিজ গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে তার খামার বিস্তৃত। কয়েকটিতে মাংস এবং বেশিরভাগ শেডে ডিমের জন্য মুরগি পালন করেন তিনি। এখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। তালেবের সোহাদিয়া গ্রামের পোলট্রি খামারে দেখা যায়, বিদ্যুৎ নেই। দুটি জেনারেটর চলছে। তালেব জানান, গত বুধবার ঝড়ের পর শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসেনি। এ ছাড়া নিয়মিত লোডশেডিং তো আছেই। তেল কিনতেও সমস্যার কথা জানিয়ে তালেব বলেন, ‘জেনারেটর চালাবো, সেজন্য তো ডিজেল পাচ্ছি না। পাম্পে গেলে তো সিরিয়াল ধরে তেল পাই না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে প্রতি লিটারে ৩০-৫০ টাকা বেশি দিয়ে তেল কিনতে হয়।’ আবু তালেব বলেন, ‘ডিম দেওয়া মুরগিতে নির্দিষ্ট সময়ে আলো না দিলে ডিমের উৎপাদন কমে যায়। কৃত্রিম উপায়ে বাতাস না দিলে মুরগি রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হয়, স্ট্রোক করে মারা যায়। সময়মতো পানি সরবরাহ না করতে পারলে মুরগি হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। প্রচণ্ড উত্তাপে মুরগির টোটাল লেভেল (উৎপাদন ও শারীরিক সক্ষমতা) কমে যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের কারণে মুরগির পাতলা পায়খানা হয়। অতিরিক্ত ভিটামিন প্রয়োগ করতে হচ্ছে। এভাবে খরচ বাড়ে; কিন্তু উৎপাদন কমে। তখন দামও বেড়ে যায়। আগে এক হাজার মুরগি জন্য বিদ্যুৎ খরচ হতো তিন থেকে চার হাজার টাকা। সেখানে বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার টাকায় উঠে গেছে। উৎপাদন খরচ থেকে বর্তমানে প্রতিটি ডিমে প্রায় দুই টাকা লোকসান গুনছি। পোলট্রিশিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অথবা ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি দিতে হবে। তা না হলে সংকট বাড়তেই থাকবে। এতে বাজারের ডিম ও মাংসের সরবরাহ কমে যাবে। সাধারণ মানুষের প্রোটিনের প্রধান এই উৎসের দাম নাগালের বাইরে চলে যাবে।’ শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন বলেন, ‘এ সেক্টরকে বাঁচাতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ জরুরি। সেজন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান করা না গেলে অন্তত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি তেল পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে খামারিদের।’

বরিশাল : বিদ্যুতের কারণে লোকসানে পড়েছেন বরিশালের মুরগির খামারিরাও। লোডশেডিংয়ে হিটস্ট্রোক করে মারা যাচ্ছে মুরগি। এতে করে পোলট্রিশিল্প বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে জানিয়েছেন তারা। বরিশাল বিদ্যুৎ বিভাগের কন্ট্রোল রুম সূত্র জানিয়েছে, শহরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। বরিশাল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বলছে, গ্রামে ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং দিতে হয় তাদের।  বরিশাল সদর উপজেলার সোলনা বাজারের মুরগির ফার্মের মালিক মো. পলাশ  বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমার ফার্মের ২০০ মুরগি হিটস্ট্রোকে মারা গেছে। লোডশেডিংয়ের কারণে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ কারণে বেশিদিন খামারে মুরগি রাখা যাচ্ছে না, বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছি আমরা।’ একই কথা জানিয়েছেন খামারি মাসুম, আরমান কাওসার। তারা জানিয়েছেন, খামার টিকিয়ে রাখতে লোকশান গুনতে হচ্ছে। বিশেষ করে লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর ভাড়া করতে হয়েছে। কিন্তু তার জন্য তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। তেল নিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। বয়লার মুরগি দুই থেকে তিন কেজি হলে ভালো দাম পাওয়া যায়। কিন্তু এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, এক কেজি হলেই তা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে খামারিরা পুঁজি হারিয়ে পথে বসবেন বলে জানান তারা। এজন্য সরকারের কাছে তাদের আবেদন দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সংকট নিরসন করার।

রাজশাহী: রাজশাহীতে ঘন ঘন লোডশেডিং ও তীব্র গরমে ক্ষতির মুখে পড়েছেন খামারিরা। হিটস্ট্রোকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে অসংখ্য মুরগি। রাজশাহী পোলট্রি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, নগর ও জেলার বিভিন্ন প্রান্তে পাঁচ হাজারের বেশি হাঁসমুরগির খামার আছে। তবে প্রাণিসম্পদ দফতরের হিসাবে আছে আট হাজার। বর্তমানে অধিক তাপের কারণে বাচ্চা ফোটানো বন্ধ রাখা হচ্ছে। কোনও কোনও খামার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে পোলট্রি ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা। রাজশাহী পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক  বলেন, ‘ঘন ঘন লোডশেডিং ও তীব্র গরমে বর্তমানে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগি বেশি মারা যাচ্ছে। ব্রয়লার পালনে আদর্শ তাপমাত্রা হচ্ছে ২৫-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেখানে রাজশাহীতে তাপমাত্রা ৩৭-৪০ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। এতে করে ফ্যানের বাতাস বেশি দিতে হয়। সেখানে ঠিকমতো বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না।’ এনামুল হক আরও বলেন, ‘তীব্র এই গরমে খামারের মুরগির ওজন কমে যাচ্ছে। মাংসের স্থিতি ৯৫ থেকে ৬০ শতাংশে চলে এসেছে। ৪০ দিনে একটি ব্রয়লার মুরগি দুই কেজি ওজন ছাড়িয়ে যায়। এখন তা ১ কেজিও হচ্ছে না। আবার উৎপাদন ঠিকমতো না হওয়ায় বাজারে মুরগি সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না।’ নগরীর সাহেববাজারের কাঁচা বাজার এলাকার মুরগি বিক্রেতা ডলার বলেন, ‘আমাদের কাছে যারা মুরগি সরবরাহ করেন, তারা আগেরমতো সরবরাহ দিতে পারছেন না। এতে করে মুরগির বাজার চড়া থাকছে। সেইসঙ্গে ক্রেতাও কমে গেছে। এই অবস্থায় আমরা বেকায়দায় পড়ে আছি।’ পোলট্রি খামারিদের তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতর বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এগুলো হলো, শেডে সঠিক বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা, ধারণক্ষমতার মধ্যে কম মুরগি রাখা, পানিতে ভিটামিন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার না করা, লেবু ও আখের গুড় দিয়ে দুপুরে শরবতের ব্যবস্থা করা, মুরগির শরীরে পানি স্প্রে করা, শেডের ছাদে ভেজা পাটের ব্যাগ রাখা এবং নিয়মিত পানি ঢালা, দুপুরে মুরগিকে খাবার না খাওয়ানো।

নোয়াখালী: নোয়াখালী সদর উপজেলার আন্ডারচর ইউনিয়নের শান্তিরহাট বাজারের খামারি নজরুল ইসলাম  বলেন, ‘দিনে-রাতে ১৪-১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় খামারের মুরগিগুলো হিটস্ট্রোক করে মারা যাচ্ছে। এজন্য খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিতে হয়। না হয় হিটস্ট্রোক করে। আবার ঠিকমতো খাবার না দেওয়ায় ওজনও তেমন বাড়ে না। গরমে অনেকগুলো মুরগি মারা গেছে। এতে মাংস ও ডিম উৎপাদন কমেছে। আমরা লোকসানে পড়ছি।’  একই ইউনিয়নের আবুল হাসেম বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে খামারগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি সরবরাহ করা যায় না। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক পাখাগুলো বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত গরম সহ্য করতে না পেরে প্রতিদিন দুই-চারটা করে মুরগি মারা যায়। এ সময়ে বাজারে মুরগির দাম অন্য সময়ের তুলনায় কম থাকায় ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি আমরা। এতে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে আমাদের।’ 
পাবনা: তীব্র গরম আর অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া উপজেলার খামারিরা। চাটমোহরের খামারি রাজিবুল ইসলাম জানান, তার খামারে থাকা ২ হাজার ৬০০ মুরগি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। প্রচণ্ড গরমে এরই মধ্যে দুটি মারা গেছে। বিদ্যুৎ আসা মাত্রই তিনি মোটর ছেড়ে শেডের ওপর পানি ছিটাচ্ছেন। বড় বড় চারটি স্ট্যান্ড ফ্যান চালিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। বিদ্যুৎ সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি। ভাঙ্গুড়া উপজেলার খামারি রাশেদুজ্জামান ২ হাজার মুরগি নিয়ে একই রকম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। তার খামারের ওপর গাছের ছায়া থাকায় কিছুটা রক্ষা পেলেও দুপুরের কড়া রোদে বিদ্যুৎ না থাকলে মুরগিগুলো গরমে পাখা ছড়িয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। রাশেদুজ্জামানের নিজের কোনও জমি নেই। এই খামারের আয় দিয়েই সংসার চলে। তিনি বাকিতে মুরগির খাদ্য কেনেন এবং ডিম বিক্রির টাকা দিয়ে সেই ঋণ শোধ করেন। বর্তমানে তীব্র তাপদাহ আর লোডশেডিংয়ের কারণে তার জীবিকা ও বিনিয়োগ এখন চরম ঝুঁকির মুখে।

নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মা-বাবার দোয়া পোলট্রি হাউজের খামারি জুয়েল মাহমুদ  বলেন, ‘তীব্র গরমের মধ্যে লোডশেডিংয়ে মুরগির হিটস্ট্রোক বেড়ে যাচ্ছে। কয়েকদিন আগে খামারের ১ হাজার ২০০ মুরগির মধ্যে ২০৫টি মারা গেছে। এতে ৪০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। বাচ্চা বেড়ে ওঠার সময়ে বিদ্যুতের লাইটের তাপ দিতে হয়। নতুবা রোগ প্রতিরোগ ক্ষমতা ও ওজন কমাসহ নানা দেখা দেয়।’  তিনি আরও বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে জেনারেটর চালাতে পারছি না। তেলও পাচ্ছি না। ব্রয়লারকে প্রোটিন জাতীয় খাবার দেওয়া হয়। যে কারণে পর্যাপ্ত বাতাস লাগে। কিন্তু এখন জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের কারণে ফ্যান চালানো নিয়েও বিপাকে পড়েছি।’  একই সমস্যার কথা জানালেন বন্দরের নবীগঞ্জ পোলট্রি ফার্মের খামারি মো. শহীদ মিয়া। তিনি বলেন, ‘এক মাস আগে এত তাপতাত্রা ছিল না। গত ১৫ দিনে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে লোডশেডিংও বেড়েছে। এতে হিটস্ট্রোকে অনেক মুরগি মারা যাচ্ছে। গত এক মাসে ৭০টি মুরগি মারা গেছে। তার ওপরে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও সংকট। অতিরিক্ত দাম দিয়েও জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে লোডশেডিংয়ের সময়ে জেনারেটর চালাতে পারছি না। এতে বড় লোকসানের মুখে পড়েছি আমরা।’ রূপগঞ্জ উপজেলায় লোডশেডিং ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পোলট্রিখাত মারাত্মক সংকটে পড়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় খামারগুলোতে মুরগির মৃত্যুহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একইসঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন খামারিরা। স্থানীয় খামারি হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে খামার পরিচালনা করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে খামারের ভেতরে গরম অসহনীয় হয়ে ওঠে। এতে মুরগি অসুস্থ হয়ে মারা যায়। বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। কিন্তু জ্বালানির দাম এত বেশি যে তা বহন করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে আমরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছি।’ আরেক খামারি ফরহাদ মিয়া একই ধরনের সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘লোডশেডিং এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন এত দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে খামারের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয় না। গরমের কারণে মুরগি দুর্বল হয়ে পড়ে, খাওয়া কমে যায়, ফলে ওজনও ঠিকমতো বাড়ে না। এতে করে বাজারে বিক্রির সময় আমরা লোকসানে পড়ছি।’

যশোর : জেলা ও উপজেলা শহরের তুলনায় গ্রামীণ জনপদে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হওয়ায় পোলট্রি খামারিরা বিপাকে পড়েছেন। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। যশোরের আটটি উপজেলার গ্রামঞ্চালে সারাদিনে পাঁচ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানিয়েছেন তারা। সদরের রামনগর এলাকার খামারি আজিবর রহমান বলেন, ‘গরমে আমার খামারের মুরগি মারা যাচ্ছে। বিকল্প হিসেবে টিনের চালে পানি ছিটাচ্ছি। অনেকে জেনারেটর বা আইপিএসের মাধ্যমে শেডে ফ্যানের ব্যবস্থা করেছে। এই এলাকার অনেক খামারির মুরগি মরে যাচ্ছে।’ মাহাদিয়া এলাকার খামারি সোহেল হোসেন বলেন, ‘দিনে-রাতে গড়ে মাত্র পাঁচ-ছয় ঘণ্টা থাকছে বিদ্যুৎ। বাকিটা সময়ে লোডশেডিং। প্রতিদিনই হিটস্ট্রোকে মারা যাচ্ছে ব্রয়লার, লেয়ার ও পোলট্রি মুরগি। কমে যাচ্ছে ডিম ও মাংস উৎপাদনের পরিমাণ। এতে লোকসানে পড়ছি আমরা।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলায় দুই বছরের ব্যবধানে ১ হাজার ৫৭৯টি মুরগি খামার বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সেখানে টিকে রয়েছে ১ হাজার ১৪৪টি। দফায় দফায় খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র গরমের সঙ্গে লোডশেডিং। এতে মুরগি লালন পালন নিয়ে উদ্বিগ্ন খামারিরা। যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মোট গ্রাহক ৫ লাখ ৯৬ হাজার। প্রতিদিনই প্রায় চাহিদা ১৩৮ মেগাওয়াট। সেখানে সরবরাহ হচ্ছে ৯০ মেগাওয়াট বা তার চেয়ে কম। ওজোপাডিকোতে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ৫৬ মেগাওয়াট। সেখানে সরবারহ ৪৫ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় ২৫-৩৫ শতাংশ পাচ্ছেন সরবারহ। এতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন মানুষজন। জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মো. সিদ্দীকুর রহমান  বলেন,  ‘এ সেক্টরকে বাঁচাতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ জরুরি। সেজন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান করা না গেলেও এখন তেলের সমস্যা কিছুটা কেটেছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে।’

কুড়িগ্রাম:  কুড়িগ্রাম সদরের পলাশবাড়ি গ্রামের পোলট্রি খামারি আব্দুর রউফ রবি জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে খামারে সমস্যা হচ্ছে। মুরগির খাবার খেতে চায় না। ব্রয়লার মুরগি রাতে বেশি খাবার খায়। অন্ধকারে এরা খেতে পারে না। খাবার না খেলে ওজনও বাধাগ্রস্ত হয়। অনেকে জেনারেটর চালিয়ে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করলেও তেল সংকটে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সামনে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন তিনি। রবি বলেন, ‘রাতে বিদ্যুতের আলো ছাড়া মুরগি খেতে চায় না। আবার গরমে পাখা ছেড়ে রাখতে হয়। আমার খামারে এখনও হিটস্ট্রোক শুরু হয়নি। তবে এভাবে চলতে থাকলে সামনে হতে পারে।’

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ