ঢাকা , সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ , ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুন্দরবনে টিকে থাকার লড়াই: ভূমিহীন মুণ্ডাদের প্রতিদিনের যুদ্ধ

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২০-০৪-২০২৬ ০১:৩১:১২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২০-০৪-২০২৬ ০১:৩৪:৫৯ অপরাহ্ন
সুন্দরবনে টিকে থাকার লড়াই: ভূমিহীন মুণ্ডাদের প্রতিদিনের যুদ্ধ ছবি : সংগৃহীত
সুন্দরবনের গহীন অরণ্য ঘেঁষে প্রতিদিন ভোর হয় মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মানুষের। জীবনের সঙ্গে লড়াই তাদের কাছে নতুন কিছু নয়—বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকার এক নিরব সংগ্রাম। ভূমিহীনতা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা আর প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা—সব মিলিয়ে তাদের প্রতিটি দিন যেন একেকটি যুদ্ধ।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ আদিবাসী গোষ্ঠী মুণ্ডাদের একটি অংশ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে, বিশেষ করে সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরা, খুলনা ও আশপাশের এলাকায় বসবাস করছে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, একসময় সুন্দরবনের জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি গড়ার কাজে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে তাদের এ অঞ্চলে আনা হয়েছিল। তারপর আর ফিরে যাওয়া হয়নি—বনই হয়ে উঠেছে তাদের জীবন, জীবিকা ও নিয়তি।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্চি, ভেটখালী, তারানিপুর, সাপখালী, ধুমঘাট, মুন্সিগঞ্জ, কাশিপুর ও কচুখালীসহ বিভিন্ন গ্রামে মুণ্ডাদের বসতি রয়েছে। এছাড়া দেবহাটা, তালা, খুলনার কয়রা ও ডুমুরিয়া উপজেলাতেও ছড়িয়ে আছে তাদের ছোট ছোট গ্রাম। উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় আড়াই হাজারের মতো মুণ্ডা জনগোষ্ঠীর বসবাস বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

এই জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯৫ শতাংশই ভূমিহীন। একসময় সামান্য যে জমি ছিল, বিভিন্ন কারণে তা হারিয়েছে তারা। ফলে নিজের কোনো জমি বা স্থায়ী আয়ের উৎস না থাকায় অধিকাংশ মুণ্ডাকে দিনমজুরির ওপর নির্ভর করতে হয়। বনের কাঠ কাটা, গোলপাতা সংগ্রহ, মাছ ও কাঁকড়া ধরা, অন্যের জমিতে শ্রম দেওয়া—এসব কাজ করেই চলে তাদের সংসার। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বন বিভাগের কাজে স্বল্প মজুরিতে শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত থাকেন অনেকেই। পরিশ্রম বেশি হলেও মজুরি কম—এটাই তাদের বাস্তবতা। একজন মুণ্ডা শ্রমিক বলেন, “দিনে কাজ পাইলে খাই, না পাইলে উপোস। নিজের জমি নাই, তাই কিছু করারও উপায় নাই।”

মুণ্ডাদের জীবিকা পুরোপুরি নির্ভর করে সুন্দরবনের ওপর। আগে গাছ কাটা ছিল তাদের প্রধান পেশা। বিশেষ করে গরান কাঠ ও গোলপাতা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা। বর্তমানে পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে অনেকেই পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। এখন কেউ মাছ ধরেন, কেউ কাঁকড়া ধরেন, কেউ আবার নৌকা তৈরি বা কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। তবে কোনো কাজই স্থায়ী নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, বন বিভাগের নিয়ম—সব মিলিয়ে জীবিকা হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত।

মুণ্ডা নারীরা শুধু ঘরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নন। সংসারের দায় কাঁধে নিয়ে তারাও নেমে পড়েন কঠিন শ্রমে। জাল বোনা, নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরা, মধু সংগ্রহ, এমনকি কৃষিকাজ—সব ক্ষেত্রেই তাদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। একজন নারী শ্রমিকের ভাষায়, “ঘরে বসে থাকলে তো চলবে না। কাজ না করলে খাওন নাই।”

অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রভাব পড়েছে শিক্ষায়ও। অনেক শিশু প্রাথমিক স্তর শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব, দারিদ্র্য ও সচেতনতার ঘাটতি এর প্রধান কারণ। মুণ্ডাদের নিজস্ব ভাষা ‘শাদ্রী’ এবং সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘বন্দনা নৃত্য’—আজ বিলুপ্তির পথে। বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব ও আধুনিক শিক্ষার অভাবে নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে নিজেদের ভাষা ও ঐতিহ্য ভুলে যাচ্ছে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কালিঞ্চি গ্রামে মুণ্ডাদের উদ্যোগে একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে—কালিঞ্চি ক্যারামমুরা ম্যানগ্রোভ ভিলেজ। এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য থাকা-খাওয়া ও সুন্দরবন ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি মুণ্ডাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও উপভোগ করা যায়। তবে যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খারাপ রাস্তার কারণে অনেক পর্যটক আসতে আগ্রহ হারান, ফলে সম্ভাবনাময় এই উদ্যোগও পুরোপুরি বিকশিত হতে পারছে না।

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে মুণ্ডা সম্প্রদায়ের কঠিন বাস্তবতা। প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধে তারা লড়ছে নীরবে—কখনো বনের সঙ্গে, কখনো দারিদ্র্যের সঙ্গে, কখনো বা সমাজের অবহেলার সঙ্গে। এই জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার লড়াই শুধু তাদের একার নয়—এটি একটি দেশের মানবিক দায়িত্বের প্রশ্নও। যথাযথ উদ্যোগ, শিক্ষা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে মুণ্ডাদের জীবনে পরিবর্তন আনা সম্ভব—প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা ও বাস্তবায়ন।

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ