গুলশান অফিস বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন
কারা অন্ধকারে রেখেছিলেন খালেদা জিয়াকে?
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১৫-০৪-২০২৬ ০৭:৫৫:০৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৫-০৪-২০২৬ ০৮:৩২:৪১ অপরাহ্ন
২০১৫ সালে ৩১ জানুয়ারি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের পর গুলশান কার্যালয় ও বেগম খালেদা জিয়ার ফাইল ছবি। সংগৃহীত। গ্রাফিক্স: বাংলা স্কুপ
বিগত আওয়ামী শাসনামলে এক নজিরবিহীন হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সরকারের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশে ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই (ডেসকো)-এর বিদ্যুৎকর্মীরা ২০১৫ সালের ৩০ জানুয়ারি গভীর রাতে কোনো আগাম সতর্কীকরণ নোটিশ ছাড়াই তাঁর গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দিয়েছিল। তখন প্রায় ১৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় ছিল গুলশান কার্যালয়। এ ঘটনার দায় তখন ডেসকো নিতে না চাইলেও তৎকালীন সরকারের সময় সুবিধা নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অনেক প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ প্রকৌশলীরা।
২০১৫ সালের ৩০ জানুয়ারি দিবাগত রাত ২টা ৩৭ মিনিটে ডেসকোর লাইনম্যানরা বিদ্যুতের খুঁটি থেকে তার খুলে দিলে কার্যালয়টি অন্ধকারে ডুবে যায়। শুধু তাই নয়, পরদিন কার্যালয়ের ক্যাবল টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, বন্ধ করে দেওয়া হয় ওই এলাকার মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কও। এ ঘটনা তৎকালীন প্রেক্ষাপটে অনুমিতই ছিল। কারণ ওইদিন বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক সমাবেশে শ্রমিক-কর্মচারী-পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক ও নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন প্রত্যাহার করা না হলে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
সরকারি দমন-পীড়নের প্রেক্ষিতে গুলশান-২ এর ৮৬ নম্বর সড়কের ওই বাড়িতে এক মাস ধরে অবস্থান করছিলেন খালেদা জিয়া। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছোট ছেলে সদ্য প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান ও তাঁর দুই মেয়ে। কয়েকজন বিএনপি নেতার পাশাপাশি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের কর্মকর্তারাও সেখানে ছিলেন। প্রায় ১৯ ঘন্টা খালেদা জিয়া তাদের নিয়ে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় ছিলেন। পরবর্তীতে ৩১ জানুয়ারি রাত ১০টা ১২ মিনিটে চার-পাঁচজনের একটি দল এসে বিদ্যুৎ-সংযোগ চালু করে দেয়।
এ ঘটনা ‘স্তম্ভিত’ করে দিয়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে। বিনা নোটিশে নাগরিক সেবা বন্ধ করে দেওয়া মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন বলে খালেদা জিয়ার বরাতে তাঁর তৎকালীন প্রেসসচিব মারুফ কামাল খান গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও এর সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি ওঠে বিপুল জনরায় নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরকার গঠনের পর থেকেই।
তৎকালে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই রাতে বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সময় এর কারণ জানতে চেয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শাইরুল কবির। সে সময় ডেসকোর লাইনম্যান বলেছিলেন, তিনি কিছু জানেন না, থানার নির্দেশে লাইন কাটতে এসেছেন। যদিও তখন গুলশান থানার পুলিশ বিষয়টি অবহিত নয় বলে গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছিল।
বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়ে সেই সময় ডেসকোর তরফে কোনো বক্তব্য মেলেনি। তবে ডেসকোর বেশ কয়েকজন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, সরকারের উপর মহলের নির্দেশ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা পালন করেছেন মাত্র।
ওই সময় ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন ব্রিগে. জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (বিদ্যুৎ) হিসেবে নিয়োগ দেয়।
নির্বাহী পরিচালকের (অপারেশন) দায়িত্বে ছিলেন প্রকৌশলী নূর মহম্মদ, বর্তমানে তিনি অবসরপ্রাপ্ত। প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ডেসকো শাখার তৎকালীন উপদেষ্টা এ কে এম মহিউদ্দিন, তিনিও বর্তমানে অবসরে রয়েছেন।
আর গুলশান এলাকার নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। সূত্র জানায়, তাঁকে ২০১৮ সালে পদোন্নতি দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (এসি) করা হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে পদোন্নতি দিয়ে ডেসকোর প্রধান প্রকৌশলীর (সেন্ট্রাল জোন) দায়িত্ব দেয়।
সূত্র আরো জানায়, তৎকালীন সময় বিদ্যুৎকর্মীরা লাইন বিচ্ছিন্ন করার পর গণমাধ্যমের কাছে পুলিশের নির্দেশের কথা বলেছিলেন। কিন্তু এ বক্তব্য বাস্তবতা বিবর্জিত। কারণ, বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া বা বিচ্ছিন্ন করার এখতিয়ার পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণী কোম্পানির। রাষ্ট্রের একজন ভিভিআইপি যেখানে অবস্থান করছেন, সেই স্থাপনার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে আর বিতরণী সংস্থার উর্ধ্বতন কেউই জানবেন না- তা হতে পারে না।
অভিযোগের বিষয়ে ডেসকোর তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) নূর মহম্মদ সোমবার (১৩ এপ্রিল) বাংলাস্কুপকে বলেন, ২০১৫ সালের ঘটনা এখন আমার মনে নেই। ওই ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে যিনি ছিলেন, তিনিই ভালো বলতে পারবেন - কার নির্দেশে বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। কেননা, সংযোগ দেয়া বা বিচ্ছিন্ন করার এখতিয়ার ওই নির্বাহী প্রকৌশলীরই থাকে।
কথা হয় তৎকালীন গুলশান ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী ও বর্তমানে ডেসকোর প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের সঙ্গে। সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেলে তিনি বাংলাস্কুপকে বলেন, ওই সময়ে আমি দায়িত্বে ছিলাম। ওইদিন রাত সাড়ে এগারোটার পর গুলশান থানা থেকে এক সাব ইন্সপেক্টর আমাদের অফিসের কন্ট্রোলরুমে এসে জানান, তাদের বেশকিছু কাজ রয়েছে, একটি কারিগরি দল দরকার। নিয়ম অনুসরণ করেই তাদের সঙ্গে একটি কারিগরি দল পাঠানো হয়। পরবর্তীতে জানতে পারি, বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের লাইন কাটা হয়েছে। বিষয়টি ডেসকোর কমপ্লেইন সেন্টার মারফত অবহিত হয়ে আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম। পরবর্তীতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সিদ্ধান্ত প্রেরণের প্রেক্ষিতে পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা হয়।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, বিষয়টি রাজনৈতিক কি না- আমি জানি না। ওই ঘটনার পর আমি দুই দফা পদোন্নতি পেয়েছি। কর্তৃপক্ষ যোগ্যতা বিবেচনা করেই পদোন্নতি দিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
ডেসকোর বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম আহমেদ মুঠোফোনে বাংলাস্কুপকে বলেন, আমি তখন দায়িত্বে ছিলাম না। গণমাধ্যম থেকে ঘটনাটি জেনেছিলাম। বিষয়টি অবশ্যই নিন্দনীয়। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।
বাংলা স্কুপ/বিশেষ প্রতিবেদক/এইচএইচ/এনআইএন/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স