লাল-সাদা সাজে, মিষ্টি-নোনতায় বাঙালির বৈশাখ
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১৪-০৪-২০২৬ ১১:৩৩:৩৪ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
১৪-০৪-২০২৬ ১১:৩৩:৩৪ পূর্বাহ্ন
ফাইল ছবি
বছর ঘুরে আবারও এলো পহেলা বৈশাখ। চারিদিকে বৈশাখের আমেজে, একদমই বাঙালি ঘরানায়। বৈশাখীর খাবারেরও বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। বাঙালির প্রিয় ভাত, ভর্তা আর ইলিশ মাছ তো থাকেই। গ্রামবাংলার মেলায় আয়োজনে মিঠা কদমা, বাতাসা, মুরলি, খাগড়াই, নিমকি খই, মুড়ি, নাড়ুসহ থাকে আরো কত কী! গ্রাম ছাড়িয়ে এসব মিষ্টি পদের দেখা এখন শহুরে জীবনেও মেলে। বিশেষ করে বৈশাখী মেলায় পাওয়া যায় এসব খাবার।
পহেলা বৈশাখকে আরেও উৎসবমূখর করতে মানুষ নতুন পোশাক কেনেন। বিশেষ করে লাল সাদা রঙের পোশাক মানুষ বেশি কেনেন। ক্রেতারা মনে করেন, পহেলা বৈশাখে লাল সাদা জামার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
রাজধানীর পুরান ঢাকার বাসিন্দা পূজা বলেন, “বৈশাখ উপলক্ষে লাল-সাদা নতুন জামা কিনেছি। আমাদের সংস্কৃতিতে এই রঙের আলাদা একটি গুরুত্ব আছে, আর বৈশাখে এই রঙের পোশাক পরলেই উৎসবের আমেজটা যেন আরও বেশি করে অনুভব করা যায়। তাই প্রতি বছরের মতো এবারও নিজের জন্য এবং পরিবারের সঙ্গে মিল রেখে পোশাক কিনেছি। নতুন বছরের প্রথম দিনটা নতুন পোশাকে উদযাপন করার আনন্দটাই আলাদা।”
বৈশাখের আগমনে দেশজুড়ে শুকনো এসব মিঠাইয়ের চাহিদা বেড়ে যায়। গ্রামবাংলার লোকজ এসব খাবার প্রস্তুতিতেও ব্যস্ত সময় পার করেন কারিগররা। বৈশাখ উপলক্ষে ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন ৫০০-৬০০ কেজি মিষ্টান্ন তৈরি করেন কারিগররা। সকাল, দুপুর আর রাতের খাবারের মাঝেই অথবা মেলায় ঘুরতে ঘুরতে এসব খাবার খেতে বেশ পছন্দ করেন বাঙালিরা।
বাতাসা ও খাগড়াই দুটিই খেতে মিষ্টি। তবে আকৃতির দিক থেকে এদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বাঙালির প্রিয় বাতাসা তৈরি হয় চিনি দিয়ে। খুব ঘন করে চিনি জ্বাল দিয়ে এরপর শুকিয়ে নেওয়া হয়। সাদা রঙের চ্যাপ্টা আকৃতির হয় এটি। আর খাগড়াইয়ের আকৃতি কিছুটা কদম ফুলের মতো। আকারে অনেক ছোট হয়। এটিও চিনি দিয়ে তৈরি। তবে এর ভেতরে থাকে মুড়ি বা খই।
কদমাও বাংলার একটি শুকনো মিষ্টি। কদমাও তৈরি হয় চিনি দিয়ে। চিনি জ্বাল দিয়ে লই তৈরি করা হয়। এরপর সেই লই থেকে বানিয়ে নেওয়া হয় কদমা। বাংলায় অনেক পুরোনো মিষ্টির মধ্যে কদমা অন্যতম। বাংলায় অতিথি আপ্যায়নে কদমা দেওয়া পুরোনো রীতি। তবে বর্তমান সময়ে শুধু বৈশাখ উৎসবেই কদমা খাওয়া হয়। পরিবারের আয়োজনে বা অতিথির আপ্যায়নে বৈশাখীর আয়োজন মানেই কদমা থাকবেই। সিলেট অঞ্চলে এই সাদা কদমাকে তিলুয়া বলা হয়।
কদমা দেখতে অনেকটা কদমফুল আকারের হয়। বাইরে দেখতে শক্ত মনে হলেও ভেতরটা থাকে ফাঁপা। ওপর ও নিচের আকৃতি অনেকটাই কমলালেবুর মতো চাপা। মূলত চিনি দিয়ে তৈরি হয় এটি। বাড়িতে কদমা তৈরি করতে প্রথমে পানিতে চিনি দিয়ে ফোটাতে হবে। এরপর ঠাণ্ডা করে চিনি জমাট বাঁধলে ছড়ানো পাত্রে অল্আপ আইসিং সুগার ছিটিয়ে শিরা ঢেলে অল্প গরম থাকা অবস্থায় রোল করে খুঁটিতে ঝুলিয়ে টানতে হবে। এরপর আবারও ভাঁজ করে পুনরায় টানতে হবে। কয়েকবার করলেই ভেতরটা ফাঁপানো হয়ে যায় তখন চপিংবোর্ডে আইসিং সুগার ছিটিয়ে রোল করে কদমা বানানোর ছাঁচে চাপ দিয়ে কেটে নিতে হয়। এরপর বাতাসে রেখে শুকিয়ে নিলেই হয়ে যাবে কদমা।
বৈশাখী মেলার অন্যতম অনুষঙ্গ চিনির তৈরি হাতি-ঘোড়া, মটক, পাখি ও নৌকা। মানিকগঞ্জের শত বছরের ঐতিহ্য এই খাবার। বৈশাখ উপলক্ষে দেশজুড়ে আয়োজিত মেলায় চিনির তৈরি হাতি-ঘোড়ার দেখা মিলবে। মেলায় অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে চিনির তৈরির হাতি-ঘোড়াসহ বিভিন্ন প্রাণীর রূপের তৈরি সাজ। বৈশাখী আগমনী বার্তায় কারিগররা প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চিনির তৈরি এসব খাবার প্রস্তুতে ব্যস্ত সময় পার করেন। খাবারটি তৈরি হয় শুধু চিনি দিয়েই। প্রথমে বিশেষভাবে তৈরি করা পাতিলে চিনি জ্বাল দেওয়া হয়। চিনির সিরা তৈরি হলে গরম অবস্থায় সেটি কাঠের ফ্রেমে ঢালা হয়। এরপর ১০ মিনিটের অপেক্ষা। ১০ মিনিট পরই বের করে আনা হয় চিনির সাজ।
বৈশাখীর মেলাজুড়ে মিষ্টি পদে পাশে থাকে নোনতা নিমকিও। যারা মিষ্টি কম পছন্দ করেন নিমকি তাদেরই বেশি পছন্দের খাবার। নিমকি মিষ্টি ও নোনতা দুই স্বাদেই পাওয়া যায়। তবে নোনতা নিমকির চাহিদা একটু বেশিই থাকে। নিমকি বানাতে প্রথমে একটি পাত্রে ময়দা, কালিজিরা, জোয়ান, লবণ ও পরিমাণমতো ঘি দিয়ে ভালোভাবে মেখে নিতে হবে। সামান্য পানি দিয়ে মাখিয়ে রাখতে হবে ৩০ মিনিটের জন্য। এরপর ময়দার মণ্ড থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে বেলে নিতে হবে। ছুরি দিয়ে ছোট ছোট নিমকি আকারে কেটে কড়াইয়ে গরম তেলে ভেজে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে নিমকি।
বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে আরও একটি খাবার এইসময় করা হয়। মুড়ি, বুট, বাদাম, মিষ্টি জিরা, মিষ্টি কুমড়োর বিচি, শিম বিচি, মুগ বা খেসারি ডাল ও ভুট্টা ইত্যাদি এইসব সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এই খাবারটি বানানো হয়, যাকে বলে আটকড়ই। আর সাথে থাকে বিভিন্ন রকমের নাড়ু। এর মধ্যে আছে- খইয়ের নাড়ু, নারকেলের নাড়ু, জিরার নাড়ু, বরই নাড়ু, মুড়ি ও চিড়ার মোয়া, গুড় মেশানো খই, মুড়ি, চিড়া, তিলের নাড়ু, ঘস্যার টপি, বাদামের টফি ইত্যাদি।
বৈশাখী মেলায় আরও পাওয়া যায় তিলের নাড়ু, চিনার নাড়ু, ঢ্যাপের নাড়ু, নারকেলের নাড়ু, চিড়ার নাড়ু, মুড়ি-মুড়কিসহ মজার দারুণ সব ছেলেভোলানো খাবার। ছাঁচে তৈরি মিষ্টান্নের মধ্যে গজা, হাতি, ঘোড়া, হরিণ, পাখি, আম, কাঁঠাল, প্রার্থণালয় বা বসতবাড়ির আকৃতি, সন্দেশ চমচম।
নাড়ু ও মোয়া বিক্রির অনলাইন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'লাকিজ বেজারের' লাকী আক্তার বলেন, এটা পারিবারিক, কমার্শিয়াল নয়, এজন্য সব অর্ডার নেওয়া যায় না। যতটুকু সম্ভব হয় সেটা নেওয়া হচ্ছে। এবার আমরা তিনটা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্ডার নিয়েছি। আর এছাড়া খুচরা কিছু তো বিক্রি আছেই।পহেলা বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতি হওয়ার মানুষ টাকা পয়সার হিসাব করে না। তাই তারা দিনটিকে সুন্দরভাবে উৎযাপন করতে অনেক কিছুই কেনাকাটা করছে। যেহেতু এটা একটা উৎসব এবং আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির একটা ঐতিহ্য, সেই ঐতিহ্যকে সবাই ধারণ করতে চায়।
এনস কিচেন’র স্বত্বাধিকারী ফাতেমা আবেদিন নাজলা বলেন, লাবড়া, সুক্ত, পাঁচনসহ বিভিন্ন ধরনের ভর্তা ও সবজি আইটেম পহেলা বৈশাখে বেশি বিক্রি হচ্ছে। বৈশাখ উপলক্ষে বিশেষ গিফট বক্স প্যাকেজ চালু করা হয়েছে, যেখানে দুইজনের জন্য ৪,৫০০ টাকা এবং চারজনের জন্য ৯,০০০ টাকার প্যাকেজ রাখা হয়েছে। এইটা অনেক ব্যায়বহুল হলেও লোকজন এইটা অনেক বেশি ক্রয় করছে। তিনি বলেন, ৫ তারিখ থেকে বিক্রি শুরু হয়েছে এবং প্রতিদিনই দুই থেকে তিনটি করে গিফট বক্স বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য সময়ের তুলনায় বিক্রিও বেড়েছে।
সারানা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকার নওরিন আক্তার বলেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে শাড়ির সঙ্গে টিপ, আলতা ও কুমকুমের চাহিদা বেড়েছে। তিনি বলেন, টিপ এখন শাড়ির অপরিহার্য অনুষঙ্গ, পাশাপাশি আলতা ও কুমকুমের ব্যবহারও নতুন করে জনপ্রিয় হয়েছে।
বর্তমানে এই তিন পণ্যই বিক্রির শীর্ষে রয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর বিক্রি বেশি বলেও তিনি জানান। এছাড়া ক্রেতাদের বাড়তি আগ্রহের কারণে অনেকেই দোকান বেশি সময় খোলা রাখার অনুরোধ করছেন।
অপরদিকে, পান্তা-ইলিশ বৈশাখের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। এই সময় বাজারে ইলিশের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়।
বিক্রেতারা জানান, বৈশাখকে ঘিরে ইলিশের চাহিদা বেড়েছে।গত কয়েকদিন ধরে বিক্রি ভালো হচ্ছে। ছোট-বড় সব সাইজের ইলিশই বিক্রি হচ্ছে। তবে দামের কারণে কিছু ক্রেতা একটু দ্বিধায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত কিনছেন।
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশ ক্রয় করতে আসা হরিদাস চন্দ্র বলেন, বৈশাখ মানেই ইলিশ। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতেই কিনতে এসেছি। দাম একটু বেশি হলেও উৎসবের দিনে পরিবারের জন্য ভালো কিছু আয়োজন করতে চাই।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স