ঢাকা , রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬ , ২৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইসলামের দৃষ্টিতে গুজব ছড়ানো অপরাধ

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ১২-০৪-২০২৬ ০৩:০৩:৫১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১২-০৪-২০২৬ ০৩:০৩:৫১ অপরাহ্ন
ইসলামের দৃষ্টিতে গুজব ছড়ানো অপরাধ
বর্তমান সমাজে অস্থিরতা ও অশান্তির একটি বড় কারণ হলো গুজব। ভিত্তিহীন কথাকে গুজব বলা হয়। ইসলাম একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য এভাবে বর্ণনা করেছে, ‘মুসলমান না প্রতারণা করে, না প্রতারিত হয়।’ সুতরাং একজন ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য হলো, সে ভুল কথা (গুজব) বলে অন্যকে প্রতারিত করে না, কারণ এটি তার ভদ্রতার নিদর্শন, আর সে কারও দ্বারা প্রতারিতও হয় না, এটি তার বুদ্ধিমত্তা ও সচেতনতার প্রমাণ।

রাসুল (সা.) এর যুগে কাফেরদের একজন কবি ছিল আবু উয্‌যাহ। সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কবিতা বলে কাফেরদের যুদ্ধের জন্য উসকানি দিতো। বদরের যুদ্ধে এই কবি বন্দি হয়। কিন্তু সে রাসুল (সা.) এর সামনে অঙ্গীকার করে, যদি এবার তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সে ভবিষ্যতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আর কবিতা বলবে না। তখন রাসুল (সা.) তাকে ছেড়ে দেন, কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পর সে আবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের উসকাতে শুরু করে।

উহুদের যুদ্ধে সে আবার বন্দি হয় এবং পুনরায় ক্ষমা চাইতে থাকে। কিন্তু রাসুল (সা.) তাকে হত্যার নির্দেশ দেন এবং সঙ্গে এ কথাও বলেন, ‘মুমিনকে একই গর্তে দুইবার দংশন করা যায় না।’ এটি একজন মুমিনের বুদ্ধিমত্তা ও সচেতনতার প্রমাণ।

অতএব, কোনও খারাপ খবর যাচাই না হওয়া পর্যন্ত অথবা নিজ চোখে না দেখা পর্যন্ত অন্যকে বলা উচিত নয়। এটা সত্য যে, সুরা বাকারার শুরুতে আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকিদের একটি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেছেন, ‘যারা অদৃশ্য-অদেখা বিষয়ের ওপর ঈমান আনে।’ কিন্তু এর অর্থ এই নয়, মুসলমানকে প্রতিটি অদেখা কথার ওপর বিশ্বাস করতে বলা হয়েছে।

যদি কোনও সংবাদ আল্লাহ ও তার রাসল (সা.) থেকে আসে, তাহলে নিঃশর্তভাবে তাতে ঈমান আনতে হবে। কিন্তু এর বাইরে সাধারণ সংবাদসূত্রগুলোতে মিথ্যার সম্ভাবনা থাকে। এ জন্য রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনও ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে শোনা প্রতিটি কথা বলে বেড়ায়।’

এখন প্রশ্ন হলো, গুজব ছড়ানো ব্যক্তিরা গুজব ছড়িয়ে কী অর্জন করে? মনোবিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে মানুষের মন ও স্বভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তারা বের করেছেন যে, মানুষের স্বভাবে এমন একটি দিক আছে, সে অন্যের দুঃখ বর্ণনা করে এক ধরনের আনন্দ ও তৃপ্তি অনুভব করে। তবে এটি তখনই হয়, যখন তাদের মধ্যে ভালোবাসার পরিবর্তে শত্রুতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা বিদ্যমান থাকে। আর যদি তাদের মধ্যে ভালোবাসা থাকে, তাহলে কখনোই কেউ অন্যের দুঃখ বর্ণনা করে আনন্দ অনুভব করবে না।

ইসলামি শিক্ষায় মুসলমানদের বিশেষভাবে এই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, নিজের ভাইকে বিপদ ও কষ্টে দেখে কখনও আনন্দিত হওয়া যাবে না; নতুবা এর পরিণাম হবে খুবই খারাপ। কারণ, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইকে কোনও বিপদে পতিত দেখে আনন্দ প্রকাশ করো না; নচেৎ আল্লাহ তায়ালা ওই বিপদগ্রস্তের প্রতি দয়া করবেন এবং তোমাকেই সেই বিপদে নিপতিত করবেন।’

মনোবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গুজব ছড়ানোর একটি উদ্দেশ্য এটিও হয়, অন্য মানুষদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলা। কারণ, মানুষের স্বভাবের মধ্যেই এটি আছে, অন্যকে ভয় দেখিয়ে আতঙ্কিত করে এক ধরনের আনন্দ পাওয়া যায়, অথবা অন্যকে ভয়ভীতিতে ফেলে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করা হয়। ইসলাম এই প্রবণতারও অবসান ঘটিয়েছে।

মোটকথা, একজন মুসলমানের বৈশিষ্ট্য হলো, সে শোনা কথা যাচাই-বাছাই ও নির্ভরযোগ্যতা ছাড়া বর্ণনা করে না। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালা ও আখিরাতের দিনের ওপর ঈমান রাখে, তার উচিত ভালো কথা বলা অথবা নীরব থাকা।’

আর যদি কেউ কোনও খারাপ কথা শোনে, তবে তা অন্যদের কাছে বলা উচিত নয়। মন্দকে গোপন রাখাই আল্লাহ তায়ালার অধীক পছন্দ। আর যদি অন্য কেউ গুজব ছড়াতে গিয়ে কোনও কথা বলে, ‘তবে তাকে বাধা দেওয়া উচিত যে, যাচাই ছাড়া কোনও কথা বলো না। যদি সে নিজের কথার ওপর দৃঢ়তা দেখায় এবং তার তথ্যকে নিশ্চিত বলে দাবি করে, তাহলে তার সামনে বিপদগ্রস্ত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষের জন্য কল্যাণের দোয়া করা; নিজেকে গুজবের স্বাদ ও ফাঁদে লিপ্ত হওয়া থেকে সর্বতোভাবে বাঁচিয়ে রাখা।’

আর যদি কেউ গুজব শুনিয়ে ভয় ছড়াতে চায়, তবে ঈমান দৃঢ় রেখে তার সামনে প্রকাশ করে দাও, ‘মানুষের শুধু আল্লাহকেই ভয় করা উচিত; সৃষ্টিজগতকে ভয় করার কোনও বাস্তবতা নেই। আর যারা গুজবের কারণে ভীত হয়ে পড়ে, তাদেরও ধৈর্য ও সংযম অবলম্বন করা উচিত।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ