ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি ও সারের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের কৃষিখাতে। চলতি বোরো মৌসুমে সেচ সংকটের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই কৃষকদের সামনে নতুন করে দেখা দিয়েছে সারের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা। সামনে আমন মৌসুম ঘিরে এই উদ্বেগ আরও বাড়ছে। দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে, যার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। এই বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুদ রয়েছে এবং তা দিয়ে অন্তত এক বছর পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশ মূলত সারের বড় একটি অংশ আমদানি করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব ও কাতার থেকে। পাশাপাশি দেশের সার কারখানাগুলোও উৎপাদনের জন্য আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে এই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে কোনো সংকট নেই এবং বিকল্প উৎস থেকে সার ও জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন ও মিশরের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্রের অভিযোগও উঠছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডিলারদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশে প্রকৃত সংকটের আগেই কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে যায়, এটিই বড় সমস্যা।”
এদিকে, যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আঁচ ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। সরকারও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে গ্যাস সাশ্রয়ের লক্ষ্যে মার্চের শুরু থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটি বন্ধ রাখা হয়েছে। বেসরকারি কাফকো সার কারখানার উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ঘাটতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে কৃষিমন্ত্রীর দাবি, শিগগিরই এসব কারখানা পুনরায় চালু করা হবে।
বর্তমানে দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই মজুদ দিয়ে আপাতত বড় কোনো সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। এতে ইউরিয়া সারের দাম ইতোমধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই এর প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছে। ভারত ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে কৃষি উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে, যার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। এই বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই বিকল্প বাজার থেকে সার আমদানির উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি বন্ধ থাকা দেশীয় সার কারখানাগুলো দ্রুত চালু করা এবং জ্বালানি ব্যবহারে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক /এনআইএন