‘শিমুল ফুল তুমুল লাল, ছড়ায় রঙিন আলো’—বাংলা কবিতা ও সাহিত্যে বহুবার ধরা পড়েছে শিমুলের রক্তিম সৌন্দর্য। বসন্ত এলেই আগুনরাঙা ফুলে সেজে ওঠা এই গাছ প্রকৃতিকে করে তোলে অপূর্ব। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে গ্রামবাংলার পরিচিত দৃশ্য সেই শিমুল গাছ এখন ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। মাগুরার বিভিন্ন বিভিন্ন এলাকায় এক সময় শিমুল গাছ প্রচুর দেখা গেলেও এখন তা অনেকটাই কমে গেছে। স্থানীয়ভাবে এই গাছকে অনেকেই মান্দার গাছ নামেও চেনেন।
শিমুল গাছ অনেক উঁচু হওয়ায় দূর থেকেই এর মনোরম দৃশ্য নজরে পড়ে। গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম বোম্ব্যাক্স সাইবা। এটি বোম্বাকাসি পরিবারের উদ্ভিদ। সাধারণত বীজ ও কাণ্ডের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার ঘটে। একটি শিমুল গাছ প্রায় ৮০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহ্য করেও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে।
শীতের শেষে গাছের পাতা ঝরে যায়। বসন্তের শুরুতেই গাছে ফুটে ওঠে টকটকে লাল ফুল। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন প্রকৃতি নববধূর মতো লাল পুষ্পে নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছে। ফুল থেকে ফল হয়, চৈত্র মাসের শেষ দিকে ফল পুষ্ট হয় এবং বৈশাখ মাসে ফল পেকে যায়। এরপর বাতাসে ফল ফেটে তুলার মতো বীজ উড়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখান থেকেই নতুন গাছ জন্ম নেয়। জেলার শালিখা উপজেলার সদর আড়পাড়া ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি ধলা কাজী ও মাজু বিবীসহ স্থানীয় কয়েকজন জানান, লেপ, তোষক ও বালিশ তৈরিতে শিমুল গাছের তুলার জুড়ি নেই। এছাড়া এই গাছের ছাল, পাতা, ফুল ও শিকড়েরও নানা উপকারিতা রয়েছে।
আড়পাড়া বাজারের তুলা ব্যবসায়ী হাসমত আলী বলেন, শিমুল গাছের তুলা খুবই উন্নত মানের। আগে গাছ বেশি থাকায় তুলা কম দামে পাওয়া যেত। কিন্তু এখন গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তুলার দাম অনেক বেড়ে গেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রতি বছর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় অন্যান্য গাছের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের মোড়গুলোতে অন্তত একটি করে শিমুল গাছ রোপণ করা প্রয়োজন। এতে নতুন প্রজন্ম এই গাছ ও এর উপকারিতা সম্পর্কে জানতে পারবে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এক যুগ আগেও শালিখা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের আনাচে-কানাচে অসংখ্য শিমুল গাছ দেখা যেত। বসন্ত এলেই প্রস্ফুটিত শিমুল ফুল প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তুলত। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়ে না।
শিক্ষক ও গবেষক শ্রী ইন্দ্রনীল বিশ্বাস বলেন, একসময় বসন্ত এলেই প্রকৃতি শিমুলের লাল ফুলে নতুন সাজে সজ্জিত হতো। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই কমে গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উদ্যোগে বিলুপ্তপ্রায় এসব গাছ আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। শালিখা উপজেলা বন কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানান, শিমুল, দেবদারু, সোনালী, বটসহ বিলুপ্তির পথে থাকা গাছগুলো অচিরেই ঢাকা থেকে সংগ্রহ করে শালিখা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রোপণ করা হবে। পাশাপাশি বুনাগাতী ইউনিয়নকে বৃক্ষে আচ্ছাদিত একটি মডেল ইউনিয়নে পরিণত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন