ঢাকা , মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬ , ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পাম্পে তেল সংকট, সেচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৯-০৩-২০২৬ ১২:৪৪:২১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৯-০৩-২০২৬ ১২:৪৪:২১ অপরাহ্ন
পাম্পে তেল সংকট, সেচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক সংবাদচিত্র: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় অনেকে আগেভাগে পাম্পগুলোতে গিয়ে বেশি করে তেল কিনে রেখেছেন। অতিরিক্ত চাহিদার কারণে কিছু পাম্পে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। তবে, ঠাকুরগাঁওয়ের পাম্পগুলোর মালিক-কর্মচারীরা বলছেন, ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের সরবরাহ না পাওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে কৃষি ক্ষেত্রেও।

কৃষিনির্ভর জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহন চালকরা বিপাকে পড়েছেন। একই অবস্থা চাষিদেরও। জমি সেচ দিতে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে তাদের। ঠাকুরগাঁও পেট্রোল পাম্প ওনার্স এসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, ঠাকুরগাঁও জেলায় বর্তমানে ৩৭টি পেট্রোল ও ডিজেল ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২৪টি, বালিয়াডাঙ্গীতে দুটি, হরিপুরে দুটি, রাণীশংকৈলে পাঁচটি এবং পীরগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে চারটি ফিলিং স্টেশন। এসব ফিলিং স্টেশনে প্রতিদিন পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের সম্মিলিত চাহিদা প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ লিটার।রবিবার (৮ মার্চ) জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক পাম্পে তেল না থাকায় বন্ধ করে রাখতে হয়েছে কার্যক্রম। আবার কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে সীমিত পরিমাণে শুধু ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানা গেছে।অন্যদিকে, কিছু স্থানে খোলা বাজারে বেশি দামে পেট্রোল ও অকটেন বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। তবে, এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি বিক্রেতারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ঠাকুরগাঁও জেলার মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৯৩ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের ব্যবস্থা রয়েছে। যার প্রায় ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে বিদ্যুৎচালিত সেচ এবং প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে ডিজেলচালিত সেচ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। চলতি মৌসুমে এ জেলায় বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬২ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমি আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। ডিজেল সংকটের কারণে অনেক কৃষক সময়মতো সেচ দিতে না পারার আশঙ্কা করছেন।স্থানীয় কৃষক ফজলুর রহমান ঠাকুরগাঁও শহরের একটি পাম্পে এসেছিলেন ডিজেল নিতে। ডিজেল না পেয়ে তিনি বলেন, “ডিজেল নিতে এসে পেলাম না। এখন বোরা ধানের চারা কিভাবে লাগাব। তেল না পাওয়ায় জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব না। এতে ফসল নিয়ে ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।”

আরেক কৃষক নূর জামাল বলেন, “চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষকরা দুশ্চিন্তায় আছেন।” তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলায় ডিজেলের কোনো ঘাটতি নেই। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোছাম্মাৎ শামীমা নাজনীন জানান, রবিবার পর্যন্ত জেলায় প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮০ লিটার ডিজেল মজুত রয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বিপাকে পড়েছেন যানবাহন চালকরা। মোটরসাইকেল চালক আবু তালহা বলেন, “পাম্পে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কাজকর্মে দারুণ সমস্যা হচ্ছে।” ট্রাক চালক আব্দুল হাসেম বলেন, “ডিজেল না পেলে গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। এতে আমাদের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।” কিছু ক্রেতার অভিযোগ, জ্বালানির দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দা মাহাবুব হোসেন বলেন, “সরকার বলছে, দেশে জ্বালানির সংকট নেই, কিন্তু পাম্পে গেলে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।”

ফিলিং স্টেশনের মালিক ও ম্যানেজারদের দাবি, ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। স্থানীয় একটি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মনঞ্জুর হাসান বেলাল বলেন, “ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না।”  রুপশী ফিলিং স্টেশনের মালিক রাম বাবু বলেন, “যেখানে আগে পেট্রোল ও অকটেন মিলে ৯ হাজার লিটার তেল দিত, সেখানে এখন অকটেন তো নাই। রবিবার রাতে পেট্রোল ৩ হাজার লিটার দেওয়ার কথা আছে।” তিনি আরো বলেন, “আমরা সরকারি নিয়ম মতাবেক তেল দিচ্ছি, এরপরও অনেকে বোতলে তেল মজুত করছেন, ফলে সংকট আরো বেড়েছে।” ঠাকুরগাঁও পেট্রোল পাম্প ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাক জানান, জেলার ৩৭টি পেট্রোল ও ডিজেল ফিলিং স্টেশনের মধ্যে শুধু শহরের চারটি স্টেশনে রাতে তেল এসেছে। বাকি স্টেশন গুলো শূন্য হয়ে পড়ে আছে।   ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, “কেউ যদি অসাধু উপায়ে জ্বালানির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
 
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ