বিদ্যুতের 'খলনায়ক' ফাওজুল কবির!
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৭-০৩-২০২৬ ০১:২৮:৫৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৭-০৩-২০২৬ ০১:২৮:৫৩ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
বিদ্যুৎ খাতকে পিছিয়ে দিয়ে গেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যুৎ খাতে কোনো অগ্রগতি রেখে যেতে পারেননি, উল্টো তার নেওয়া স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের কারণে এ খাত আরো পিছিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে ফাওজুল কবির খান বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণী কোম্পানিগুলোতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রেও তৈরি করে গেছেন হযবরল অবস্থা।
জানা গেছে, বিতরণী কোম্পানিগুলোতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের মানদণ্ডে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে তিন বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আগে তত্ত্বাবধয়াক প্রকৌশলী হিসেবে তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই আবেদন করা যেত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুড়ে দেওয়া এই শর্তের কারণে মেধাবী প্রকৌশলীরা এ পদে আবেদন করতে পারছেন না। ফাওজুল কবির ও বিদ্যুৎ সচিব ফারহানা মমতাজের নির্দেশে এই নিয়ম আবার শিথিল করা হয়েছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের জন্য।
এদিকে, রাজধানীর অন্যতম বিদ্যুৎ বিতরণী প্রতিষ্ঠান ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ শূন্য রয়েছে বেশ কিছুদিন যাবত। এই পদে দুদিন আগে বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নূর আহমদকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ডিপিডিসির প্রকৌশলীরা বলছেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের মানদণ্ড সংশোধন না করা হলে এই পদে সংস্থাটিতে থেকে কেউই আবেদন করতে পারছেন না। এতে করে দেশ থেকে মেধা হারানোর শংকা দেখা দিচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ফাওজুল কবির উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ খাতে জড়িতদের কারো কোনো কথাই শুনতেন না। তাঁর এই দাম্ভিকতার কারণে বিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে অনাকাঙ্খিত জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, ডিপিডিসির পিডিএসডি প্রকল্পের (বিদ্যুৎ লাইন সম্প্রসারণ প্রকল্প) মত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটিও বন্ধ করা নির্দেশ দিয়ে গেছেন ফাওজুর কবির। আগামী জুন থেকে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। ডিপিডিসির মাঠ পর্যায়ের একাধিক প্রকৌশলী বলছেন, রাজধানীতে গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ, জরাজীর্ণ বিদ্যুৎলাইনের ক্যাবল পরিবর্তন ও বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার স্থাপন করে আসছিল পিডিএসডি প্রকল্প। আকস্মিকভাবে সাবেক ওই উপদেষ্টার প্রকল্প বন্ধের হঠকারী সিদ্ধান্ত বিদ্যুৎসেবায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে বিপুল জনরায় নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রকল্পটি চালু রাখতে গত সপ্তাহে নোট উপস্থাপন করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ফাওজুল কবিরের স্বেচ্ছাচারিতা ও দাম্ভিকতার কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ প্রায় তলানিতে। এছাড়াও নতুন সরকারের কাছে ইমেজ বৃদ্ধির জন্য শেষ সময়ে এসে তিনি এমন কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা বিড়ম্বনায় পড়েছেন। বিদ্যুতের পাওনা না মিটিয়ে উল্টো পাহাড়সম দেনা রেখে গিয়ে নতুন সরকারের ওপর বোঝা চাপিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি।
জানা যায়, ফাওজুল কবির ২০০৯ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর প্রতিষ্ঠা করেন কিস্টোন কনসালটিং কোম্পানি। পল্লী বিদ্যুতের বিভিন্ন কারিগরি পরামর্শক কাজে সম্পৃক্ত হয় এ প্রতিষ্ঠান। তাঁর প্রতিষ্ঠান মেসার্স কিস্টোন বিজনেস সাপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ধারাবাহিকভাবে কাজ পায়। এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এবং সিইও ফাওজুল কবিরের স্ত্রী দিলরুবা কবির। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় আরইবির বড় বড় প্রকল্প হাতিয়ে নেন দিলরুবা কবির।
ফাওজুল কবির অন্তর্বর্তী সরকারে নিয়োগ পাওয়ার পর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করার দাবি করে কিস্টোন কোম্পানি। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের কাছে কিস্টোন গত ’২৪ সালের ২৪ অক্টোবরের একটি চিঠিতে চুক্তির অবসান চেয়ে চিঠি দেয়। কিন্তু তখনো কোম্পানির একজন হিসেবে উপদেষ্টা ফাওজুলের নাম ব্যবহৃত হয়। এ চিঠিটি পাঠানো হয় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ ও ক্ষমতাবর্ধন (ঢাকা-ময়মনসিংহ বিভাগ) প্রকল্প পরিচালককে।
সরাসরি এ প্রতিষ্ঠানের অধীন একটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সঙ্গে চুক্তি হয় কিস্টোনের। কিস্টোন গোপালগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রকৌশল পরামর্শক হিসেবে কাজ করে। যোগাযোগ করা হলে গোপালগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা সম্প্রতি জানায়, আগে তাদের ক্যাম্পাসে কিস্টোনের অফিস ছিল তবে বেশ কিছু দিন আগে তারা অফিস সরিয়ে নেয়। ২৪ অক্টোবর দেওয়া সে চিঠিতে কিস্টোন আরইবিকে বলে, উপদেষ্টার প্রতিষ্ঠান এ চুক্তিতে থাকার কারণে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন আসতে পারে। তবে উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাসের বেশি সময় পর ২৪ অক্টোবর চিঠি দেয়। তারও এক মাস পর ৩০ নভেম্বর চুক্তির অবসান চাওয়া হয়।
শপথের প্রায় সাড়ে তিন মাস পর চুক্তির অবসান চাওয়ার বিষয়ে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। সে সময় কিস্টোন তাদের কয়েকজন প্রকৌশলীকে প্রকল্পে রেখে দেওয়ার আবেদন করে। গত সরকারের আমলে ধারাবাহিকভাবে কাজ পেয়ে যাওয়ার ঘটনায় কিস্টোন ও বিআরইবি কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আর এ সুবিধা পাওয়ার পেছনে উপদেষ্টার সাবেক সরকারি দায়িত্বের ভূমিকাও সামনে আসছে।
এরই মধ্যে দায়িত্ব ছাড়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। গত ৩ মার্চ দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়ে তার অ্যাকাউন্টের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে কি না সে ব্যাপারে বিএফআইইউ তদন্ত করছে।
তবে একটি সূত্র বলেছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন প্রকল্প ও কোম্পানিগুলোতে ফাওজুল কবির সরকারি পদের প্রভাব খাটিয়ে কী পরিমাণ অনিয়ম করেছেন, তা খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে তাঁর সময়ে বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণী কোম্পানিতে বেশ কয়েকটি বড় নিয়োগে যে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে- তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এছাড়াও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির নীতিমালা সংশোধনের নামে আরো বিড়ম্বনা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে সাবেক এই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে।
এদিকে, দায়িত্বের শেষ সময়ে এসে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকদের বিড়ম্বনায় ফেলতে ফাওজুল কবির ক্ষতিপূরণমূলক জরিমানা (লিকুইডেটেড ড্যামেজ) বা এলডির পরিমাণ বাড়িয়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৪ হাজার কোটি টাকার বকেয়া রেখে যান। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, কাগজে-কলমে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বকেয়া কম দেখানোর উদ্দেশ্যে এ জরিমানা আরোপ করা হয়। এর মাধ্যমে পিডিবির দীর্ঘদিনের বিল পরিশোধের ব্যর্থতার দায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকদের ওপর চাপানো হয়।
বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, ফাওজুল কবির তার দায়িত্বের শেষ সময়ে এসে আমাদের ওপর এলডি আরোপ করেন। এর মাধ্যমে তিনি নতুন সরকারের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করেছেন। আমরা শুনতে পেরেছি জামায়াতে ইসলামী এসে সরকার গঠন করবে ফাওজুল কবিরের এমন প্রত্যাশা ছিল। নতুন সরকারের কাছে নিজের ইমেজ বৃদ্ধির জন্য তিনি এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
এদিকে, বিদ্যুৎ বিতরণী কোম্পানিগুলোতে কর্মরত বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী প্রকৌশলী বলেন, ফাওজুল কবিরের বিভিন্ন অনিয়মে রীতিমত সায় দিয়ে গেছেন বিদ্যুৎ বিভাগের বর্তমান সচিব।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউনূস সরকারের সময়ে ফাওজুল কবির খান বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে যত কথা বলেছেন, কাজ করেছেন ঠিক তার উল্টো। সাবেক এই উপদেষ্টা এ খাতে স্থবিরতা তৈরি করে রেখে গেছেন। তার কোনো প্রকল্পই পরিকল্পিত ও গবেষণানির্ভর ছিল না। পুরো বিদ্যুৎ খাতকে তিনি পিছিয়ে দিয়েছেন। এ কারণে নতুন সরকারের ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে। তার উপর ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তুলেছে।
বাংলা স্কুপ/প্রতিবেদক/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স