আফগানিস্তান
দাড়ি ছোট করে ছাটলেই শাস্তি মুখোমুখি হচ্ছেন নাপিতরা
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
২০-০২-২০২৬ ০৫:৪১:৪২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২০-০২-২০২৬ ০৫:৪১:৪২ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
আফগানিস্তানে মুখে এক মুষ্টির বেশি দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করায় বিপাকে পড়েছেন দেশটির নাপিতরা। তালেবান সরকারের নতুন নির্দেশনায় দাড়ি ‘বেশি ছোট করে’ ছাঁটলে শাস্তির মুখে পড়তে হচ্ছে নাপিতদের।
বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা (এএফপি)।
গত মাসে আফগানিস্তানের নীতিনৈতিকতা বিষয়ক মন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয়, এখন থেকে পুরুষদের এক মুষ্টির চেয়ে লম্বা দাড়ি রাখা ‘বাধ্যতামূলক’। আগের নির্দেশনার তুলনায় এটি দ্বিগুণ কঠোর বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খালিদ হানাফি বলেন, সরকারের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের শরিয়াহ আইনের (ইসলামিক আইন) আলোকে জীবনযাপন নিশ্চিত করা। তার ভাষায়, ‘ইসলামিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাধ্য।’
নতুন নির্দেশনা কার্যকর করতে এরই মধ্যে শহরগুলোতে টহল জোরদার করেছে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় গজনী প্রদেশের এক ৩০ বছর বয়সী নাপিত এএফপিকে জানান, তার এক কর্মী একজন গ্রাহকের চুল ‘পশ্চিমা স্টাইলে’ কাটায় তাকে তিন রাত আটক রাখা হয়।
তিনি বলেন, প্রথমে তাকে একটি ঠান্ডা কক্ষে রাখা হয়। পরে মুক্তির দাবি জানালে তাকে একটি ঠান্ডা শিপিং কন্টেইনারে স্থানান্তর করা হয়। পরে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে এখনো টহলদার দল এলে তিনি গ্রাহকদের নিয়ে লুকিয়ে থাকেন।
ওই নাপিতের দাবি, ‘কেউ তাদের সঙ্গে তর্ক বা প্রশ্ন করতে পারে না। সবাই ভয় পায়।’
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহক ও নাপিত—দুজনকেই আটক করা হলেও শেষ পর্যন্ত নাপিতদেরই বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর কুনার প্রদেশে মন্ত্রণালয়ের নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে তিন নাপিতকে তিন থেকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে নীতিনৈতিকতা মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত নভেম্বরে ইমামদের জন্য জারি করা আট পৃষ্ঠার নির্দেশিকায় দাড়ি কামানোকে ‘বড় পাপ’ হিসেবে উল্লেখ করতে বলা হয়। খুতবায় বিষয়টি তুলে ধরারও নির্দেশ দেওয়া হয়।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের যুক্তি, দাড়ি কামিয়ে পুরুষরা ‘নারীদের মতো দেখাতে’ চাইছেন, নিজেদের পরিচিতি নারীদের মতো করে তুলতে চাইছেন।
এ নির্দেশনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও পৌঁছেছে। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
কাবুলের এক ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী জানান, ইসলামসম্মত পোশাক না পরলে নম্বর কেটে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ইসলামিক বেশভূষার অংশ হিসেবে দাড়ি রাখা ও মাথা ঢাকার বিষয়টি জোর দিয়ে বলা হয়েছে।
রাজধানী কাবুলের এক ২৫ বছর বয়সী নাপিত বলেন, তরুণরা ছোট দাড়ি রাখতে চাইলেও এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তাঁর ব্যবসায় ধস নেমেছে। আগে সরকারি কর্মচারীরা সপ্তাহে দুইবার পর্যন্ত চুল-দাড়ি ছাঁটতে আসতেন। এখন তাঁরা লম্বা দাড়ি রাখছেন, মাসে একবারও আসেন না। ফলে ব্যবসায়ে আগের মতো আয় নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ৫০ বছর বয়সী নাপিত জানান, নীতিনৈতিকতা পুলিশ প্রায় প্রতিদিন তার দোকান পরিদর্শন করে। সম্প্রতি এক কর্মকর্তা এসে প্রশ্ন তোলেন, কেন ‘এভাবে’ চুল কাটা হয়েছে। শিশুর চুল কাটা হয়েছে—এ যুক্তিও তিনি মানতে চাননি। কর্মকর্তার বক্তব্য ছিল, ‘ইসলামিক কায়দায় চুল কাটতে হবে, ইংরেজি স্টাইল নয়।’
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার আগে আফগানিস্তানের প্রধান শহরগুলোতে বাসিন্দারা নিজেদের চেহারা ও পোশাকের বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। তবে নতুন নির্দেশনার ফলে নাপিতদের ব্যক্তিগত ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের পছন্দের স্বাধীনতা—দুই-ই সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স