ঢাকা , শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬ , ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

​বিতর্কিত কোম্পানি থেকে এলএনজি ক্রয়

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৭-০১-২০২৬ ০২:৫৬:৩৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৭-০১-২০২৬ ০২:৫৬:৩৭ অপরাহ্ন
​বিতর্কিত কোম্পানি থেকে এলএনজি ক্রয় ফাইল ছবি
বিতর্কিত বহুজাতিক কোম্পানি সকার ট্রেডিং এসএ থেকে এলএনজি আনার জন্য জিটুজি (সরকার-সরকার) চুক্তি করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও বিগত সরকারের আমলে দরপত্র ছাড়া এমন চুক্তির সমালোচনা করা হয়েছিল, এবারও ঠিক একইভাবে দরপত্র ছাড়াই এ কোম্পানিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এতে করে খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, এবং জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকেও সম্ভাব্য ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রভাব খতিয়ে দেখতে পেট্রোবাংলাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি উন্নয়ন-২ শাখা থেকে উপসচিব আহমেদ জিয়াউর রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ১৯ জানুয়ারি পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক সকার ট্রেডিং এসএ থেকে স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আমদানি-সংক্রান্ত প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষত কোম্পানিটির অতীত কর্মকাণ্ড, আন্তর্জাতিক মহলে উত্থাপিত অভিযোগ এবং বাংলাদেশে বাপেক্সের সঙ্গে চলমান বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘এত কিছুর পরও সরকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারেনি। তাহলে আমাদের অর্জন কোথায়?’ তিনি বলেন, ‘সকার ট্রেডিং একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি—এর সঙ্গে কখনো জিটুজি চুক্তি হতে পারে না। এটি আজারবাইজানের কোম্পানি হলে চুক্তি সুইজারল্যান্ডের মাধ্যমে কেন হচ্ছে—এটাই বড় প্রশ্ন।’ তিনি বিষয়টি পূর্ণভাবে পুনর্মূল্যায়নের পরামর্শ দেন।

তথ্য অনুযায়ী, সকার ট্রেডিং এসএ মূলত আজারবাইজানের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কোম্পানি সকারের একটি বাণিজ্যিক শাখা। যদিও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়, প্রকৃতপক্ষে এটি আজারবাইজানের মালিকানাধীন। ‘সকার’ নামটি এসেছে স্টেট অয়েল কোম্পানি অব দ্য রিপাবলিক অব আজারবাইজান থেকে। সুইজারল্যান্ড কোনো তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ নয়, তাই দেশটির মাধ্যমে এ চুক্তি প্রক্রিয়া নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন। বিশ্বজুড়ে সকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে নজরদারি চলছে। বাংলাদেশেও গ্যাস কূপ খনন-সংক্রান্ত একটি মামলা আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। যুক্তরাজ্যে বাপেক্সের সঙ্গে সকারের এ মামলাটি চলমান।

২০১৭ সালে বাপেক্সের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, সকারের তিনটি গ্যাস কূপ খনন করার কথা ছিল—খাগড়াছড়ির দক্ষিণ সেমুতাং-১, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ-৪ ও জামালপুরের মাদারগঞ্জ-১। এর মধ্যে কেবল সেমুতাং-১ কূপ খনন করে কোম্পানিটি, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস পাওয়া যায়নি। ওই কূপের জন্য ১৪২ কোটি টাকা পরিশোধ করে বাপেক্স। বাকি দুটি কূপ নিয়ে চুক্তির বাইরে অগ্রিম অর্থ দাবি করায় জটিলতা তৈরি হয়। পরে ২০১৯ সালে সকার নিজে থেকেই চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয়। ২০২০ সালে তারা সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে বাপেক্সের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং প্রায় ৮৮৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে। মামলার আংশিক রায় সকারের পক্ষে গেছে, যার বিরুদ্ধে বাপেক্স আপিল করেছে।

এদিকে, মাল্টায় একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে সকার ট্রেডিংয়ের বিরুদ্ধে। পাবলিক আই নামের সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি এনজিওর তদন্তে জানা যায়, ২০১৭ সালে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ‘১৭ ব্ল্যাক’-কে কয়েক মিলিয়ন ডলার ‘সন্দেহজনক’ অর্থ প্রদান করেছিল সকার ট্রেডিং। প্রকল্পটিতে কোম্পানিটির ৩৩ শতাংশ অংশীদারত্ব ছিল। মাল্টা সরকার তদন্ত করে অনিয়মের প্রমাণও পেয়েছে। সকার ট্রেডিং এসএ শতভাগ আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি সকারের মালিকানাধীন। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতায় আসার পর আজারবাইজান বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের ৭ ডিসেম্বর আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের দুই কন্যা লায়লা আলিয়েভা ও আরজু আলিয়েভা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যের একটি আদালতে বাপেক্সের সঙ্গে সকার একিউএস ট্রেডিংয়ের মামলা চলছে। এ চুক্তির আওতায় কোম্পানিটির আরও দুটি কূপ খননের কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এখন সেই মামলা নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। ওমান ও কাতারের পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও গ্যাস কেনা হয়। তবে আগের সরকারের আমলে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা নিয়ে কমিশন ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল, যা এখনো তদন্তের আওতায় আসেনি। এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—এত বিতর্কিত অতীত থাকা সত্ত্বেও কেন সকার ট্রেডিংয়ের সঙ্গে নতুন চুক্তির পথে হাঁটছে সরকার? স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা—সব কিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্তটি এখন খাত সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টিতে বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। সূত্র: কালবেলা

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ