ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬ , ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

​দুই হাজারেও মিলছে না ১২০০ টাকার এলপিজি

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ০৩-০১-২০২৬ ১২:১১:০৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৩-০১-২০২৬ ১২:১১:০৩ অপরাহ্ন
​দুই হাজারেও মিলছে না ১২০০ টাকার এলপিজি ​ফাইল ছবি
২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর সবশেষ সমন্বয় করা হয় এলপি গ্যাসের দাম। সে সময় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আগামীকাল রোববার নতুন করে জানুয়ারি মাসের এলপিজি গ্যাসের দাম নির্ধারণ করার কথা রয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিআরসি)। কিন্তু তার আগেই বাজারে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত সংকট। ১ হাজার ২০০ টাকার এলপিজির সিলিন্ডার মিলছে না ২ হাজার টাকায়ও। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। কিন্তু এতে করে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।

কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই এমন মূল্যবৃদ্ধিতে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। বিশেষ করে শহর ও মফস্বলের মধ্যবিত্ত ও নিন্ম আয়ের পরিবারগুলোর রান্নাঘরের খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক দিন আগেও যে সিলিন্ডার ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, সেটিই এখন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৫০ টাকায়। এলাকাভেদে দামের এই তারতম্য আরও প্রশ্ন তুলছে এলপিজি বাজারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে।

ভোক্তারা অভিযোগ করছেন, সরকারনির্ধারিত দামের কোনো তোয়াক্কা না করেই ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণ করছেন। রাজধানীর আজিমপুর এলাকার বাসিন্দা ফজলুর রহমান বলেন, ‘কাল ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে চরম বিপকে পড়েছি। এতদিন সরকারনির্ধারিত দামের চাইতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি নিয়ে যেতাম। কিন্তু আজ ২ হাজারের এক টাকা কমেও বিক্রেতারা দিতে চাইছেন না। কয়েকটি দোকান ঘুরে বাসায় ফিরে এলাম। হঠাৎ করে সিলিন্ডারের দাম এতটা বেড়ে যাবে, কেউ জানায়নি। গ্যাস নেই বলে এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হয়, কিন্তু এখন সেটাও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।’

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে প্রতি সিলিন্ডার এলপিজি ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও ভোক্তাদের সব সময়ই নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বাড়তি খরচ করতে হয়। তবে, এবারের মূল্যবৃদ্ধি পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। চড়া দামের পাশাপাশি বাজারের বিভিন্ন স্থানে এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকটও দেখা দিয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, শীতকালে স্বাভাবিকভাবে এলপিজির চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সেই তুলনায় বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। চাহিদা ও জোগানের এই অসামঞ্জস্যের সুযোগ নিয়ে খুচরা পর্যায়ে দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

একই অভিযোগ করেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জয়ীতা বিশ্বাস। প্রতি মাসে রান্নার জন্য এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়। তবে এবার সিলিন্ডারের আকাশচুম্বী দাম দেখে তিনি বিস্মিত। ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারনির্ধারিত দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা। পরিবহন খরচ মিলিয়ে বড়জোর ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি হতে পারে। কিন্তু এ মাসে আমাকে ২ হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে। বাজারে চলা এই অরাজকতা কবে শেষ হবে?’

একই চিত্র দেখা গেছে বনশ্রী এলাকায়। সেখানকার বাসিন্দা তানবীর আহমেদ জানান, তিনি একটি সিলিন্ডার কিনেছেন ১ হাজার ৮০০ টাকায়। এর চেয়ে কম দামে কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আগে দেখা যেত, কিছু কিছু কোম্পানি তুলনামূলক কম দামে গ্যাস দিত, কিন্তু এখন সবারই এক দাম। দামের চেয়েও বড় সমস্যা হলো, অনেক দোকানে এখন সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজধানীর প্রায় সব এলাকায় এখন সিলিন্ডার গ্যাসের উচ্চমূল্য ও সংকটের একই চিত্র। মূলত যাদের বাড়িতে পাইপলাইনে গ্যাসের সংযোগ নেই, তারাই এলপিজির প্রধান গ্রাহক। রান্নাবান্নাসহ প্রতিদিনের জরুরি প্রয়োজনে এই গ্যাসের বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে হাজারো পরিবারকে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে বিক্রেতারা দাবি করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ এবং কোম্পানিগুলোর সরবরাহমূল্য বাড়ানোর কারণেই খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। তবে ভোক্তাদের প্রশ্ন, এই মূল্যবৃদ্ধি কেন নিয়ন্ত্রিত নয়, আর কেন একই পণ্যের দাম একেক এলাকায় একেক রকম?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজি খাত এখনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও শক্তিশালী মনিটরিংয়ের বাইরে রয়ে গেছে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশ্লেষক অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্পষ্ট নীতিমালা ও নিয়মিত বাজার তদারকি না থাকলে এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ভবিষ্যতেও চলতেই থাকবে।’

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো দ্রুত হস্তক্ষেপ, বাজার তদারকি জোরদার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

এলপিজি এখন দেশের লাখো পরিবারের একমাত্র রান্নার জ্বালানি। সেই জ্বালানির দাম যদি এভাবে হঠাৎ করে বেড়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। এই মূল্যবৃদ্ধির দায় কে নেবে আর ভোক্তাদের সুরক্ষা দেবে কে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এলপিজি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এলপিজির বড় একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো। বসুন্ধরার পর তাদের সরবারহই বেশি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিটিতে কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। ফলে বাজারে এই সংকট দেখা দিয়েছে।’

তবে বেক্সিমকোর দাবি, তাদের কিছু জটিলতা থাকলেও পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ হয়নি। একটি সিন্ডিকেট বাজারকে অস্থির করতেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।

মগবাজার রেলগেট এলাকার বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী খুচরা বিক্রেতা শিকদার মিয়া বলেন, ‘পরিবেশকদের কাছ থেকে সময়মতো সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আজ অর্ডার দিলে কয়েক দিন পর সরবরাহ পাওয়া যায়। সরকারি দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা হলেও পাইকারি পর্যায়ে কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকারও বেশি দামে। ফলে লোকসান এড়াতে আমাদেরও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’

বাড়তি দাম নিয়ে কথা হয় শান্তিনগর এলাকার ‘সুপার এলপিজি’র স্বত্বাধিকারী রহমত উল্লাহর সঙ্গে। তিনি জানান, তারা মূলত ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্ট থেকে সিলিন্ডার সংগ্রহ করেন এবং ওই পয়েন্টগুলো সরাসরি কোম্পানি থেকে গ্যাস আনে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এখন পাইকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছি না। কোম্পানিগুলো নাকি সাপ্লাই কমিয়ে দিয়েছে। এমনকি বিইআরসি ডিসেম্বর মাসের নতুন দাম ঘোষণা করার পর সরবরাহ আরও কমে গেছে। শীত মৌসুমে গ্যাসের চাহিদা বাড়ে, কিন্তু সেই তুলনায় সরবরাহ না থাকায় বাজারে এমন তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ডিস্ট্রিবিউশন থেকে আমাদের প্রতিটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৫২০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে আরও প্রায় ৮০ টাকা খরচ পড়ে। ফলে সব মিলিয়ে ১ হাজার ৭০০ টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। সামনে দাম ও সংকটের মাত্রা আরও বাড়তে পারে।’

তবে সরকার এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘এর মূল কারণ এলসি জটিলতা। বেশ কিছু কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউশন বর্তমানে প্রায় বন্ধ রয়েছে। আর যাদের সরবরাহ চালু আছে, তারাও চাহিদার তুলনায় অনেক কম গ্যাস দিচ্ছে। সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে কোম্পানিগুলো এলসি জটিলতার কথা বলছে। সময়মতো এলসি খুলতে না পারায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না বলে তারা জানিয়েছে আমাদের। আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব শিগগির।’ সূত্র : রূপালী বাংলাদেশ

বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ