ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬ , ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

তদন্ত প্রতিবেদন পক্ষে নিতে বাজেট ৩০ লক্ষ টাকা!

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ৩০-১১-২০২৫ ০৫:৫৯:৪৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ৩০-১১-২০২৫ ০৬:৩১:৩৯ অপরাহ্ন
তদন্ত প্রতিবেদন পক্ষে নিতে বাজেট ৩০ লক্ষ টাকা! ​সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত অধিকারী ও ফিডার ইনচার্জ সহকারী প্রকৌশলী মো. রাহুল। ফাইল ফটো
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের সঞ্চালন লাইনে কাজ করার সময় তড়িতায়িত হয়ে বিদ্যুৎকর্মী নিহতের ঘটনা বিলম্বে প্রধান কার্যালয়কে অবহিত করার দায়ে শাস্তির মুখে  পড়তে যাচ্ছেন তিন প্রকৌশলী। রোববার (৩০ নভেম্বর) ডিপিডিসির  নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) কিউ এম শফিকুল ইসলাম বাংলাস্কুপকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

এদিকে, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তিনটি তদন্ত কমিটির কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রকৌশলীরা। তাঁরা বলছেন, এর আগে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিয়ে তদন্তকাজ পরিচালনা করা হতো। কিন্তু সিদ্ধিরগঞ্জে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে। দুর্ঘটনার দায় যাদের ওপর পড়ে, তাদের স্বপদে বহাল থাকা অবস্থায় তদন্ত কমিটি কাজ করছে। এই তদন্ত কতটুকু নিরপেক্ষ হবে- তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অভিযোগ উঠেছে, তদন্তকারী দলকে প্রভাবিত করে প্রতিবেদন নিজেদের পক্ষে নিতে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত প্রকৌশলীরা ৩০ লক্ষ টাকা নিয়ে মাঠে নেমেছেন।

বুধবার (২৬ নভেম্বর) সকাল সাড়ে দশটার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের ওই দুর্ঘটনায় এক বিদ্যুৎ কর্মী নিহত ও আরো দুইজন আহত হন। কিন্তু হতাহতের এই মর্মান্তিক ঘটনার চার ঘন্টা পর প্রধান কার্যালয়কে অবহিত করা হয়। ওই দিন ডিপিডিসির  নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) কিউ এম শফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, ডিপিডিসির ৩৬টি ডিভিশনের অপারেশন দেখার দায়-দায়িত্ব আমার। অথচ এত বড় দুর্ঘটনার চার ঘন্টা পর আমাকে সংবাদ দেওয়া হয়েছে। এটি চাকরি বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

রোববার দুপুরে তিনি বাংলা স্কুপকে বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত অধিকারী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শের আলী ও সাউথ বেল্টের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী মুহাম্মদ কামাল হোসেন চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন করায় আমি তাদের বিরুদ্ধে নোট উপস্থাপন করেছি। আশা করি, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সিদ্ধান্ত নিয়েই এইচ আর দপ্তর আজ তাদের বিরুদ্ধে পত্র জারি করবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিহতের পরিবারের সদস্যদের কী সাহায্য-সহযোগিতা করা যায়, তা নিয়ে আমরা কাজ করছি।

সিদ্ধিরগঞ্জে বিদ্যুৎকর্মী হতাহতের ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। বিদ্যুৎ বিভাগ গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির আহবায়ক যুগ্মসচিব মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান রোববার বাংলা স্কুপকে বলেন, আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী, অন্যান্য বিদ্যুৎকর্মী ও ঘটনাস্থলের আশপাশের বাসিন্দাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েছি। দুর্ঘটনার পর ডিভিশনের প্রকৌশলী ও গ্রিডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তৎপরতার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। দুর্ঘটনাটি কারিগরির ত্রুটি না কারো অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে ঘটেছে- তা এখনই বলা সম্ভব নয়। 

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জের দুর্ঘটনায় স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরের (এসওপি) কোন ব্যত্যয় হয়েছে কিনা আমাদের তা যাচাই করে দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও তদন্ত প্রতিবেদনে সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে। আশা করি, চলতি সপ্তাহেই  আমরা তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারব। তদন্ত কমিটির প্রধান আরো বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আমরা দেখেছি। এগুলো আমাদের তদন্তে সহায়ক হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিপিডিসির দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির এক সদস্য বলেন, দুর্ঘটনাটি কারিগরি ত্রুটির কারণে হয়েছে কি না, তা আমরা এখনো বলতে পারছি না। দুটি ফেজে কাজ করার পর তৃতীয় ফেজে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হওয়ার ঘটনা এর আগে আমরা দেখিনি। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আমরা তদন্ত করছি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গ্রিডগুলোতে বাৎসরিক রক্ষণাবেক্ষণের সময় কীভাবে কাজ হয়, আদৌ কাজ হয় কি না বা ওই গ্রিডে ত্রুটিযুক্ত যন্ত্রপাতি দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন হতো কি না- তা আমরা এখনই বলতে পারছি না। তবে এ বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। গত দুইদিনের গণমাধ্যমের বিস্তারিত প্রতিবেদনের কারণে অনেক বিষয়ও আমাদের নজরে এসেছে।

এদিকে, দুর্ঘটনার দায় থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত অধিকারী ও  ফিডার ইনচার্জ সহকারী প্রকৌশলী মো. রাহুলকে বাঁচাতে প্রভাবশালী একটি চক্রের তৎপরতা থেমে নেই। সূত্র বলছে, ওই চক্রটি তিনটি তদন্ত দলকে 'ম্যানেজ' করতে ত্রিশ লাখ টাকা নিয়ে মাঠে নেমেছে। পুরো টাকাটাই জোগান দিয়েছে ডিভিশনের প্রকৌশলীরা। এর বাইরে  নিহত বিদ্যুৎকর্মী নজরুল ইসলামের (৫৫) পরিবার যাতে প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না তার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যস্থতায় নিহতের পরিবারকে সাত লক্ষ টাকা দিয়ে রফাদফা করতে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে সূত্রের দাবি। 

ডিপিডিসির একাধিক প্রকৌশলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে কিন্তু ডিভিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে রহস্যজনক কারণে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এতে করে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত প্রকৌশলী অমিত-রাহুল স্বপদে বহাল থেকেই তদন্তকাজ প্রভাবিত করে যাচ্ছে। তাই তদন্ত কমিটিগুলো কী প্রতিবেদন দেবে, তা মোটামুটি আন্দাজ করা যাচ্ছে।

বাংলা স্কুপ/প্রতিবেদক/একেএস/এইচএইচ/এসকে

অমিত-রাহুলের সঙ্গে ফেঁসে যাচ্ছেন আরো দুই প্রকৌশলী
অমিত-রাহুল সিন্ডিকেটকে বাঁচাতে তৎপর প্রভাবশালীরা!
​সঞ্চালন লাইনে কাজ করতে গিয়ে আবারো প্রাণ গেল বিদ্যুৎকর্মীর


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ