ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬ , ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সিদ্ধিরগঞ্জে কেঁচো খুঁড়তে সাপ!

অমিত-রাহুলের সঙ্গে ফেঁসে যাচ্ছেন আরো দুই প্রকৌশলী

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৯-১১-২০২৫ ০৪:২৫:৫৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৯-১১-২০২৫ ০৪:২৫:৫৭ অপরাহ্ন
অমিত-রাহুলের সঙ্গে ফেঁসে যাচ্ছেন আরো দুই প্রকৌশলী মুহাম্মদ কামাল হোসেন, শের আলী, অমিত ও রাহুল (উপরে বা থেকে)। ফাইল ফটো
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে সঞ্চালন লাইনে কাজ করার সময় বিদ্যুতায়িত হয়ে বিদ্যুৎকর্মী হতাহতের ঘটনায় এবার তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এ নিয়ে তিনটি কমিটি দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে গিয়ে পেয়েছে চমকপ্রদ সব তথ্য। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বিদ্যুৎকর্মীরা মারা যাচ্ছেন, আহত হচ্ছেন- এটা ভালো বার্তা দেয় না। বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান না হলে ভবিষ্যতে মাঠপর্যায়ের বিদ্যুৎকর্মীরা এই পেশা থেকে সরে আসবেন। এতে বিদ্যুৎসেবা মারাত্মকভাবে ব্যহত হতে পারে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তিন সদস্যের ওই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে যুগ্মসচিব মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানকে। অন্য দুই সদস্য হলেন ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) ডেমরা ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসানুজ্জামান এবং কোল পাওয়ার জেনারেশনের উপ-পরিচালক মো. নাজমুল হক।

বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখার উপসচিব ফারজানা খানম স্বাক্ষরিত অফিস আদেশ থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

সিদ্ধিরগঞ্জের দুর্ঘটনায় স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরের (এসওপি) কোন ব্যত্যয় হয়েছে কিনা তা যাচাই করে দায়দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনী ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ০৩ (তিন) কর্মদিবসের মধ্যে দাখিল করতে বলা হয়েছে।

বুধবার (২৬ নভেম্বর) সকালে সিদ্ধিরগঞ্জে ডিপিডিসি সাউথের আওতাধীন নারায়ণগঞ্জ ডাইরেক্ট ওভারহেড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে (ফিডার) কাজ করার সময় নিহত হন মো. নজরুল ইসলাম (৫৫)। আহত হন আরো দুই বিদ্যুৎকর্মী। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ওই দিন বিকেলে ডিপিডিসি সাউথের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী মুহাম্মদ কামাল হোসেন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। পরে রাতে ডিপিডিসির প্রধান কার্যালয় থেকে পাঁচ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। 

জানা যায়, সিদ্ধিরগঞ্জে ১১/০.৪১৫ কেডি ট্রান্সফরমারে শীতকালিন মেরামত ও সংরক্ষণ কাজ করা হচ্ছিল। দুটি ফেজে কাজ সম্পন্ন করার পর তৃতীয় ফেজে হঠাৎ বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে ওই হতাহতের ঘটনা ঘটে। 

তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা যায়, এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কয়েকটি বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন বন্ধ রেখেই কাজ শুরু করা হয়েছিল, এটা নিশ্চিত। সাউত গ্রিডের যান্ত্রিক কোনো ত্রুটির কারণে হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন চালু হয়ে যেতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, দুর্ঘটনার সময় আশপাশের কোন গ্রাহকের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর বা আইপিএস চালু থাকায় সেই বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন অথবা ট্রান্সফরমারে সঞ্চারিত হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা বিরল হলেও অসম্ভব নয়। তবে সঞ্চালন লাইনে ব্রেকার থাকে। ওভারলোড হলে বা অনাকাঙ্খিতভাবে বিদ্যুৎ সঞ্চারণের ঘটনা ঘটলে ব্রেকারটি তা রোধ করে থাকে। ওই সঞ্চালন লাইনের ব্রেকারটি ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় তা কাজ করেনি বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির এক সদস্য।

তদন্ত কমিটির ওই সদস্য আরো বলেন, দুর্ঘটনাটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই ঘটেছে, এখন পর্যন্ত এমনটা আশঙ্কা করছি। প্রতি বছর সঞ্চালন লাইন ও গ্রিড (বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র) রক্ষণাবেক্ষণে প্রধান কার্যালয় থেকে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বরাদ্দকৃত অর্থ কি সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সেই প্রশ্ন এখন যৌক্তিকভাবেই উঠছে। গ্রিডগুলোর বাৎসরিক রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো আদৌ কি ঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা দেখভালের দায়িত্বে কারা রয়েছেন? তাদেরকেও এখন তদন্তের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তদন্ত কমিটির ওই সদস্য। তিনি বলেন, এই অনাকাঙ্খিত মৃত্যু রোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎকর্মীদের দিয়ে এ ধরনের কাজ করানো সম্ভব হবে না। 

ডিপিডিসির সাবেক এক প্রধান প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা স্কুপকে বলেন, গ্রিড ও সঞ্চালন লাইন রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছরই যে টাকা খরচ হয় তার অর্ধেকও যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো হতো, তাহলে এ ধরনের দুর্ঘটনাই ঘটত না। সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ যদি বন্ধই থাকে, তাহলে বিদ্যুতের ফিডব্যাকে ব্রেকার কেন কাজ করল না? মূলত: রক্ষণাবেক্ষণের বেশিরভাগই কাজই কাগজ-কলমে সম্পন্ন দেখানো হয়। তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, গত ১০/১৫ বছরে গ্রিডগুলোতে যেসব ঠিকাদার দিয়ে কাজ করানো হয়েছে, সেই তালিকা দেখলেই আপনি বুঝতে পারবেন কী ফাঁকিঝুকি চলছে। বাস্তবতা হচ্ছে, গ্রিডের কিছু অসাধু প্রকৌশলী তাদের পছন্দের অল্প কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়েই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কাজ করাচ্ছে। আদৌ কাজ হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার।

এদিকে, দুর্ঘটনার পর তৃতীয় দিন শনিবারও (২৯ নভেম্বর) কর্মব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন তদন্ত কমিটিগুলোর সদস্যরা। তাঁরা ঘটনাস্থলের আশপাশের বেশকিছু গ্রাহকের স্থাপনা পরিদর্শন করে ওই দিন ওই সময়ের বৈদ্যুতিক মিটারের ডাটা সংগ্রহ করেছেন। একই সঙ্গে, দুর্ঘটনার দিন ঘটনাস্থলের আশপাশের বাসিন্দাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। 

সিদ্ধিরগঞ্জের ডিভিশনের এক কর্মকর্তা ও এক বিদ্যুৎকর্মী বলেন, দুর্ঘটনার অনেক পর ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত অধিকারী ও ফিডার ইনচার্জ সহকারী প্রকৌশলী মো. রাহুল ঘটনাস্থলে যান। আমরা নির্বাহী প্রকৌশলী স্যারকে বার বার অনুরোধ করে বলেছি, দুর্ঘটনার খবরটি প্রধান কার্যালয়কে অবহিত করুন। উনি বিষয়টি বেমালুম চেপে যেতে চেয়েছিলেন। ডিভিশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শের আলী ও সাউথ বেল্টের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী মুহাম্মদ কামাল হোসেনও দুর্ঘটনার খবরটি জানতেন। প্রশ্ন উঠেছে, দায়িত্বশীল পদে থেকে তাঁরাও কেন খবরটি তাৎক্ষণিক প্রধান কার্যালয়কে জানাননি। পরবর্তীতে চার ঘন্টায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় সবাই বেকায়দায় পড়ে যান। পরে নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) স্যারকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। 

নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) কিউ এম শফিকুল ইসলাম ঘটনার দিন বিকেলে বাংলা স্কুপকে জানিয়েছিলেন, তিনি দুর্ঘটনার সংবাদটি পান দুপুর তিনটার পর।

সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশন সূত্র জানায়, শের আলী ও মুহাম্মদ কামাল হোসেন বিদ্যুৎকর্মী নিহতের ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিতে চাইছেন। মুহাম্মদ কামাল হোসেন দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক এবং শের আলী প্রথম তদন্ত কমিটি সদস্য হওয়ায় বিষয়টি তাদের জন্য সহজ হয়ে গেছে। সূত্রের দাবি, তাঁরা সেই অনুযায়ী তথ্য-প্রমাণ যোগাড় করেছে। 

বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারহানা মমতাজ বাংলা স্কুপকে বলেছেন,  মন্ত্রণালয় পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। 

এদিকে, দুর্ঘটনা দায় থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত অধিকারী ও  ফিডার ইনচার্জ সহকারী প্রকৌশলী মো. রাহুলকে বাঁচাতে প্রভাবশালী একটি চক্রের তৎপরতা থেমে নেই। সূত্র বলছে, ওই চক্রটি তিনটি তদন্ত দলকে 'ম্যানেজ' করতে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছে। তারা চাইছে, দুর্ঘটনাটি নিছকই দুর্ঘটনা, কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ঘটেনি-এমনটি যেন প্রতিবেদন হয়। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে যেন অমিত-রাহুলকে দায়মুক্তি দেয়া হয়, তার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে ওই চক্রটি মাঠে নেমেছে বলে সূত্রের দাবি।

বাংলা স্কুপ/প্রতিবেদক/এইচএইচ/একেএস/এসকে

অমিত-রাহুল সিন্ডিকেটকে বাঁচাতে তৎপর প্রভাবশালীরা!
সঞ্চালন লাইনে কাজ করতে গিয়ে আবারো প্রাণ গেল বিদ্যুৎকর্মীর






প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ