এটি স্বাভাবিক ভৌত প্রক্রিয়া নাকি আতঙ্কের কারণ
বিশ্বে প্রতিবছর ২০ হাজার ভূমিকম্প হয়
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৪-১১-২০২৫ ০২:৪৮:০১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৪-১১-২০২৫ ০২:৪৮:০১ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
চলতি বছরের ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত সারাবিশ্বে আনুমানিক ১৬ হাজারের মতো মৃদু-মাঝারি-শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। ভূমিকম্পের এমন চিত্র পর্যালোচনা করলে বলা যায়-পৃথিবীতে বিভিন্ন মাত্রায় কম্পনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। কম্পনহীন এবং নীরব ভূপৃষ্ঠ একদিনও থাকে না। এমন কম্পন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক ভৌত প্রক্রিয়া।
এ বছর ভূমিকম্পের তালিকায় ম্যাগনিচুড ৪ থেকে শুরু করে ৮ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প নথিভুক্ত করা হয়েছে। নভেম্বর পর্যন্ত রিখটার স্কেল ৪.০–৪.৯ রেঞ্জের ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে ১৪ হাজার ২৪৪টি। এছাড়া, মাঝারি মাত্রা রিখটার স্কেল ৫.০–৫.৯ ভূমিকম্পের সংখ্যা ছিল ১,৮১৪টি। শক্তিশালী মাত্রার ৬.০-৬.৯ ছিল ১২০টি। অতি শক্তিশালী রেঞ্জ ৭.০-৭.৯ মাত্রার ছিল ১৩টি এবং প্রলয়ংকরী ৮.৮ মাত্রার ছিল একটি ভূমিকম্প।
ফ্রিকোয়েন্সি বা গড়ে প্রতি দিন বা প্রতি ঘণ্টায় কয়টি ভূমিকম্প হয়, সেটা অনুমান করা যায় পৃথিবীর গড় সিসমিক অ্যাক্টিভিটির ওপর ভিত্তি করে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, ‘প্রতিদিন গড়ে ৫৫টি ভূমিকম্প হয়’ আর বছরে প্রায় ২০ হাজার। সংস্থাটির জেট প্রোপালসন ল্যাবরেটরির (জেপিএল) তথ্য অনুযায়ী, গড়ে প্রতিদিন ৫০-৬০টি ভূমিকম্প হয়ে থাকে এবং প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২/৩টি।
এই গড় গতিবিধি বেশিরভাগ বছরেই তুলনামূলকভাবে একই রকম থাকে। বিশেষ কিছু বছরে বিধ্বংসী মাত্রায় ম্যাগনিচুড ৭ বা এর উপরে অনেকগুলো ভূমিকম্প হতে পারে। তবে মৃদু মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা খুব বেশি ওঠানামা করে না। ব্রিটিশ সংস্থা ভূমিকম্পবিজ্ঞানী তথ্যভান্ডার এবং ওয়েবজিওলজিক্যাল সার্ভে বলেছে, ‘প্রকৃতপক্ষে গত কয়েক দশকে নিরীক্ষণযোগ্য পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা বেড়েছে, তাই ছোট ভূমিকম্পগুলো এখন আগের চেয়ে বেশি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা যায়। তবে বড় ভূমিকম্পের হার খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি।
সংস্থাটির বিশেষজ্ঞদের ধারণা হলো-এমন ভূমিকম্পের ঘটনা পৃথিবীর স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া-অর্থাৎ প্লেট টেকটনিকস, ফল্ট স্লিপ ইত্যাদির ফল। এবং এটি একটি দৈনন্দিন বা প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। ভূমিকম্প মূলত পৃথিবীর স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। টেকটোনিক প্লেট সবসময় নড়ে, এতে চাপশক্তি জমে, তারপর কোথাও গিয়ে ফাটল ধরে। এটিই ভূমিকম্প। তাই বিশ্বে প্রতিদিনই ছোট–মাঝারি ভূমিকম্প হয়, যা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক। তবে, যখন ভূমিকম্প শক্তিশালী মাত্রায় হয় বা জনবসতিপূর্ণ এলাকা বা শহরে আঘাত হানে, তখনই এটি ‘বড় ধরনের দুর্যোগ’ হয়ে ওঠে।’এ বছর ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত ভূকম্পনজনিত কারণে বিশ্বে মৃত্যু হয়েছে ৮ হাজার মানুষের। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা হয়েছে মিয়ানমারে ২৮ মার্চে ঘটে যাওয়া ৭.৭ মাত্রায় ভূমিকম্পে প্রায় দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া আফগানিস্তানে শক্তিশালী ভূমিকম্পেও উল্লেখযোগ্য মৃত্যু হয়েছে। এক প্রতিবেদন অনুযায়ী কমপক্ষে ৬২২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
কেন ভূমিকম্প এক মহা আতঙ্কের নাম: ভূমিকম্পকে এত ভয়ংকর মনে হওয়ার প্রধান কারণ হলো এর হঠাৎ আঘাত এবং নিয়ন্ত্রণহীন ধ্বংসক্ষমতা। মানুষ বেশি আতঙ্কিত হয় কারণ বেশির ভাগ মৃত্যুই ঘটে ভবন, ছাদ বা কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে-অর্থাৎ সরাসরি কাঠামোর ধসেই করুণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এছাড়া ভূমিকম্পের কোনো নির্ভরযোগ্য ও তাৎক্ষণিক পূর্বাভাস নেই- কবে, কোথায়, কত মাত্রায় ধাক্কা আসবে তা আগে থেকে জানা যায় না। এই অনিশ্চয়তা মানুষের মনে গভীর মানসিক চাপ তৈরি করে। কয়েক সেকেন্ডের কম্পনেই সড়ক, সেতু, হাসপাতাল, স্কুলসহ বড় কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে-যা একে অন্যসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের তুলনায় আরও আকস্মিক, আরও প্রাণঘাতী এবং আরও মানসিকভাবে ধাক্কা দেয়ার মতো একটি বিপর্যকর ঘটনা হিসেবে ধরা দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী কম্পনের আঘাত মানুষকে ভয় পাইয়ে দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু তাই বলে পৃথিবী আরও মৃত্যুঝুঁকির দিকে যাচ্ছে বা ভূমিকম্প এখন আগের চেয়ে বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে-এমন আশঙ্কা ঠিক নয়। এভাবে স্বাভাবিকভাবে বলা হলে ভূমিকম্প নিয়ে মানুষের আতঙ্ক কিছুটা হলেও কমবে। ভূতাত্ত্বিকরা বেশিরভাগ সময় বলেছেন, প্লেট বা টেকটনিকসের কাজ ধীরে ধীরে, দীর্ঘ মেয়াদে ঘটছে। প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে আমাদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা (সিসমোগ্রাফ নেটওয়ার্ক, তথ্য সংগ্রহ, মডেলিং) আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। এর ফলে আমরা এখন আগের তুলনায় অনেক ছোট এবং মৃদু ভূমিকম্পও ধরতে পারি যা আগে আমাদের নজরে আসতো না। এক গবেষক ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ‘বর্তমানে যা দেখছি তা ভয়াবহ বৃদ্ধি নয়, বরং তথ্য ও নজরদারি শক্তি বেড়ে যাওয়ার ফসল।’
সর্বোপরি, এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পের মাত্রা এবং মৃত্যু যা দেখাচ্ছে, তা পৃথিবীর একটি স্বাভাবিক, পূর্ণ ভূ-তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ। যদিও কিছু দুর্যোগকর ঘটনা যেমন মিয়ানমারের প্রাণঘাতী ভূমিকম্প) হয়েছে, তবে সাধারণভাবে এটি ‘প্রাকৃতিক মহাদুর্যোগ’ নয়, বরং পৃথিবীর স্বাভাবিক রূপের একটি প্রকাশ। ভূমিকম্প শুধু ধ্বংসই তৈরি করে না; প্রকৃতিতে এর কিছু উপকারী দিকেও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভূমিকম্পের ফলে মাটির নিচে জমে থাকা চাপ মুক্ত হয়, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ধ্বংস কমাতে সহায়ক হয়। এটি পাহাড়, উপত্যকা ও নদীর স্রোতকে নতুন আকৃতি দিতে পারে, ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটায় এবং ভূ-সম্পদ যেমন খনিজ সৃষ্টির নতুন সুযোগ তৈরি করে। এছাড়া, সমুদ্রতল বা নদীর তলদেশে জমে থাকা চাপের পরিবর্তনের কারণে নতুন জলাশয় বা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর জন্ম নিতে পারে।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স