ঢাকা , শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ , ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পেঁয়াজের ঝাঁজে দিশেহারা ক্রেতা: বাজারে লকডাউনের প্রভাব

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৪-১১-২০২৫ ১২:৪৭:৫৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৪-১১-২০২৫ ০৬:৫৯:০৫ অপরাহ্ন
পেঁয়াজের ঝাঁজে দিশেহারা ক্রেতা: বাজারে লকডাউনের প্রভাব ফাইল ছবি
বাজারে চড়া পেঁয়াজের দাম এখনো কমেনি। তবে আগাম পাতাসহ পেঁয়াজ কলি বাজারে আসতে শুরু করেছে। আগামী সপ্তাহ নাগাদ নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ এলে বাজার অনেকটা স্থিতিশীল হবে বলে মনে করছেন বিক্রেতারা। অন্যদিকে বাজারে শীতের সবজির সরবরাহ বেড়েছে। শিম, মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপির সঙ্গে শালগমও বাজারে মিলছে। কিন্তু  গত সপ্তাহের তুলনায় প্রতিটি সবজির দাম বাড়তি যাচ্ছে বাজারে। বিক্রেতারা এর কারণ হিসেবে বলছেন, রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে সবজির ট্রাক কম এসেছে ঢাকায়, ফলে সরবরাহ কমেছে। যে কারণে মূলত সবজির দাম বেড়েছে। শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।

বাজারে এখন পুরনো পেঁয়াজ ১১০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরেই বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগেও যা বিক্রি হতো ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। অন্যদিকে, বাজারে আসা চলতি মৌসুমের নতুন পেঁয়াজ কলির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। রামপুরা বাজারের কাঁচাপণ্য বিক্রেতা আবু ফজল বলেন, নতুন পাতা পেঁয়াজ আসতে শুরু করেছে। কিছুদিনের মধ্যে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আসবে। পেঁয়াজের দাম আর বাড়ার সম্ভাবনা নেই, এখন কমবে। এদিকে, পেঁয়াজের দাম স্থিতিশীল না হলে আমদানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের। এরই মধ্যে পেঁয়াজ আমদানির জন্য ২ হাজার ৮০০ প্রতিষ্ঠানের আবেদন জমা রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, পেঁয়াজের দাম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে আমদানির অনুমতি দিলেও সেটা সীমিত পরিসরে দেওয়া হবে, যেন মৌসুমি পেঁয়াজ ওঠার পর আমদানির প্রভাব কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
 
রাজধানী ঢাকায় গত কয়েকদিন ধরেই শীতের আগাম বার্তা টের পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে শীতকালীন সবজির সরবরাহও বাড়ছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে,  বাজারে প্রতি কেজি পটল ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে যা আগের সপ্তাহে ৬০ টাকার ঘরে ছিল। এ ছাড়া প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়, বেগুন প্রতি কেজি ১০০ টাকা, পেঁয়াজের ফুল প্রতি কেজি ৮০ টাকা, ঝিঙ্গা প্রতি কেজি ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা প্রতি কেজি ৮০ টাকা, বরবটি প্রতি কেজি ১২০ টাকা, করলা প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি শসা ৮০ টাকা, আলু প্রতি কেজি ৩০ টাকা, কচু প্রতি কেজি ৬০ টাকা, ফুলকপি প্রতি পিস ৫০ টাকা, বাধাকপি প্রতি পিস ৫০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কাঁচা টমেটো প্রতি কেজি ১০০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১৬০ টাকা, পেঁপে প্রতি কেজি ৩০ টাকা, ঢেঁড়স প্রতি কেজি ৮০ টাকা, মূলা প্রতি কেজি ৬০ টাকা, টমেটো প্রতি কেজি ১৪০ টাকা, গাজর প্রতি কেজি ১৪০ টাকা।

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে রাজধানীর বাড্ডা বাজারে বাজার করতে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী আব্দুল আলিম। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে সবজি কম দামে কিনলাম, সে সবই সবজি অতিরিক্ত ২০-৩০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। আজ প্রতিটি সবজির দামই বাড়তি। শীতে মানুষ কম দামে সবজি খাবে অথচ আজ বাড়তি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে।  সবজির দামের বিষয়ে গুলশান-বাড্ডা লিংক রোডের সবজি বিক্রেতা এরশাদ আলী বলেন, আজ কারওয়ানবাজারে গিয়ে দেখি সব সবজির দাম বাড়তি, সেই সঙ্গে আজকের বাজারে সবজি সরবরাহ অনেকটা কম। সব মিলিয়ে বাড়তি দামে সবজি কিনতে হয়েছে, যে কারণে এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। কাওরান বাজারের সবজি ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকার কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তুলনামূলক সবজির ট্রাক কম এসেছে কাওরান বাজারে। মূলত শীতে শুরুতে এই সময় সবজির দাম এমন বাড়তি হওয়ার কথা না। গত সপ্তাহেও কম দাম ছিল, কিন্তু আজ মূলত সবজির সরবরাহ কম হওয়ায় সবজির দাম বেড়েছে খুচরা পর্যায়ে।

বাজারে চড়া দামের দেওয়াল তুলে দিয়েছে মাছ ও দেশি মুরগি। বিপরীতে ব্রয়লার মুরগির দাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার রাজধানীর বাজারগুলোতে দেশি মুরগির দাম প্রতি কেজি ৬০০ টাকা আর সোনালি মুরগি ৩২০ টাকার ঘরে, অন্যদিকে ব্রয়লার মাত্র ১৭০ টাকায় কেজি বিক্রি হচ্ছে। এমন অবস্থায় মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন-আয়ের মানুষের প্রাণিজ প্রোটিনের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে এটি। সকালে সরেজমিনে রাজধানীর উত্তরার সমবায় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশি মোরগ-মুরগির দাম প্রতি কেজি প্রায় ৫৫০-৬০০ টাকা। সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকা কেজি দরে। আর সোনালী ক্রসের দাম ২৯০ টাকা। আর ব্রয়লার মুরগির বর্তমান বাজারদর কেজিপ্রতি ১৭০ টাকা। যা অন্য যেকোনো মুরগির চেয়ে প্রায় অর্ধেক বা তারও কম।

অপরদিকে মুরগি বিক্রেতারাও জানালেন চাপে থাকার কথা। বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, ব্রয়লারের দাম কম, তাই বিক্রিও বেশি। কিন্তু আমাদের লাভের মার্জিন খুবই কম। পরিবহন ও অন্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা থাকে না। তবুও চাহিদা থাকায় ব্যবসা ধরে রাখা যাচ্ছে।  আলমগীর হোসেন নামের আরেক বিক্রেতা বলেন, সোনালী-দেশি মুরগির খাবার ও রাখার খরচ অনেক বেশি। সেই তুলনায় ব্রয়লারের উৎপাদন খরচ কম, বিক্রিও দ্রুত। তাই এখন অনেকেই দেশি মুরগির বদলে ব্রয়লার ফার্মে বিনিয়োগ করছেন। যার কারণে এর বাজারদর কিছুটা কম। সামনে শীতকাল আসছে। হয়তো দাম আরও কমে যাবে। এই বিক্রেতা আরও বলেন, ক্রেতারা আসেন, মুরগির দাম শুনে চলে যান। আবার ফিরে আসেন ব্রয়লার নিতে। মাছের চেয়ে ব্রয়লারের দাম কম থাকায় চাহিদাও বেশি। এর বিপরীতে ক্রেতারা বলছেন, সবকিছুর চড়া দামের মধ্যে ব্রয়লার মুরগির দামই কিছুটা কম। যার কারণে অধিকাংশ মানুষই ব্রয়লার বেশি নিচ্ছেন। জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ক্রেতা বলেন, পরিবারে প্রতি সপ্তাহে একবার মাংস তো চাই-ই। দেশি মুরগি কিংবা মাছ কেনার সামর্থ্য আমার নেই। ব্রয়লার দামে স্বস্তি থাকতেই আমি এটা কিনি। স্বাদ কম হলেও পেট ভরাতে পারছি এটাই বেশি।

অন্যদিকে প্রোটিনের আরেক উৎস মাছের দামও এখন আকাশছোঁয়া। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব ধরনের মাছের দামই প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। এর মধ্যে বড় রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, মাঝারি রুই ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা ও ছোট রুই ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি। কাতল মাছের দাম ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা, শিং মাছ ৫৫০ টাকা, মাগুর ৫০০ টাকা, চাষের কৈ ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, পাঙাশ ১৮০ থেকে ২৩০ টাকা এবং তেলাপিয়া ১৫০ থেকে ২২০ টাকা, সিলভার কার্প মাছ ২৫০-৩০০ টাকা, বোয়াল মাছ ৫০০-৭০০ টাকা, কালিবাউশ মাছ ৪৫০ টাকা, আইড় মাছ ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া, অন্যান্য মাছের মধ্যে ছোট চিংড়ি ৩০০ টাকা, কাঁচকি মাছ ৪৫০ টাকা, মলা মাছ ৩০০ টাকা, পাবদা মাছ আকারভেদে ৩০০-৬০০ টাকা, গলদা চিংড়ি আকারভেদে ৬৫০-৭৫০ টাকা কেজি দামে বিক্রি করতে দেখা গেছে।

একই বাজারের ফিশারিজ মার্কেটের বিক্রেতা আব্দুস সালাম বলেন, গত কয়েক মাস ধরে প্রায় সব মাছের দাম স্থির আছে, কিন্তু এটাই সমস্যা। পাইকারি দাম কমেনি, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বেড়েছে। রুই-কাতলার দাম ৩৫০-৪৫০ টাকা, এটা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এখন শিং-মাগুর ৫০০ টাকার উপর, সেটাও মধ্যবিত্তের কেনার ক্ষমতায় নেই। পাঙাশ-তেলাপিয়াই এখন বিক্রি বেশি, কারণ সেটা ২০০ টাকার আশপাশে আছে। আরেকজন মাছ বিক্রেতা রেজাউল করিম জানান, মাছের চাহিদা কমেছে। মানুষ এখন ব্রয়লার মুরগির দিকে ঝুঁকছে। গলদা চিংড়ি ৭০০ টাকা কেজি, বোয়াল ৬০০ টাকা। এসব এখন শুধু উচ্চবিত্ত বা বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্যই কেনা হয়। সাধারণ দিনে ক্রেতারা ১৫০-২০০ টাকার তেলাপিয়া বা পাঙাশই দেখছেন।

বাজারে ডজনপ্রতি ১০-২০ টাকা পর্যন্ত কমেছে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম। প্রতি ডজন ডিম মাসখানেক আগেও যেখানে ১৫০ টাকায় উঠেছিল, তা এখন ১৩০ থেকে পাড়া-মহল্লায় ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা জানান, যখন সবজির দাম বেড়ে যায় তখন ডিমের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। আবার সবজির দাম কমে এলে ডিমের দামও কমে যায়।অন্যদিকে, মুদি বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দামে তেমন কোনো হেরফের দেখা যায়নি।

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ