ইলিশের অস্তিত্ব রক্ষায় আন্ধারমানিকের মোহনায় নৌকায় গণশুনানি
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১০-১১-২০২৫ ০৭:২৮:৪৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১০-১১-২০২৫ ০৭:২৮:৪৩ অপরাহ্ন
সংবাদচিত্র : ফোকাস বাংলা নিউজ
ইলিশের অস্তিত্ব রক্ষায় এবং উপকূলীয় পরিবেশ সুরক্ষার দাবিতে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় আন্ধারমানিক নদীতে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (১০ নভেম্বর) দুপুরে প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম- পটুয়াখালী, উন্নয়ন সংস্থা প্রান্তজন, ক্লিন এবং বিডব্লিউজিইডি’র যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই ব্যাতিক্রমধর্মী গণশুনানিতে এলাকার জেলে পরিবার এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
গণশুনানিতে বক্তারা স্পষ্ট করে তুলে ধরেন যে, কলাপাড়া অঞ্চলে দখল-দূষণের পাশাপাশি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পায়রা বন্দর কেন্দ্রিক অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্পের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে ইলিশের অভয়াশ্রম আন্ধারমানিক নদী আজ ইলিশশূন্য হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌছেছে।
জেলে আকলিমা বলেন, ‘আমি মধুপাড়ার বাসিন্দা। ২০০২ সাল থেকে স্বামী জেলে পেশায়। তখন থেকে আট জনের সংসারে একজনের ধরা মাছে ঠিকমতো চলত। বছরে দুই লাখ টাকা ডাইনে (আয়) থাকত। এহন ২-৩ বছর ধরে তিনজনের সংসারও চলে না। গাঙে ইলিশ নাই। তাপ বিদ্যুৎ অওয়ার পর মাছ নাই। পায়রা বন্দর অইয়া চ্যানেলে মাছ ধরতে পারি না। ইলিশ রাবনাবাদ ও আন্ধারমানিক নদীতে ঢোকে না।’
চন্দ্রভানু বেগম বলেন, ‘ নদীতে হারাদিন জাল বায়, মাছ মেলে না। অনাহারে থাহন লাগে। এককূলে জাল ধরে আরেককূলে জাহাজে কাইট্টা নেয়।’ মন্নান পাহলোয়ান জানান, মা ইলিশ দেখেন না। গরমপানির বর্জ্যে মাছ ঢোকে না। সংসার চালাইতে কষ্ট হয়। আব্দুর রব জানালেন, এই নদীতে মাছ ধরি। কিন্তু পাই না। এখন সংসার আর চলে না। চ্যানেলে মাছ ধরতে পারেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা জহুরুল ইসলাম জানান, জায়গা-জমি নিয়া গেছে। বিদ্যুৎ স্টেশন করছে। এখন গাছপালা পর্যন্ত মরে যাচ্ছে। অলিউর রহমান নিপুল জানান, এইসব উন্নয়ন প্রকল্প করার পর থেকে মা ইলিশ রাবনাবাদ ও আন্ধারমানিক চ্যানেলে প্রবেশ করতে পারে না। আরো বক্তব্য রাখেন শিক্ষক ফিরোজ তালুকদার, সাবেক মেম্বার কেএম জালাল উদ্দিন, প্রতিবেশ ও পরিবেশ ফোরাম আহ্বায়ক অমল মুখার্জী, বরিশাল পরিবেশ ও জনসুরক্ষা ফোরামের আহ্বায়ক শুভাংকর চক্রবর্তী ।
বিচারক প্যানেলে ছিলেন মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট খেপুপাড়ার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আশরাফুল হক, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকূলীয় অধ্যয়ন ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক অসীম আবরার, অ্যাডভোকেট সুভাষ চন্দ্র দাস।
উন্নয়ন সংস্থা প্রান্তজনের নির্বাহী পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম শাহজাদা মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন দিন দিন কমছে: ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত উৎপাদন স্থিতিশীল থাকলেও ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসে ইলিশের জাতীয় উৎপাদন ৪২,০০০ মেট্রিক টন কমে গেছে। এটি মৎস্য অর্থনীতির জন্য একটি অশনি সংকেত। দেশের মোট ইলিশের প্রায় ৬৫% উৎপাদনকারী বরিশাল বিভাগেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে (প্রায় ২৩,৫০৯ মেট্রিক টন হ্রাস)। একসময়ের ইলিশের অফুরন্ত ভান্ডার আন্ধারমানিক নদী আজ গভীর সংকটের মুখে, অভয়াশ্রম ঘোষিত এই নদীতে বর্তমানে কালেভদ্রেও ইলিশ মিলছে না।
এই গভীর সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে এই অঞ্চলের কয়লাা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বন্দর কেন্দ্রিক অপরিকল্পিত উন্নয়ন। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন যে, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্যান্য অবকাঠামো থেকে নির্গত অপরিশোধিত শিল্প বর্জ্য ও গরম পানি সরাসরি নদীতে পড়ছে। এছাড়া দখল-দূষণ তো আছেই।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশ অত্যন্ত দূষণ সংবেদনশীল হওয়ায় এই দূষণ তার প্রজনন ব্যাহত করছে। ফলে, ইলিশের আকার ছোট হচ্ছে এবং তারা এলাকা ছাড়ছে। এই দূষণের কারণে রামনাবাদ, আন্ধারমানিক ও টিয়াখালী নদীর পানি ও মাটি মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি, বন্দরকে কেন্দ্র করে নদীতে অতিরিক্ত জাহাজ চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ায় ইলিশের বঙ্গোপসাগর থেকে মূল প্রবেশ পথ প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে। এছাড়াও আন্ধাররমানিক নদীতে মাত্র ৮ কিলোমিটারের মধ্যে তিনটি সেতু নির্মাণ, শাখা নদীগুলোর মুখ বন্ধ হওয়ায় নদীর স্বাভাবিক স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়ে নাব্যতা কমেছে, যা ইলিশের অবাধ বিচরণ ও প্রজননকে মারাত্মকভাবে বাধা দিচ্ছে। এছাড়াও, নদীর তীর ভরাট করে ফ্রি-স্টাইলে বালু ফেলা এবং অবৈধ দখলদারিত্ব চলছে, যা নদীটিকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে।
পরিবেশগত এই বিপর্যয়ে জেলেদের জীবন-জীবিকাকে চরমভাবে বিপন্ন করেছে। স্থানীয় জেলে পরিবারের প্রতিনিধিরা হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, জীবিকা নির্বাহের সুযোগ কমে যাওয়ায় শত শত জেলে পেশা হারিয়ে ফেলছে। বাধ্য হচ্ছেন শ্রমজীবীর কাজ করতে ।
পরিবেশগত এই সংকটের সমাধান এবং জাতীয় সম্পদ ইলিশ রক্ষায় গণশুনানি থেকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জরুরি ভিত্তিতে দাবি জানানো হয়েছে: বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ও গরম পানি নদীতে ফেলার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানের কঠোর পরিবেশগত মানদন্ড নিশ্চিত করতে হবে এবং মৎস্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র সুরক্ষিত রেখে অবকাঠামোগত পরিকল্পনা চুড়ান্ত করতে হবে।
এছাড়াও, জাহাজ চলাচল এবং অবকাঠামো নির্মাণ যেন ইলিশের প্রজনন ও চলাচলের পথকে বাধাগ্রস্ত না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে এবং যেকোনো মেগা প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে ইলিশসহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্রের উপর পরিবেশগত প্রভাবের মূল্যায়ন অবশ্যই করতে হবে। সবশেষে, আন্ধারমানিক নদীর সীমানা চিহ্নিত করে অবিলম্বে দখল, দূষণ ও ভরাট বন্ধ করার দাবি জানানো হয়।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স