দুর্নীতি করে শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) বনশ্রী ডিভিশনের সিনিয়র সহকারী হিসাব কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন এখনও বহাল তবিয়তে স্বপদে রয়েছেন। ডিপিডিসির প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত শুভ্যানুধায়ীদের প্রভাব ও অবৈধ অর্থের জোরে দুর্নীতি করে বার বার পার পেয়ে যাওয়ায় হয়ে উঠেছেন তিনি বেপরোয়া। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত চলমান থাকলেও তা যেন প্রভাব ফেলছে না তাঁর কর্মকাণ্ডে। রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় ফুলে-ফেঁপে উঠে জসিম এখন বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন পর্যটন খাতে।
জসিম উদ্দিনের চাকরিজীবনের শুরু ২০০৮ সালে, লাইনম্যান ম্যাট হিসেবে। এরপর ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেলেও তার সবচেয়ে বড় ‘যোগ্যতা’ ছিল—রাজনৈতিক প্রভাব, দালালি আর দুর্নীতিকে পুঁজি করে প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা বের করে নেওয়া। তিনি ডিপিডিসির দুর্নীতি সিন্ডিকেটের একটি চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। ওই চক্রটি এখনো ডিপিডিসির ৩৬টি ডিভিশনে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। উচ্চচাপ সংযোগের সাবস্টেশনের স্থাপনে ঠিকাদারি চুক্তি নেয়া, গ্রাহককে বিভিন্ন ফাঁদে ফেলে অর্থ আদায়, নিয়মবহির্ভূতভাবে উচ্চচাপ সংযোগকে পাশ কাটিয়ে নিম্নচাপ সংযোগ দিয়ে টাকা কামানো, গ্রাহকের আঙ্গিনায় সোলার প্ল্যান্ট স্থাপনের ঠিকাদারি নেয়া থেকে শুরু করে হেন কোন অনিয়ম নেই যা করে জসিম টাকা কামাচ্ছেন না।
তার এই অপকর্মে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে বনশ্রী ডিভিশনের সহকারী প্রকৌশলী আতাউর রহমান প্রামাণিক, মুগদা ডিভিশনের সহকারী প্রকৌশলী ইলিয়াস ও উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ওবায়দুল্লাহ এবং বনশ্রীর দালাল শামীম, মুজিবর ও সোহেল। বনশ্রী ডিভিশনের এক প্রকৌশলী জানান, শুধু এই ডিভিশনেই নয়, জসিমের নেতৃত্বে সিন্ডিকেটের সদস্যরা এখনও পুরো ডিপিডিসি দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। জসিমের এক ঘনিষ্ঠজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমান ডিপিডিসির দুই প্রধান প্রকৌশলী, তিনজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, পাঁচজন নির্বাহী প্রকৌশলী, অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা চারজন নির্বাহী প্রকৌশলী জসিমের সঙ্গে সাবস্টেশন ব্যবসায় সরাসরি যুক্ত রয়েছেন।
সূত্র জানায়, আওয়ামী শাসনামলে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করে শত কোটি টাকার মালিক বনে যান জসিম। চাকরির নিয়ম ভঙ্গ করে বিদ্যুতের সাবস্টেশন নির্মাণ, সোলার প্লান্ট, পিএফআই প্লান্টের ব্যবসা করেছেন। এখন তিনি বনশ্রী বিল্ডার্স নামে একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানিরও একজন অন্যতম অংশীদার। ওই কোম্পানির প্রধান কার্যালয় বনানীর ইউনাইটেড বেনিসন ভবনে এবং শাখা অফিস রামপুরার হক টাওয়ারে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও দুর্নীতির কারণে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি না হওয়ায় বেপরোয়া জসিম এখন ব্যবসার ধরণ পাল্টেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি তিনি কুয়াকাটায় ৩০ বিঘা জমির উপর নির্মিতব্য আধুনিক ফাইভ স্টার মানের ইস্তানবুল হোটেল এন্ড রিসোর্ট লিমিটেডে অর্থ লগ্নি করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক প্রচারপত্রে মো. জসিমকে পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, কীসের জোরে স্বৈরাচারের দোসর এখনও চাকরিতে বহাল রয়েছেন? দুদকের তদন্ত চলমান থাকার পরও কীভাবে তিনি একের পর এক ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন? তাঁর এই অর্থের উৎসই বা কী? জসিম দুদক কর্মকর্তাদের 'ম্যানেজ' করে ফেলেছেন, এমন জল্পনা-কল্পনাও চলছে সংশ্লিষ্টমহলে।
তবে দুদক সূত্র জানাচ্ছে, ডিপিডিসির প্রধান কার্যালয় থেকে শ্রমিক লীগ নেতা জসিমের ব্যক্তিগত নথি ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সূত্র থেকে তাঁর সম্পর্কে তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। দ্রুতই জসিমের দুর্নীতির তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে বলে জানিয়েছেন দুদক কর্মকর্তারা।
বাংলা স্কুপ/প্রতিবেদক/একেএস/এসকে
থেমে নেই শ্রমিক লীগ নেতা জসিমের অপকর্ম!
বিদ্যুতের সেই জসিমের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে দুদক
আলাদিনের চেরাগ!