গোমতীর চরে লাউ শাকে বাজিমাত
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১৪-১০-২০২৫ ১২:৫৮:০৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৪-১০-২০২৫ ১২:৫৮:০৮ অপরাহ্ন
সংবাদচিত্র: সংগৃহীত
কুমিল্লার গোমতী নদীর বালুচর এখন যেন সবুজের সমারোহে ভরপুর। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সবুজ চাদরে মোড়া বিশাল মাঠ। চরের উর্বর জমিতে এখন ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে লাউ শাক। অল্প পুঁজিতে বেশি লাভ হওয়ায় এই শাক চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন গোমতী চরের শতাধিক কৃষক।
বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের ভান্তী গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান কয়েক বছর আগেও চরে লাউ, মুলা ও লাল শাক চাষ করতেন। কিন্তু বর্ষাকালে অতিবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হওয়ায় লোকসানে পড়েন তিনি। পরে স্থানীয় পাইকারদের পরামর্শে লাউয়ের পরিবর্তে লাউ শাকের চাষ শুরু করেন। বাজারে চাহিদা ও দাম বেশি থাকায় এখন প্রায় ৬০ শতক জমিতে লাউ শাক চাষ করে লাভবান হয়েছেন তিনি। তার সাফল্য দেখে আশপাশের শতাধিক কৃষক এখন লাউ শাক চাষের দিকে ঝুঁকেছেন।
সরেজমিনে রবিবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, ভান্তী, বালিখাড়া, কামারখাড়া ও কাহেত্রা গ্রামের চরে সারি সারি সবুজ ফসলের ক্ষেত। লাউশাক ছাড়াও শীতের আগাম সবজি যেমন, মূলা, লাল শাক, ফুলকপি, বাঁধা কপি, গোল আলু ক্ষেতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। কৃষকরা কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ জমিতে পোকামাকড় দমনের ওষুধ ছিটাচ্ছেন, আবার কেউ লাউ শাকের ডগা কেটে আঁটি বাঁধছেন।
কৃষক মিজানুর রহমানের ক্ষেতে দেখা যায়, তিনি তার ভাগিনা ও ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে লাউ শাকের ডগা কেটে আঁটি তৈরি করছেন। একজন শ্রমিক সেই আঁটি ধুয়ে গোমতীর বেড়িবাঁধে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখছেন।
মিজানুর রহমান বলেন, ‘লাউয়ের তুলনায় লাউ শাকে ঝুঁকি ও খরচ কম। আবার লাভও বেশি। এক গাছ থেকে ৪-৫ বার পর্যন্ত ডগা কাটা যায়।
বৃষ্টিতে ক্ষতি হয় না, পোকামাকড়ও কম। লাউ চাষে মাচা তৈরি ও পাহারা দিতে হয়, এতে খরচ ও পরিশ্রম বেশি। কিন্তু লাউ শাক মাচা ছাড়াই মাটিতে বেড়ে ওঠে। প্রতি ১০-১২ দিন পর ডগা কাটা যায়। ছয়-সাতটি ডগা মিলে এক আঁটি হয়, যার দাম ২৫-৩০ টাকা। প্রতি কানি জমিতে ৩০-৪০ হাজার টাকা খরচ করে ১ লাখ ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয়। লাউ শাকের মৌসুম শেষে আলু চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
কামারখাড়া গ্রামের কৃষক আবদুস সাত্তার বলেন, ‘বাজারে লাউয়ের চেয়ে শাকের চাহিদা অনেক বেশি। পাইকাররা এখন শাক কিনতে আগ্রহী। প্রতি আঁটিতে খরচ বাদে ১৫ থেকে ২০ টাকা লাভ হয়। আগে মুলা ও লাল শাক চাষ করতাম, কিন্তু অতিবৃষ্টি ও পোকামাকড়ে ক্ষতি হতো। এখন সহজ পদ্ধতিতে লাউ শাক চাষ করে ভালো আয় করছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই শাক প্রথমে নিমসাইর পাইকারি বাজারে যায়। এরপর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। স্থানীয় পাইকাররা প্রতিদিন ভোরে চরে এসে ট্রাকে শাক সংগ্রহ করে নিয়ে যান।’
লাউ শাক ক্ষেতের শ্রমিক শারাফত আলী রংপুর জেলার বাসিন্দা। তিনি প্রতি বছর শীতের আগে কাজের খোঁজে এই চরে আসেন। শীতের সবজি চাষে দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন জমিতে। তিনি বলেন, ‘লাউ শাক চাষের কাজে শ্রম তুলনামূলক কম লাগে, তাই ক্ষেতে আগা কাটা ও আঁটি বাঁধা সহজ। আমরা প্রতি আঁটিতে ৫-৭ টাকা করে মজুরি পাই। ৪-৫টি আগা একত্র করে আটি বাঁধি, তারপর পানিতে ধুয়ে সাজিয়ে রাখি। পরে পাইকাররা এসে ট্রাকে করে নিয়ে যান।’
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি সম্প্রতি গোমতীর চর দেখে এসেছি। কৃষকরা লাউয়ের পরিবর্তে এখন লাউ শাক চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এতে অল্প সময়ে বেশি লাভ পাওয়া যায়। মৌসুম ছাড়াও তারা লাউ শাক চাষ করতে পারেন। লাউ যেমন বাজারে সরবরাহ দিচ্ছে, তেমনি লাউ শাকও সবজির চাহিদা মেটাচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘লাউ শাকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য যতবার ডগা কাটা হবে, ততবার নতুন ডগা গজাবে। এক গাছ থেকে ৪-৫ বার পর্যন্ত ডগা কাটা সম্ভব।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স