ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা: সুফল মিলবে কবে?
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৩-১০-২০২৫ ০৮:১৮:০৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৪-১০-২০২৫ ১০:৪৭:১৭ পূর্বাহ্ন
বাংলাস্কুপ
মা-ইলিশ সংরক্ষণে শুক্রবার (৪ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে শুরু হচ্ছে টানা ২২ দিনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরসহ দেশের সব নদী ও সাগরে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। তবে স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, এই সময়ে পার্শ্ববর্তী ভারতের জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে নির্বিঘ্নে মাছ শিকার করে নিয়ে যায়। এতে শুধু জেলেরা নয়, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাজারের খুচরা বিক্রেতারাও ক্ষতির মুখে পড়েন। অন্যদিকে, জেলেরা পড়েছেন মহা বিপাকে। কীভাবে চলবে তাদের সংসার তা নিয়ে আছেন দুশ্চিন্তায়। কেউ কেউ আবার গোপনে মাছ শিকারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সুফল মিলছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি
পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা ও নোয়াখালীর উপকূলীয় জেলেরা জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় বাংলাদেশি ট্রলারগুলো নদী–সাগর ছেড়ে ঘাটে নোঙর করে থাকে। অথচ ভারতের জেলেরা সীমান্ত অতিক্রম করে সাগরে নামেন এবং রূপালী ইলিশে ভরে ওঠে তাদের জাল। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জেলেদের হতাশা বাড়ছে। জেলেরা দাবি করেন, দুই দেশের মধ্যে একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে মা ইলিশ সংরক্ষণ কার্যকর হতো। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চরইশ্বর ঘাটে সম্প্রতি কয়েকশ জেলে মানববন্ধন করে একই সময়ে দুই দেশের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় জেলে আবুল হোসেন ফরাজী বলেন, “২২ দিনে মাত্র ২৯ কেজি চাল দেওয়া হয়। এতে সংসার চলে না। সরকার যদি প্রণোদনা বাড়াত, তাহলে পরিবার নিয়ে একটু স্বস্তিতে থাকতে পারতাম।” পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানান, “এক সপ্তাহের মধ্যে জেলেদের প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সমুদ্র ও নদীতে কার্যকরী নজরদারি নিশ্চিত করা হবে। নিষেধাজ্ঞা শতভাগ সফল করতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
নদীতে থাকছে ড্রোন নজরদারি
বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেঘনা নদী ‘ইলিশের খনি’ হিসেবে পরিচিত। নদী ও সাগরে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার জন্য মাঠে নামানো হয়েছে ড্রোন। কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে টহল দিচ্ছে। হিজলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম জানান, “যেখানেই জাল পড়বে, সেখানেই স্পিডবোট পৌঁছে যাবে।” বরিশাল নৌ পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার ইমরান হোসেন মোল্লা জানিয়েছেন, ড্রোন ও স্পিডবোটের সমন্বয়ে নদীর প্রতিটি সেক্টর নজরে রাখা হবে এবং আইন ভাঙলে ছাড় দেওয়া হবে না। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলিশ গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, “ড্রোনে নৌকা ধরা পড়বে, কিন্তু জেলেদের জীবিকা-নির্ভরতার সমস্যা না মিটলে নিয়ম ভেঙে যাবে। মা-ইলিশ সংরক্ষণ সফল করতে বিকল্প আয়ের পরিকল্পনা অপরিহার্য।”
দুশ্চিন্তায় জেলেরা: সংসার চলবে কীভাবে
চাঁদপুরে জেলেদের সংসারে হাহাকার। ইব্রাহীমপুর ইউনিয়নের জেলে ছলেমান সরদার বলেন, “খাদ্য পাই, কিন্তু তা দিয়ে কি ২২ দিন চলে? সংসার তো শুধু ভাতে চলে না, ওষুধ লাগে, নুন-তেল লাগে, স্কুলের খরচ লাগে।” ভোলার মনপুরায় ৫০ হাজার জেলে পরিবারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। সমুদ্রগামী ট্রলারের মাঝি রফিক বলেন, “গত দুই বছর নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে গিয়ে শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এবার যখন জালে ইলিশ পড়ছে, তখনই সরকার মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা দিল।” বরিশালে সরকারি হিসাবে প্রায় ৭৯ হাজার জেলে রয়েছেন। হিজলার টুমচরের খালেক বেপারী জানান, “এবার মাছ পাইনি, তাই দাদনও শোধ করতে পারিনি। তাই অনেকে নিষেধাজ্ঞার মাঝেও নদীতে নামছে।” জাতীয় মৎস্য শ্রমিক অধিকার ফোরামের নেতা এস এম জাকির হোসেন বলেন, “ঋণ আর দাদনের চাপে জেলেরা বাধ্য হয়ে নিষেধাজ্ঞা ভেঙে মাছ ধরতে নামে।”
গোপনে চলছে মাছ শিকারের প্রস্তুতি
২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে পটুয়াখালীর বিভিন্ন নদীতে মা ইলিশ শিকারের প্রস্তুতি চলছে। জেলেরা জাল-নৌকা মেরামত ও সরঞ্জাম সংগ্রহে ব্যস্ত। পায়রা, পান্ডব, পাতাবুনিয়া ও লোহালিয়া নদীর তীরবর্তী এলাকায় শতাধিক নৌকা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুমকি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান জানান, “যেখানে জেলেদের তৎপরতা বেশি, সেই এলাকায় আমরা নিয়মিত তদারকি চালাচ্ছি। যারা সরকারি নির্দেশনা অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নিষেধাজ্ঞার খবরে ইলিশের দাম আকাশচুম্বী
চাঁদপুরের হাটবাজারগুলোতে শেষ মুহূর্তে ইলিশের দাম আকাশছোঁয়া। ২–৪ কেজির পদ্মা ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩,৫০০–৪,০০০ টাকা কেজি দরে। ছোট সাইজের ইলিশ ৪০০–৭০০ টাকা প্রতি হালিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা জানান, বরফকল বন্ধ থাকায় আত্মীয়দের কাছে ২২ দিন ইলিশ পাঠানো সম্ভব নয়, তাই দাম যাই হোক কিনতে হচ্ছে। চাঁদপুর সদরের জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, “জাটকা রক্ষায় প্রশাসন কঠোর ছিল। বড় সাইজের ইলিশ পাওয়ায় দাম বেশি হলেও আমরা তদারকি করছি।”
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স