চালকের বেশে ছিনতাইকারী!
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৬-০৯-২০২৫ ০৭:৩৯:৩৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৬-০৯-২০২৫ ০৭:৪০:৪২ অপরাহ্ন
রাতের ঢাকায় সিএনজি বা অটোরিকশার ভেতর নিশ্চিন্তে যাত্রা শুরু করলে মানুষ ভাবেন তারা নিরাপদ। কিন্তু কখনো কখনো সেই যাত্রা ভয় আর হতাশার মুখোমুখি হয়ে যায়। অনিশ্চয়তার অন্ধকারে একজন যাত্রীর জীবনের ছোট মুহূর্তও ঝুঁকির শিকার হতে পারে। ছোট্ট আশাও হারিয়ে যায়, আর সব কিছু বিলীন হয়ে যায়। কারণ রক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে ওঠে, তখন বিশ্বাস আর নিরাপত্তা দুটোই ঝরে পড়ে। বর্তমান রাজধানী ঢাকার রাতের অবস্থা এমনই। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাকে তুলে ধরতে আজকের বাংলাস্কুপরে বিশেষ আয়োজন ‘চালকের বেশে ছিনতাইকারী’।
রাতের ঢাকায় আতঙ্ক কাটেনি:
পেশা ছিনতাই কিন্তু রাতের ঢাকায় ধারণ করেন সিএনজি অটোরিকশার চালকের বেশ। যাত্রীকে সিএনজিতে উঠিয়ে গন্তব্যে পৌঁছার আগেই নির্জন স্থানে লুটে নেন সর্বস্ব। গত ২১ সেপ্টেম্বর ভোরে রাজধানীর কাওলায় ১৭ বছরের এক কিশোরীর সঙ্গে ঘটে এমন ঘটনা। সিএনজিতে তুলে এক পর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে লুট করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত এনায়েত হোসেন রবিন নামের এক ছিনতাইকারীকে গ্রেফতারের পর জানা যায় চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। র্যাব বলছে, রবিন এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে।
জানা গেছে, ঘটনার দিন ভোর ৪টা ১০ মিনিটে রাজধানীর উত্তরার জসিমউদ্দিন রোডের বান্ধবীর বাসা থেকে জন্মদিনের পার্টি শেষে গোড়ানের বাসায় ফিরতে বের হয় আনিকা। তার সঙ্গে ছিলেন আরেক বান্ধবীও। ভাড়া করা সিএনজিতে করে যাত্রা শুরু হয় গোড়ানের উদ্দেশ্যে। পথে প্রথমে বান্ধবীকে তার বাসার কাছে নামিয়ে দেয় আনিকা। এবার আনিকাকে নিয়ে একলা ছুটতে শুরু করে সিএনজি। এয়ারপোর্ট ও খিলক্ষেত পেরিয়ে কাওলার কাছাকাছি আসতেই ঘটে বিপত্তি।
চালক রবিন জানায় সিএনজি নষ্ট হয়ে গেছে। এক পর্যায়ে গাড়িতে লুকিয়ে রাখা ধারালো অস্ত্র বের করে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয় রবিন। ভুক্তভোগী আনিকার মা বলেন, ‘ধারালো অস্ত্র গলায় ধরলে মেয়েটি তো আর কিছু করতে পারে না। বাধ্য হয়েই সে সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র দিয়ে দিয়েছে।’ তবে মোবাইল মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেবার পর আনিকাকে অস্ত্রের মুখে নেশাজাতীয় কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করে রবিন। এতে বাধা দিলে অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। গুরুতর জখম হয় হাতে। এ সময় রবিনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে চিৎকার করে আনিকা। লোকজন ছুটে এলে সিএনজি নিয়ে পালিয়ে যায় চালক রবিন। পথচারীরা আহত আনিকাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় ঢাকা মেডিকেলে। হাতে সেলাই পড়ে ২৬টি। ২ দিন আইসিইউতে লড়াইয়ের পর কিছুটা সুস্থ হয়েছে ভুক্তভোগী। আনিকার মা বলেন, এখন কিছুটা সুস্থ হলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে।
সেই ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের পর সাহায্য চাওয়া হয় র্যাবেরও। সিএনজিতে ওঠার ও ছিনতাইয়ের ঘটনাস্থলের কোনো সিসিটিভি ফুটেজ না থাকায় বেগ পেতে হয় র্যাবকে। তবে ভুক্তভোগী কিশোরী সিএনজির একটি ছবি তুলে রেখেছিল। যদিও সেটিতেও গাড়ির নম্বর ছিল অস্পষ্ট। সেটি ধরেই কাজ শুরু করে র্যাব। কাছাকাছি নম্বরের চারটি সিএনজি খুঁজে উত্তরা থেকে সবুজবাগ রুটে শুরু হয় তল্লাশি।
র্যাব-২ এর অধিনায়ক মো. খালিদুল হক হাওলাদার বলেন, ভুক্তভোগী যে সিএনজির ছবি তুলেছিল সেটি খুবই অস্পষ্ট ছিল। নম্বরপ্লেটের মাঝের দুটি সংখ্যা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়নি। তবুও হাল না ছেড়ে বিমানবন্দর থেকে গোড়ান রুটে চলাচলকারী সিএনজিগুলোর ওপর বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়।
এদিকে, দুইদিনের টানা তল্লাশির পর খোঁজ মেলে সেই সিএনজির। রাজধানীর মহাখালী এলাকা থেকে সিএনজিসহ আটক করা হয় চালক বেশী ছিনতাইকারী রবিনকে। জিজ্ঞাসাবাদে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে রবিন। মো. খালিদুল হক হাওলাদার আরও বলেন, গ্রেফতারকৃত রবিনকে হেফাজতে নেয়া হয়। পরে বাদীকে আসামির ছবি দেখালে তিনি আসামিকে চিহ্নিত করেন। বিমানবন্দর থেকে মহাখালী পর্যন্ত ব্যস্ত সড়কে গভীর রাতে যেসব প্রবাসী বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আসেন, তাদের টার্গেট করে চালক বেশী ছিনতাইকারীরা ওঁত পেতে থাকে। এই ধরনের চক্রগুলোকে ধরতে র্যাব কাজ করছে।
শুধু রাজধানীর উত্তরা-কাওলা বা এয়ারপোর্ট রোড নয় তিনশ ফিটসহ বেশি কিছু এলাকায় রাতের আঁধারে এসব সিএনজি চালক হয়ে ওঠে দুর্র্ধষ। যে কারণে বাড়তি সতর্কতার পাশাপাশি রাতের ঢাকায় চলাচলের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ছবি তুলে স্বজনদের কাছে পাঠানোর পরামর্শ র্যাবের।
গোয়েন্দা তালিকা ধরে চলছে অভিযান:
রাজধানীতে ছিনতাই বেড়েই চলেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত এক বছরে অপরাধচক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই ঘটছে ছিনতাইয়ের মতো ভয়াবহ ঘটনা। এতে নগরবাসীর মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিরাপত্তার পরিবেশ।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১০ জন ছিনতাইকারী গ্রেফতার হলেও ছিনতাই কমছে না। বরং কারাগারে গিয়ে জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে অনেকেই। সাম্প্রতিক সময়ে মোহাম্মদপুর, মগবাজার, হাতিরঝিল, ধানমন্ডি, সদরঘাট, ফার্মগেট, শাহবাগ, উত্তরা, গুলশানসহ প্রায় সব এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয় লোকজনের প্রতিরোধে কখনো কখনো ছিনতাইকারীরা গণপিটুনির শিকারও হচ্ছে। গত ৯–১০ সেপ্টেম্বর নবীনগর ও বসিলা এলাকায় এমন একাধিক ঘটনায় প্রাণও গেছে কয়েকজনের। কামরাঙ্গীরচরে ছিনতাইকারীদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন রিকশাচালক আকরাম হোসেন।
এ পরিস্থিতিতে পুলিশ এবার গোয়েন্দাদের তৈরি তালিকা ধরে অভিযান শুরু করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের ডিসি মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, “ঢাকায় ছিনতাই প্রতিরোধে প্রতিনিয়ত কাজ করছে পুলিশ। টহল জোরদার করা হয়েছে। থানাভিত্তিক ছিনতাইকারীদের তালিকা ধরে গ্রেফতার চলছে।”
তিনি আরও বলেন, নতুন করে আলাদা তালিকা করা না হলেও গোয়েন্দা সংস্থার প্রস্তুত করা তালিকা অনুযায়ী অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে কার্যকর দমন অভিযানে সাধারণ মানুষকেও সহযোগিতা করতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ছিনতাইয়ের সময় সাহায্যের হাত মেলে না:
রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও ফ্লাইওভার এলাকায় প্রতিনিয়ত ছিনতাই ঘটছে। আশেপাশে মানুষ থাকলেও বিপদের মুহূর্তে কেউ এগিয়ে আসছে না। ভুক্তভোগীরা জানান, রাতের অন্ধকার, ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্র এবং দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার ভয় মানুষকে সাহায্যে এগোতে বাধা দেয়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ছিনতাই হচ্ছে, পথচারী বা গাড়ির চালক চেয়ে দেখলেও সরাসরি সাহায্য করেন না। অনেকেই শুধু ঘটনা রেকর্ড বা ছবি তুলে রেখে যাচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, অন্ধকার এলাকা যেমন কুড়িল ও মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভার, সেখানে অপরাধীরা সহজেই আক্রমণ চালিয়ে পালিয়ে যায়।
পুলিশ বলছে, দ্রুত খবর দিলে অনেক ঘটনা প্রতিহত করা সম্ভব। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভয়ের সংস্কৃতি ও সামাজিক দায়বোধের অভাব থাকায় পরিস্থিতি বদলায় না। একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেন, “মানুষ এখন ভুক্তভোগীর কষ্টে সাড়া না দিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি ভাবে। এ কারণে জনসম্মুখে অপরাধ ঘটলেও কেউ সাহস করে এগিয়ে আসে না।”বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক দায়বোধ তৈরি না হলে এবং নিরাপত্তা জোরদার না করলে শহরে ছিনতাই প্রতিরোধ করা কঠিন হবে।
বেমানান অস্ত্রের বিপরীতে নৈশপ্রহরীর লাঠি-বাঁশি:
রাজধানীর রাতের ঢাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে খুন, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা। ভীতিকর অন্ধকারে মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর, হাজারীবাগ, পুরান ঢাকা, শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ন্যূনতম। এসব এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন নৈশপ্রহরীরা, কিন্তু তাদের হাতে থাকে শুধু লাঠি ও বাঁশি। অপরাধীদের চাপাতি, ছুরি বা আগ্নেয়াস্ত্রের মুখোমুখি তারা কার্যত অসহায়।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে মোট ১২৯টি ওয়ার্ডে প্রায় দেড় হাজার নৈশপ্রহরী রাতের দায়িত্ব পালন করেন। তবে প্রশাসনিক সুরক্ষা, প্রশিক্ষণ বা আধুনিক সরঞ্জাম না থাকায় বিপদে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা সীমিত। অনেক নৈশপ্রহরী জানিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে জীবন রক্ষা করতে লুকিয়ে থাকতে হয়। মোহাম্মদপুরের প্রহরী আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমার নিরাপত্তা নেই। লাঠি আর লোহার রড হাতে থাকলেও ভয় কাজ করে, কারণ তাদের হাতে থাকে পিস্তল বা বড় রামদা।”
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খুন, ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির প্রায় ১০ হাজার মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২২ হাজার জনকে। এ অবস্থায় রাতের নৈশপ্রহরীরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।বিশেষজ্ঞরা বলছেন,“অস্ত্রধারী অপরাধীর বিরুদ্ধে শুধুই লাঠি-বাঁশি দিয়ে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও পুলিশি সহায়তা না থাকলে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।”
নৈশপ্রহরীরাও জানিয়েছেন, পুলিশের উপস্থিতি কম থাকায় রাতের অন্ধকারে তারা একাই ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যাদের ওপর ভরসা করে তারা নিরাপদে থাকে না, তাহলে সাধারণ নগরবাসীর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?
কম আলোর সড়কেই বেশি ছিনতাই:
রাজধানীর অন্ধকার সড়ক ও ফ্লাইওভারগুলো এখন ছিনতাইকারীদের নিরাপদ আস্তানা। যেখানে সড়কবাতি নেই কিংবা থাকলেও অকেজো, সেই সব এলাকায় রাত নামলেই বেড়ে যায় ছিনতাই, লুটপাট ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। ডিএমপির তথ্য বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। তবে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে সেই সব স্থানে যেখানে আলো কম বা নেই। অন্ধকার জায়গায় অপরাধীরা মুহূর্তের মধ্যে আক্রমণ চালিয়ে পালিয়ে যেতে পারে, ফলে তাদের ধরাও কঠিন হয়ে পড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায, রাজধানীর কুড়িল ও মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভার এর বাতি দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে থাকায় ফ্লাইওভারের ওপর নামে ভূতুড়ে অন্ধকার। চালকদের ভরসা শুধু হেডলাইটের আলো, আর যাত্রীরা থাকেন আতঙ্কে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অন্ধকারের সুযোগে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে, ঘটে দুর্ঘটনা, আর বেড়ে যায় ছিনতাই। রাজধানীর মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের পরিস্থিতিও একই। ওঠানামার মুখে কিছু বাতি জ্বললেও ভেতরের অংশ অন্ধকারে ঢাকা। চালক ও যাত্রীরা বলছেন, এসব অন্ধকার জায়গায় দুর্ঘটনা ও ছিনতাই এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
একজন নগর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘যে সড়কগুলোতে আলোর ব্যবস্থা নেই, সেগুলোতে ছিনতাই বেশি হয়। অপরাধীরা অন্ধকারকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। তাই আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা না করলে অপরাধ দমন করা কঠিন।’ আরেকজন নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘শহরে অপরাধ কমাতে সড়ক ও ফ্লাইওভারে পর্যাপ্ত আলোকায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। এতে দুর্ঘটনা ও ছিনতাই—দুটোই কমে আসবে।’
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স