ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬ , ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

​পূজার সরঞ্জাম বিক্রির ধুম

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৪-০৯-২০২৫ ১২:৫১:৩০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৪-০৯-২০২৫ ১২:৫১:৩০ অপরাহ্ন
​পূজার সরঞ্জাম বিক্রির ধুম সংবাদচিত্র: সংগৃহীত
মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুই দিন আগেই শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গোৎসব। আর মাত্র তিন দিন পরেই ষষ্ঠী। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে পূজার সরঞ্জাম কিনতে ব্যস্ত সময় পার করছেন সবাই। এর মধ্যে শাঁখা, শঙ্খ, ধূপ, মোমবাতি, আলতা, সিঁদুর, প্রদীপ, ঘণ্টা, অলংকারসহ প্রতিমা সাজানোর নতুন পোশাকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

পুরান ঢাকার শাঁখারি বাজারে সরেজমিন দেখা যায়, শারদীয় দুর্গোৎসবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে পুরো এলাকা। সেখানকার কেউ পূজামণ্ডপের জন্য বাঁশের কাঠামো তৈরি করছেন, কেউ মন্দিরে ঘণ্টা বাজাচ্ছেন, কেউ দোকানে পূজার সরঞ্জাম বিক্রি করেছেন, আবার কেউ বা পূজার সরঞ্জাম কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় করছেন। দম ফেলার সময়টুকু নেই তাদের।

শাঁখারি বাজারের দোকানগুলোতে দেখা যায়, পূজা উপলক্ষে শাঁখা-শঙ্খের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের প্রচণ্ড ভিড়। শাঁখা-শঙ্খের ব্যাপক চাহিদা। কেউ এক জোড়া আবার কেউ দুই-তিন জোড়া শাঁখাও কিনছেন। তিনশত টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার টাকা দামের শাঁখাও মিলছে এসব দোকানে। এর পাশাপাশি পূজার জন্য সুবাসের ধূপকাঠির বিক্রিও চোখে পড়ার মতো। ৫০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম।

পূজার জন্য মাটির প্রদীপের চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। পূজার রাতে ঘর, মন্দির কিংবা প্যান্ডেল আলোকিত করতে ব্যবহৃত হবে এই প্রদীপ। এছাড়া প্রতিমার বিভিন্ন ধরনের পোশাক বিক্রি হচ্ছে। দুর্গাপূজা সামনে রেখে বিগ্রহের গড়ন অনুযায়ী নানা মাপের পোশাক বিকিকিনি হচ্ছে এখানে। পূজা উপলক্ষে ঘর ও মন্দির সাজানোর জন্য কাগজ, ফোম, কর্কশিট ও সুতা দিয়ে তৈরি করা বিভিন্ন ধরনের উপকরণ কিনছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। ঘর ও মন্দির সাজানোর এসব উপকরণ উৎসবের আমেজ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। এমন এক উপকরণ হলো শোলা দিয়ে বানানো ‘কদম ফুল’।

এই ‘কদম ফুল’ কিনতে আসা সুস্মিতা সেন বলেন, ঘরে যত দামি জিনিসপত্রই থাকুক না কেন, শোলার তৈরি কদম ফুল বাড়িঘরে অন্যরকম শোভা দেয়। তাছাড়া এটা দামেও সস্তা। ঘরের জন্য কাগজের ফুল কিনতে আসা অনিন্দ্য (২৭) বলেন, পূজায় ঘর আর পূজার ঘর সাজাতে এক হাজার টাকার শোলা কিনেছি। প্রতিবছরই পূজায় শোলা কিনে থাকি। এটা অল্প টাকায় সৌন্দর্যবর্ধনে অতুলনীয়। শাঁখারি বাজারের দোকানদার ‘শঙ্খ নিকেতন’-এর মালিক সুমন নন্দী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পূজা উপলক্ষে মণ্ডপ ও ঘর সাজানোর জন্য শোলা দিয়ে তৈরি কদম ফুল কিনছে সবাই। দশমী ও লক্ষ্মীপূজায় ব্যবহৃত হয় এই কদম ফুল। দশমীর আগ পর্যন্ত এই ফুলের চাহিদা থাকবেও বলে জানান তিনি।

পূজায় ব্যবহার করার জন্য তামা কাঁসার তৈজসপত্রের চাহিদা বরাবরই একটু বেশি থাকে। তামা কাঁসার তৈজসপত্রের বিক্রেতা অতুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, বছরের বাকিটা সময় তামা কাঁসার জিনিসপত্রের যেমন চাহিদা থাকে, পূজায় তার তিন গুণ বেড়ে যায়। এ সময় বিশেষ করে পিতলের থালা, বাটি, চামচ এবং প্রদীপ বেশি বিক্রি হয়। তিনি বলেন, তামা, কাঁসার জিনিসপত্রের মধ্যে কাস্তেশ্বরী, রাজভোগী, রাঁধাকান্তি, বংগী, বেতমুড়ি, রাজেশ্বরী, রত্নবিলাস, ঘুটা ও কলতুলা নামে রয়েছে থালা ও গ্লাস। কৃষ্ণচূড়া, ময়ূরকণ্ঠী, ময়ূর আঁধার, মলিকা ইত্যাদি নামে পাওয়া যায় জগ। তিনি আরও বলেন, রাজভোগী, জলতরঙ্গ, রামভোগী, গোলবাটি, কাজল বাটি, ঝিনাই বাটি, ফুলতুলি বাটি ইত্যাদি নামে রয়েছে বাটি, বোয়ালমুখী, চন্দ্রমুখী, চাপিলামুখী, পঞ্চমুখী, ঝিনাইমুখী নামে রয়েছে চামচ। এছাড়া নিত্য প্রয়োজনীয় সব কিছুই তামা কাঁসা ও পিতলের পাওয়া যায়। পূজা-অর্চনায় মঙ্গল প্রদীপ, কোসাকুর্ষি, মঙ্গলঘট ইত্যাদি কাঁসার বাদ্যযন্ত্র উল্লেখযোগ্য।

শাঁখারী বাজারে পিতলের থালা-বাসন কিনতে আসা অনন্যা রানী বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা সবসময় পুজোর সময় নতুন তামাক আসার প্রদীপ, থালাবাটি এসব কিনতেন। সেই ধারাবাহিকতা এখনও বজায় আছে। প্রদীপের ক্ষেত্রে আমরা তামার চেয়ে মাটির প্রদীপকে বেশি প্রাধান্য দেই। শাঁখারি বাজার এলাকার ফুটপাতে বিক্রি হচ্ছে ছোট প্রতিমা সাজানোর পোশাক। এক দেড়শত টাকার মধ্যে পাওয়া যায় এসব পোশাক। প্রতিমা সাজানোর পোশাক কিনতে এসেছেন চন্দ্রিমা (৩৭)। তিনি বলেন, গোপাল, কৃষ্ণ এবং রাধার জন্য নতুন পোশাক কিনেছে। মাত্র সাড়ে ৩৫০ টাকার মধ্যেই কাজ শেষ। পোশাকের সেলাই এবং কাপড় অনুযায়ী দাম একটু বেশি।

শাঁখারি বাজারে প্রতিমা সাজানোর পোশাক বিক্রি করছেন শিলা রানী দাস (৬৫)। তিনি বলেন, প্রতিমাকে সাজানোর জন্য পোশাকগুলো আমার নিজ হাতে তৈরি করা। ২৫ বছর ধরে আমি নতুন পোশাক বিক্রি করছি।‌ আগে দৈনিক আটশত থেকে এক হাজার টাকা বিক্রি করতাম। এখন পূজার সময়, তাই তার দ্বিগুণ বেচাকেনা হচ্ছে। শিলা রানী আক্ষেপ করে বলেন, একটা সময় কোটি টাকার সম্পদ ছিল আমার স্বামীর। কিন্তু তার ভাই অর্থাৎ আমার দেবর সব কিছু নিয়ে গেছে। সেই থেকেই পথের ফকির। তিন মেয়ে এক ছেলেকে নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করতে এবং সংসারের হাল ধরার জন্য এই পন্থা অবলম্বন করেছি। তিনি আরও বলেন, একেবারে ছোট প্রতিমার পোশাক ১০০ টাকা। তার চেয়ে একটু বড় প্রতিমার পোশাক দেড়শত টাকা বিক্রি করছি। সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদে এখন মোটামুটি ভালো সময় যাচ্ছে।

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ